নামাজির সামনে দিয়ে চলাচল: কী বলছে হাদিস ও ফিকহ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৮ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৪৬ বার
নামাজির সামনে দিয়ে চলাচল: কী বলছে হাদিস ও ফিকহ

প্রকাশ: ২৮ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নামাজ ইসলামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতগুলোর একটি। এটি শুধু নির্দিষ্ট কিছু দোয়া ও কায়দা-কানুনের সমষ্টি নয়; বরং নামাজের মাধ্যমে একজন মুমিন সরাসরি মহান আল্লাহর সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করেন। আল্লাহর সঙ্গে এই নিবিড় কথোপকথনের সময় নামাজরত ব্যক্তির সম্মান ও মর্যাদা অত্যন্ত উচ্চ। তাই ইসলামে নামাজের আদব-কায়দা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি নামাজ আদায়কারীর সামনে অন্যদের আচরণও অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয় হিসেবে বিবেচিত।

সমাজে প্রায়ই একটি প্রশ্ন শোনা যায়—নামাজি ব্যক্তির কতটুকু সামনে দিয়ে হেঁটে যাওয়া যাবে? অনেক সময় মসজিদে বা খোলা জায়গায় নামাজ চলাকালে মুসল্লিদের যাতায়াত নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। কেউ না বুঝে সামনে দিয়ে চলে যান, আবার কেউ প্রয়োজনে থেমে যান। এই বিষয়ে কুরআন-সুন্নাহ ও ফিকহে ইসলামি সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে, যা জানা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য জরুরি।

ফুকাহায়ে কেরামের সর্বসম্মত মত হলো, নামাজরত ব্যক্তির সামনে দিয়ে অতিক্রম করা অত্যন্ত গুনাহের কাজ। এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কঠোর সতর্কবার্তা রয়েছে। সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, নামাজি ব্যক্তির সামনে দিয়ে অতিক্রমকারী যদি জানত এতে কী ধরনের শাস্তির আশঙ্কা রয়েছে, তবে সে চল্লিশ পর্যন্ত ঠায় দাঁড়িয়ে থাকাকেই উত্তম মনে করত। বর্ণনাকারী আবু নাযর (রহ.) বলেন, তিনি নিশ্চিত নন—এই চল্লিশ বলতে চল্লিশ দিন, চল্লিশ মাস নাকি চল্লিশ বছর বোঝানো হয়েছে। এই হাদিসের ভাষা থেকেই বোঝা যায়, বিষয়টি কতটা গুরুতর।

হাদিসে ব্যবহৃত ‘বাইনা ইয়াদাইল মুসাল্লি’ বা নামাজরত ব্যক্তির সামনে বলতে ঠিক কতটুকু জায়গা বোঝানো হয়েছে—এটি নিয়েও আলেমদের ব্যাখ্যা রয়েছে। সাধারণভাবে নামাজরত ব্যক্তির দৃষ্টি সেজদার স্থানে নিবদ্ধ থাকে। সে হিসেবে নামাজরত ব্যক্তির সামনে এমন একটি পরিসর রয়েছে, যা তার দৃষ্টিসীমা ও মনোযোগের ভেতরে পড়ে। ফিকহবিদদের মতে, এই পরিসরের ভেতর দিয়ে অতিক্রম করা নিষিদ্ধ। তবে এই সীমার বাইরে দিয়ে হেঁটে যাওয়া বৈধ।

এখানে ‘সুতরা’ বা প্রতিবন্ধক ব্যবহারের বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সুতরা বলতে নামাজরত ব্যক্তির সামনে স্থাপন করা এমন কোনো বস্তু বোঝায়, যা তার সামনে একটি দৃশ্যমান সীমা তৈরি করে। রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাজের সময় সুতরা ব্যবহার করতে উৎসাহ দিয়েছেন। দেয়াল, খুঁটি, লাঠি বা অনুরূপ কোনো বস্তু সুতরা হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। এর ফলে নামাজরত ব্যক্তির মনোযোগ রক্ষা পায় এবং অন্যদের চলাচলেও স্পষ্ট দিকনির্দেশনা থাকে।

বর্তমান সময়ে অনেক মসজিদে পর্যাপ্ত সুতরার ব্যবস্থা না থাকায় দেখা যায়, কেউ কেউ কাপড়, রুমাল বা পাতলা কোনো বস্তু ঝুলিয়ে সামনে দিয়ে চলাচল করেন। ফিকহের কিতাবগুলোতে উল্লেখ আছে, এ ধরনের ঝুলন্ত কাপড় বা রুমাল সাধারণ অবস্থায় পূর্ণাঙ্গ সুতরা হিসেবে যথেষ্ট নয়। তবে বিশেষ ওজরের মুহূর্তে, যখন সামনে রাখার মতো কোনো উপযুক্ত বস্তু পাওয়া যায় না, তখন প্রয়োজনে এভাবে অতিক্রম করার অবকাশ রয়েছে। শরহুল মুনইয়াহ ও বাদায়েউস সানায়ি-এর মতো গ্রন্থে এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা পাওয়া যায়।

