প্রকাশ: ২৯ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের মূল্যবান ধাতুর বাজারে আবারও নতুন ইতিহাস তৈরি হলো। রুপার দামে টানা ঊর্ধ্বগতির ধারাবাহিকতায় এবার ভরিতে ৮১৬ টাকা বাড়িয়ে ২২ ক্যারেটের এক ভরি রুপার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৮ হাজার ৫৭৩ টাকা। বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি (বাজুস) জানিয়েছে, এটিই দেশের বাজারে রুপার সর্বোচ্চ দাম। বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) সকালে জারি করা এক বিজ্ঞপ্তিতে এই নতুন মূল্য ঘোষণা করা হয়, যা আজ সকাল ১০টা ১৫ মিনিট থেকে কার্যকর হয়েছে।
বাজুসের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, স্থানীয় বাজারে রুপার কাঁচামালের দাম বাড়ার কারণে সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এনে নতুন করে এই মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাব, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে চাপ—সব মিলিয়ে রুপার দামে এই উল্লম্ফন অনিবার্য হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নতুন মূল্যতালিকা অনুযায়ী, প্রতি ভরি ২২ ক্যারেটের রুপার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৮ হাজার ৫৭৩ টাকা। একই সঙ্গে ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি রুপার দাম দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ১৬৫ টাকা, ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি ৬ হাজার ৯৯৮ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি রুপার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ হাজার ২৪৯ টাকা। বাজুস জানিয়েছে, এই দামগুলো রুপার কাঁচামালের ভিত্তিমূল্য; বিক্রয় পর্যায়ে এর সঙ্গে সরকার-নির্ধারিত ৫ শতাংশ ভ্যাট এবং বাজুস নির্ধারিত ন্যূনতম ৬ শতাংশ মজুরি যুক্ত হবে। গহনার নকশা ও মানভেদে মজুরির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
এর আগে চলতি মাসের ২৬ জানুয়ারি সর্বশেষ রুপার দাম সমন্বয় করা হয়েছিল। সে সময় ভরিতে ৫২৫ টাকা বাড়িয়ে ২২ ক্যারেটের রুপার দাম নির্ধারণ করা হয় ৭ হাজার ৭৫৭ টাকা, যা তখন পর্যন্ত দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ছিল। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে আবারও বড় অঙ্কের মূল্যবৃদ্ধি রুপার বাজারে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, এত ঘন ঘন দামের পরিবর্তনে ক্রেতাদের সিদ্ধান্ত নিতে সময় লাগছে, ফলে বাজারে কেনাবেচার গতি কিছুটা শ্লথ হচ্ছে।
চলতি বছর এখন পর্যন্ত রুপার দামে মোট ১২ দফা সমন্বয় করা হয়েছে। এর মধ্যে ৯ দফায় দাম বেড়েছে এবং ৩ দফায় কমানো হয়েছে। আগের বছর ২০২৫ সালেও রুপার দামে ব্যাপক ওঠানামা দেখা গেছে। ওই বছর মোট ১৩ বার রুপার দাম সমন্বয় করা হয়েছিল, যেখানে ১০ বার দাম বাড়ানো হয় এবং মাত্র ৩ বার কমানো হয়েছিল। পরিসংখ্যান বলছে, রুপার বাজারে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতাই এখন প্রধান বাস্তবতা।
বিশ্লেষকদের মতে, রুপার দামের এই ঊর্ধ্বগতি কেবল স্থানীয় বাজারের কারণে নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবান ধাতুর চাহিদা বাড়ছে, বিশেষ করে বিনিয়োগকারীদের নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণ ও রুপার প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি ডলার শক্তিশালী হওয়া, বৈশ্বিক সুদের হার এবং ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা মূল্যবান ধাতুর বাজারকে প্রভাবিত করছে।
রুপার পাশাপাশি স্বর্ণের বাজারেও একই রকম চিত্র দেখা যাচ্ছে। সম্প্রতি ভরিতে ১৬ হাজার ২১৩ টাকা বাড়িয়ে ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৮৬ হাজার ১ টাকা, যা দেশের ইতিহাসে স্বর্ণের সর্বোচ্চ দাম। একই সঙ্গে ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৭২ হাজার ৯৯৬ টাকা, ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি ২ লাখ ৩৩ হাজার ৯৮০ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৯৩ হাজার ৩৯ টাকা।
চলতি বছর স্বর্ণের দামও একাধিকবার সমন্বয় করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত ১৬ দফা স্বর্ণের দাম পরিবর্তন হয়েছে, যার মধ্যে ১৩ দফায় দাম বেড়েছে এবং ৩ দফায় কমানো হয়েছে। ২০২৫ সালে স্বর্ণের দামের ওঠানামা ছিল আরও বেশি। ওই বছর মোট ৯৩ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করা হয়েছিল, যার মধ্যে ৬৪ বার দাম বেড়েছিল এবং ২৯ বার কমানো হয়েছিল। এই পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট, স্বর্ণ ও রুপা—উভয় ধাতুই সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উচ্চ অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
জুয়েলারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, রুপার দামের এই রেকর্ড বৃদ্ধি তাদের ব্যবসায় দ্বিমুখী প্রভাব ফেলছে। একদিকে কাঁচামালের দাম বাড়ায় উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা সীমিত হওয়ায় বিক্রি কমার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির ক্রেতারা রুপার গহনা কেনার ক্ষেত্রে এখন আরও বেশি হিসাব-নিকাশ করছেন। ফলে বিয়ে বা সামাজিক অনুষ্ঠানের মৌসুমেও বিক্রির গতি আগের মতো নেই বলে অনেক ব্যবসায়ী অভিযোগ করছেন।
তবে বিনিয়োগকারীদের একটি অংশের কাছে এই মূল্যবৃদ্ধি ইতিবাচক হিসেবেই দেখা হচ্ছে। তাদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে রুপা একটি শক্তিশালী বিনিয়োগ মাধ্যম হতে পারে, বিশেষ করে যখন বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা বাড়ে। প্রযুক্তি খাতে রুপার ব্যবহার বাড়ছে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং ইলেকট্রনিক্স শিল্পে এর চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে—এই বিষয়গুলো ভবিষ্যতেও রুপার দামকে সহায়তা করবে বলে মনে করছেন তারা।
অন্যদিকে ভোক্তারা বলছেন, দাম বাড়লেও রুপার প্রতি মানুষের আগ্রহ পুরোপুরি কমে যাবে না। স্বর্ণের তুলনায় রুপা এখনো তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী হওয়ায় অনেকেই রুপার গহনার দিকেই ঝুঁকছেন। তবে দামের এই দ্রুত ঊর্ধ্বগতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে সেই চিত্রও বদলে যেতে পারে।
সব মিলিয়ে, রুপার দামে নতুন এই রেকর্ড দেশের মূল্যবান ধাতুর বাজারে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় যোগ করল। বাজারের বর্তমান ধারা বলছে, স্বর্ণ ও রুপা—উভয় ধাতুর দামই আপাতত নিম্নমুখী হওয়ার কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে না। ফলে ক্রেতা, ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারী—সব পক্ষকেই এখন আরও সতর্ক হয়ে বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে হচ্ছে।