প্রকাশ: ২৮ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ে সড়কে দাঁড়িয়ে থাকা একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশার পেছনে দ্রুতগতির ট্রাকের ধাক্কায় মাদরাসাছাত্রীসহ দুজন নিহত হয়েছেন। একই ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছেন আরও তিনজন। বুধবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কের বড়তাকিয়া বাজার এলাকায় জাহেদিয়া দাখিল মাদরাসার সামনে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনার পরপরই মহাসড়কের চট্টগ্রামমুখী লেনে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়, ভোগান্তিতে পড়েন হাজারো যাত্রী।
নিহতদের একজন বড়তাকিয়া জাহেদিয়া দাখিল মাদরাসার দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী খাদিজা মাশমুম (১৫)। অপর নিহত ব্যক্তির পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করতে পারেনি পুলিশ। আহত তিনজনের নাম ও পরিচয়ও প্রাথমিকভাবে জানা যায়নি। আহতদের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় দ্রুত উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সকালে বড়তাকিয়া বাজার এলাকায় মাদরাসার সামনে যাত্রী ওঠানামার জন্য একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। এ সময় ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী একটি ট্রাক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে অটোরিকশাটির পেছনে সজোরে ধাক্কা দেয়। প্রচণ্ড ধাক্কায় অটোরিকশাটি রাস্তার পাশের একটি পুকুরে ছিটকে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যেই ঘটনাস্থলে চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। আশপাশের মানুষ ছুটে এসে উদ্ধার কাজে অংশ নেন।
দুর্ঘটনার ভয়াবহতায় ঘটনাস্থলেই দুজনের মৃত্যু হয় বলে জানান প্রত্যক্ষদর্শীরা। পানিতে পড়ে যাওয়ায় অটোরিকশার ভেতরে থাকা যাত্রীদের উদ্ধার করতে স্থানীয়দের পাশাপাশি ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের বেগ পেতে হয়। আহতদের উদ্ধার করে দ্রুত হাসপাতালে পাঠানো হলেও তাদের মধ্যে তিনজনের অবস্থা সংকটাপন্ন বলে জানা গেছে।
নিহত খাদিজা মাশমুমের মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। সহপাঠী ও শিক্ষকরা জানান, খাদিজা একজন মেধাবী ছাত্রী ছিল এবং নিয়মিত পড়াশোনার পাশাপাশি ধর্মীয় শিক্ষায়ও মনোযোগী ছিল। সকালে সে মাদরাসায় যাওয়ার জন্য অটোরিকশায় উঠেছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। পরিবারের সদস্যদের আহাজারিতে ঘটনাস্থলে হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
মীরসরাই সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার নাদিম হায়দার চৌধুরী জানান, খবর পেয়ে তিনি দ্রুত ঘটনাস্থলে যান। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম যাওয়ার পথে বড়তাকিয়া এলাকায় জটলা দেখে গাড়ি থেকে নেমে দুর্ঘটনার বিষয়টি জানতে পারি। সঙ্গে সঙ্গে ফায়ার সার্ভিস ও থানা পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। প্রাথমিকভাবে দুজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে এবং তিনজনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে হাইওয়ে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস যৌথভাবে কাজ করছে।
দুর্ঘটনার পর ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ এই অংশে যান চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। বিশেষ করে চট্টগ্রামমুখী লেনে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। বাস, ট্রাক ও ব্যক্তিগত গাড়িতে থাকা যাত্রীরা দীর্ঘ সময় সড়কে আটকে পড়েন। পরে পুলিশ ও হাইওয়ে পুলিশের তৎপরতায় ধীরে ধীরে যান চলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু করে।
স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, বড়তাকিয়া বাজার এলাকা দীর্ঘদিন ধরেই দুর্ঘটনাপ্রবণ। এখানে নিয়মিত যানবাহন থামানো, যাত্রী ওঠানামা এবং বাজারকেন্দ্রিক ভিড়ের কারণে প্রায়ই ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটে। তারা আরও জানান, দ্রুতগতির ট্রাক ও ভারী যানবাহনের বেপরোয়া চলাচল এই দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। স্থানীয়দের মতে, পর্যাপ্ত ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, স্পিড ব্রেকার ও সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড না থাকায় ঝুঁকি আরও বেড়ে গেছে।
এদিকে দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। অনেকেই সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান। বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা জোরদারের আহ্বান জানান তারা।
হাইওয়ে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, দুর্ঘটনায় জড়িত ট্রাকটি শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। চালক পালিয়ে গেছে কি না, নাকি আটক হয়েছে—সে বিষয়ে তদন্ত চলছে। ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ণয় এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা নতুন নয়। প্রায় প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন মহাসড়কে এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনার খবর পাওয়া যায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চালকদের অসতর্কতা, অতিরিক্ত গতি, সড়কের নকশাগত ত্রুটি এবং পর্যাপ্ত নজরদারির অভাবই এসব দুর্ঘটনার মূল কারণ। মীরসরাইয়ের এই দুর্ঘটনাও সেই বাস্তবতারই আরেকটি নির্মম উদাহরণ।
নিহতদের মরদেহ আইনি প্রক্রিয়া শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তরের প্রস্তুতি চলছে। আহতদের চিকিৎসা অব্যাহত রয়েছে। এ ঘটনায় শোকাহত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সাধারণ মানুষ।