জামাতের নামাজের সময় বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে বোঝা প্রয়োজন। যখন জামাত শুরু হয়ে যায় এবং মুসল্লিরা কাতারে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করছেন, তখন সাধারণভাবে তাদের সামনে দিয়ে অতিক্রম করা অনুচিত। তবে ফিকহে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রম উল্লেখ করা হয়েছে। যদি খুব বেশি প্রয়োজন দেখা দেয় এবং সামনের কাতারে দাঁড়ানো ছাড়া বিকল্প না থাকে, তখন পেছনের কাতারের সামনে দিয়ে গিয়ে সামনের কাতারে দাঁড়ানো জায়েজ রয়েছে। কারণ এখানে উদ্দেশ্য নামাজে শামিল হওয়া, যা নিজেই একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত।

একইভাবে, যদি সামনে কাতার খালি রেখে পেছনের কাতারে কিছু মুসল্লি দাঁড়িয়ে যান, তখন পরবর্তী মুসল্লিদের জন্য সামনের কাতারে পৌঁছাতে সামনে দিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন দেখা দিতে পারে। এ অবস্থায় আলেমদের মতে, মুসল্লিদের নামাজ চলমান থাকলেও সামনে দিয়ে গিয়ে কাতারে দাঁড়ানো বৈধ। তবে শর্ত হলো—এটি যেন অপ্রয়োজনীয়ভাবে না করা হয় এবং বিকল্প রাস্তা না থাকলেই কেবল এই পথ অবলম্বন করা হয়।

এই বিষয়ে হজরত আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা.)-এর একটি ঘটনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি বর্ণনা করেন, প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার কাছাকাছি বয়সে তিনি একবার একটি গাধীর পিঠে চড়ে আসেন। তখন রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিনায় নামাজ আদায় করছিলেন এবং তাঁর সামনে কোনো দেয়াল বা সুতরা ছিল না। ইবনু আব্বাস (রা.) একটি কাতারের সামনে দিয়ে অতিক্রম করেন, গাধীটিকে বিচরণের জন্য ছেড়ে দেন এবং কাতারের ভেতরে ঢুকে পড়েন। এতে কেউ তাঁকে নিষেধ করেননি। এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, জামাতের প্রয়োজনে কাতারের সামনে দিয়ে অতিক্রম করার বৈধতা রয়েছে।

ইসলাম মূলত ভারসাম্যের ধর্ম। একদিকে যেমন নামাজরত ব্যক্তির মর্যাদা রক্ষার নির্দেশ রয়েছে, তেমনি অন্যদিকে প্রয়োজন ও বাস্তবতার কথাও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। তাই ইসলামী শরিয়ত কোনো অযৌক্তিক কঠোরতা আরোপ করেনি। তবে সাধারণ নীতি হলো—নামাজরত ব্যক্তির সামনে দিয়ে অতিক্রম করা থেকে যথাসম্ভব বিরত থাকা। প্রয়োজনে একটু অপেক্ষা করা বা বিকল্প পথ ব্যবহার করা উত্তম।

আধুনিক জীবনে মসজিদ, অফিস, বাসা কিংবা খোলা মাঠে নামাজ আদায় করা হয়। এসব স্থানে চলাচলের চাপ থাকলেও নামাজের প্রতি সম্মান দেখানো প্রত্যেক মুসলমানের দায়িত্ব। নামাজরত ব্যক্তির সামনে দিয়ে না যাওয়ার চেষ্টা করা, সুতরা ব্যবহারে সচেতন হওয়া এবং অন্যদেরও এই বিষয়ে সচেতন করা—সবই ইসলামী আদবের অংশ।

সবশেষে বলা যায়, নামাজ শুধু ব্যক্তিগত ইবাদত নয়; এটি সামাজিক শৃঙ্খলা ও পারস্পরিক সম্মানের শিক্ষাও দেয়। নামাজরত ব্যক্তির সামনে দিয়ে কতটুকু জায়গা দিয়ে যাওয়া যাবে—এই প্রশ্নের উত্তরে হাদিস ও ফিকহ আমাদের স্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছে। সেই দিকনির্দেশনা মেনে চললেই নামাজের মর্যাদা রক্ষা পাবে এবং আমাদের ইবাদত ও সামাজিক আচরণ হবে আরও সুন্দর ও সুশৃঙ্খল।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত