আসাদ–পরবর্তী সিরিয়ায় নতুন সমীকরণে পুতিন–শারা বৈঠক

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৫৫ বার
আসাদ–পরবর্তী সিরিয়ায় নতুন সমীকরণে পুতিন–শারা বৈঠক

প্রকাশ: ২৯  জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ ও দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতার পর দেশটির ক্ষমতার পালাবদল মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে যে নতুন বাস্তবতার জন্ম দিয়েছে, তারই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত মিলল মস্কোয়। সিরিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার সঙ্গে বৈঠক করেছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। স্থানীয় সময় বুধবার রাশিয়ার রাজধানীতে অনুষ্ঠিত এই বৈঠক আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে, কারণ এটি হয়েছে রাশিয়ার দীর্ঘদিনের মিত্র বাশার আল-আসাদ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার প্রায় এক বছর পর।

বৈঠকের আগে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সিরীয় প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা রাশিয়াকে ধন্যবাদ জানান সিরিয়ার প্রতি দীর্ঘদিনের সমর্থনের জন্য। তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই অঞ্চলে স্থিতিশীলতা রক্ষায় রাশিয়ার ভূমিকা ছিল ‘ঐতিহাসিক’। আল-শারার ভাষায়, সিরিয়ার সংকটময় সময়ে রাশিয়ার কূটনৈতিক ও সামরিক উপস্থিতি দেশটির ভাগ্য নির্ধারণে বড় প্রভাব ফেলেছে। একই সঙ্গে তিনি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধারে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন।

এর জবাবে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন সিরিয়ায় শান্তি প্রতিষ্ঠা ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা পুনরুদ্ধারে বর্তমান সরকারের উদ্যোগের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের সংঘাতের পর সিরিয়া ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতার পথে ফিরছে, যা শুধু দেশটির জন্য নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্যের জন্যই ইতিবাচক। পুতিন বিশেষভাবে সন্তোষ প্রকাশ করেন সিরিয়ার সরকারপন্থি বাহিনীর সাম্প্রতিক সামরিক অভিযানের অগ্রগতি নিয়ে। তাঁর মতে, এসব অভিযানের ফলে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া আরও গতিশীল হয়েছে।

২০২৪ সালে বাশার আল-আসাদের পতনের পর থেকেই সিরিয়ার রাজনৈতিক মানচিত্রে আমূল পরিবর্তন ঘটে। দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা আসাদ সরকারের পতনের পর প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেন আহমেদ আল-শারা। সে সময় পতিত প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদকে আশ্রয় দেয় রাশিয়া, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। তবে ক্ষমতার এই পরিবর্তনের পর সিরিয়ার নতুন নেতৃত্ব ধীরে ধীরে নিজেদের কূটনৈতিক অবস্থান পুনর্গঠন শুরু করে। এরই অংশ হিসেবে মস্কো ও দামেস্কের সম্পর্কেও নতুন মাত্রা যোগ হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, আল-শারার নেতৃত্বে সিরিয়া একদিকে অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ফেরানোর চেষ্টা করছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে সচেষ্ট হচ্ছে। রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্নির্ধারণ এই কৌশলেরই অংশ। এই প্রেক্ষাপটে পুতিনের সঙ্গে সাক্ষাত করতে দ্বিতীয়বারের মতো মস্কো সফরে যান সিরীয় প্রেসিডেন্ট আল-শারা।

বৈঠকে পুতিন বলেন, সিরিয়ার ভৌগোলিক অখণ্ডতা পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া এখন দৃশ্যমান অগ্রগতি পাচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, সরকারি বাহিনী পিকেকে-সংশ্লিষ্ট ওয়াইপিজি নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠীর কাছ থেকে বিস্তীর্ণ এলাকা পুনর্দখল করতে সক্ষম হওয়ায় এই অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে। পুতিনের ভাষায়, এই সামরিক সাফল্য শুধু নিরাপত্তা পরিস্থিতি উন্নত করেনি, বরং রাজনৈতিক সমাধানের পথও সুগম করেছে।

সিরীয় প্রেসিডেন্ট আল-শারাও রাশিয়ার সহায়তার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, সিরিয়ার বৃহত্তর অঞ্চলে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে রাশিয়ার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দেন, যুদ্ধোত্তর পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।

রাশিয়ার জন্য সিরিয়ার গুরুত্ব কেবল রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক পর্যায়েই সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত স্বার্থ। সিরিয়ার ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলে অবস্থিত হমেইমিম বিমানঘাঁটি এবং তারতুস নৌঘাঁটি ক্রেমলিনের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এই দুটি ঘাঁটি মধ্যপ্রাচ্য ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে রাশিয়ার সামরিক উপস্থিতি ও প্রভাব বজায় রাখতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে আসছে। রুশ কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে ইঙ্গিত দিয়েছে, এই ঘাঁটিগুলোর অবস্থান ধরে রাখতে তারা দামেস্কের সঙ্গে নতুন সমঝোতায় পৌঁছানোর আশা করছে।

তবে মাঠপর্যায়ে কিছু পরিবর্তনের আভাসও মিলছে। সিরিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ক্বামিশলি বিমানবন্দর এলাকা থেকে রুশ বাহিনী সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম প্রত্যাহার শুরু করেছে। স্থানীয় সূত্র এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, সামরিক কার্গো বিমানে করে এসব সরঞ্জাম লাতাকিয়ার হমেইমিম বিমানঘাঁটির দিকে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি রাশিয়ার সামরিক কৌশলে পুনর্বিন্যাসের ইঙ্গিত হতে পারে, যেখানে তারা সরাসরি সংঘাতে কম জড়িয়েও নিজেদের কৌশলগত স্বার্থ রক্ষা করতে চায়।

এই বৈঠক এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হলো, যখন সিরিয়া এখনো পুরোপুরি স্থিতিশীলতার পথে ফিরতে পারেনি। দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে নিরাপত্তা ঝুঁকি, অর্থনৈতিক সংকট এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের সমস্যা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে। তবুও বর্তমান সরকার দাবি করছে, রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনের মাধ্যমে তারা ধীরে ধীরে পরিস্থিতি সামাল দিতে সক্ষম হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, পুতিন ও আল-শারার এই বৈঠক সিরিয়া–রাশিয়া সম্পর্কের একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা নির্দেশ করতে পারে। একদিকে রাশিয়া তাদের দীর্ঘদিনের প্রভাব ও কৌশলগত অবস্থান ধরে রাখতে চায়, অন্যদিকে সিরিয়ার নতুন নেতৃত্ব বৈশ্বিক শক্তিগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে আগ্রহী। এই সমীকরণ কতটা স্থায়ী হবে, তা নির্ভর করবে সিরিয়ার অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা, আঞ্চলিক রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর ভবিষ্যৎ অবস্থানের ওপর।

সব মিলিয়ে, আসাদ–পরবর্তী সিরিয়ায় পুতিন ও আল-শারার এই বৈঠক শুধু দ্বিপক্ষীয় সৌজন্য সাক্ষাৎ নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তনশীল ভূরাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়া কোন পথে এগোবে এবং রাশিয়া সেখানে কী ভূমিকা রাখবে—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার ক্ষেত্রে এই বৈঠককে একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক হিসেবে দেখছেন পর্যবেক্ষকরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত