মায়ানমারের স্ক্যাম সাম্রাজ্যে চীনের কঠোর রায়

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৩৬ বার
মায়ানমারের স্ক্যাম সাম্রাজ্যে চীনের কঠোর রায়

প্রকাশ: ২৯ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মায়ানমারের সীমান্তবর্তী কুখ্যাত অনলাইন জালিয়াতি ও স্ক্যাম সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে এবার ইতিহাসের সবচেয়ে কঠোর রায় দিল চীন। মায়ানমারে দীর্ঘদিন ধরে টেলিযোগাযোগ জালিয়াতি, অবৈধ ক্যাসিনো, মানব পাচার ও নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনাকারী মিং পরিবারের ১১ জন সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন চীনের একটি আদালত। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের বরাতে জানা গেছে, এই মামলায় পরিবারের আরও বহু সদস্যকে যাবজ্জীবনসহ বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এই রায়কে চীনের সীমান্তবর্তী অপরাধ দমনে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সোমবার পূর্বাঞ্চলীয় শহর ওয়েনঝোতে এই মামলার রায় ঘোষণা করা হয়। আদালতে মোট ৩৯ জন মিং পরিবারের সদস্য ও সহযোগীর বিরুদ্ধে সাজা ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে ১১ জনকে সরাসরি মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে, পাঁচজনকে দুই বছরের স্থগিতাদেশসহ মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে, ১১ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং বাকিদের পাঁচ থেকে ২৪ বছর পর্যন্ত বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আদালতের ভাষায়, এটি শুধু একটি পরিবারের বিরুদ্ধে রায় নয়, বরং সীমান্তবর্তী এলাকায় গড়ে ওঠা আন্তর্জাতিক স্ক্যাম নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে শক্ত বার্তা।

মিং পরিবার দীর্ঘদিন ধরে চীন সীমান্তসংলগ্ন মায়ানমারের শান রাজ্যের লাউকাইং শহর নিয়ন্ত্রণ করত। একসময়ের দরিদ্র ও অবহেলিত এই শহরটি তাদের হাত ধরে পরিণত হয় ক্যাসিনো, রেড-লাইট এলাকা ও অনলাইন জালিয়াতির ঝলমলে কেন্দ্রে। চীনা নাগরিকদের লক্ষ্য করে গড়ে তোলা এসব ক্যাসিনো ও স্ক্যাম সেন্টার ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক অপরাধের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। আদালতের নথি অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে মিং পরিবার ও তাদের সহযোগীরা জালিয়াতি ও জুয়ার আড্ডা থেকে ১০ বিলিয়ন ইউয়ানেরও বেশি অর্থ আয় করেছে, যা মার্কিন ডলারে প্রায় ১.৪ বিলিয়ন।

এই অপরাধ সাম্রাজ্যের ভয়াবহ দিক ছিল এর মানবিক বিপর্যয়। আদালত জানিয়েছে, মিং পরিবারের পরিচালিত কর্মকাণ্ডের ফলে অন্তত ১৪ জন চীনা নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে এবং আরও বহু মানুষ শারীরিক ও মানসিকভাবে গুরুতর আহত হয়েছেন। তদন্তে উঠে এসেছে, স্ক্যাম সেন্টারগুলোতে কাজ করতে বাধ্য করা কর্মীদের ওপর চালানো হয়েছে অমানবিক নির্যাতন। অনেক ক্ষেত্রে কর্মীরা পালানোর চেষ্টা করলে তাদের গুলি করে হত্যা করা হয়েছে বলেও আদালত উল্লেখ করেছে।

প্রাথমিকভাবে চীনা জুয়ার চাহিদাকে কাজে লাগানোর জন্য লাউকাইংয়ে ক্যাসিনোগুলো গড়ে উঠলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো রূপ নেয় অর্থ পাচার, মানব পাচার ও অনলাইন প্রতারণার আড়ালে। জাতিসংঘ একে ‘স্ক্যাম মহামারী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লাউকাইং ও আশপাশের এলাকায় এক লাখেরও বেশি বিদেশি নাগরিককে প্রতারণার মাধ্যমে এনে কার্যত বন্দি করে রাখা হয়েছিল। তাদের দিয়ে সারা বিশ্বের ভুক্তভোগীদের লক্ষ্য করে জটিল অনলাইন জালিয়াতি পরিচালনা করানো হতো।

মিং পরিবার একসময় শান রাজ্যের অন্যতম শক্তিশালী গোষ্ঠী ছিল। তারা লাউকাইংয়ে অন্তত ১০ হাজার কর্মী আটক রাখা একাধিক স্ক্যাম সেন্টার পরিচালনা করত। এর মধ্যে সবচেয়ে কুখ্যাত ছিল ‘ক্রাউচিং টাইগার ভিলা’ নামের একটি কম্পাউন্ড। এই স্থাপনাটি নির্যাতনের প্রতীক হিসেবে পরিচিত ছিল, যেখানে শ্রমিকদের নিয়মিত মারধর, বৈদ্যুতিক শক ও অনাহারের মতো শাস্তি দেওয়া হতো। অনেক ভুক্তভোগীর বর্ণনায় উঠে এসেছে, এটি ছিল আধুনিক দাসত্বের এক ভয়ংকর উদাহরণ।

২০২৩ সালে এই প্রতারণা সাম্রাজ্যের পতন শুরু হয়। মায়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর একটি জোট শান রাজ্যে অভিযান চালিয়ে সেনাবাহিনীকে বিতাড়িত করে এবং লাউকাইংয়ের নিয়ন্ত্রণ নেয়। এরপর মায়ানমার কর্তৃপক্ষ মিং পরিবারের বহু সদস্যকে গ্রেপ্তার করে চীনের হাতে তুলে দেয়। বিশ্লেষকদের মতে, ওই অভিযানে চীনের নীরব সমর্থন ছিল, কারণ বেইজিং দীর্ঘদিন ধরেই সীমান্তবর্তী এসব স্ক্যাম সেন্টারকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখছিল।

মিং পরিবারের প্রধান মিং জুয়েচাং গ্রেপ্তারের আগেই আত্মহত্যা করেছেন বলে জানা গেছে। পরিবারের অন্য সদস্যদের মধ্যে কয়েকজন আদালতে অনুতপ্ত স্বীকারোক্তি দিয়েছেন এবং অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। চীনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এসব স্বীকারোক্তি তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে এবং বৃহত্তর অপরাধ নেটওয়ার্ক উন্মোচনে সহায়তা করেছে।

এই মামলার পাশাপাশি হাজার হাজার স্ক্যাম সেন্টার কর্মীকেও চীনা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। অনেকেই ভুক্তভোগী হিসেবে চিহ্নিত হওয়ায় তাদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চীন সরকার বলছে, অপরাধীদের কঠোর শাস্তির পাশাপাশি ভুক্তভোগীদের উদ্ধার ও পুনর্বাসনও তাদের অগ্রাধিকার।

এই রায়ের প্রভাব শুধু চীন বা মায়ানমারেই সীমাবদ্ধ নয়। বেইজিংয়ের চাপের মুখে থাইল্যান্ড চলতি বছরের শুরুতে মায়ানমার সীমান্তবর্তী জালিয়াতি কেন্দ্রগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, এই অবৈধ ব্যবসা খুব দ্রুত অভিযোজিত হয়। সাম্প্রতিক তথ্যে দেখা যাচ্ছে, অনেক স্ক্যাম নেটওয়ার্ক কম্বোডিয়ায় স্থানান্তরিত হলেও মায়ানমারের কিছু এলাকায় এখনো এই কার্যক্রম সক্রিয় রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, মিং পরিবারের বিরুদ্ধে এই রায় চীনের পক্ষ থেকে একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক ও আইনি বার্তা—সীমান্তবর্তী এলাকায় জালিয়াতি, মানব পাচার ও অনলাইন প্রতারণার বিরুদ্ধে তারা কোনো আপস করবে না। একই সঙ্গে এটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্যও একটি সতর্ক সংকেত যে, এই ধরনের অপরাধ শুধু স্থানীয় সমস্যা নয়, বরং বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও মানবাধিকারের জন্য বড় হুমকি।

সব মিলিয়ে, মায়ানমারের স্ক্যাম মাফিয়ার বিরুদ্ধে চীনের এই কঠোর রায় শুধু অতীতের অপরাধের বিচার নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্য একটি দৃষ্টান্ত। এটি দেখিয়ে দিল, দীর্ঘদিনের অপরাধ সাম্রাজ্যও শেষ পর্যন্ত আইনের হাত থেকে রেহাই পায় না।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত