সমুদ্রের নিচে ক্ষেপণাস্ত্র সুড়ঙ্গ উন্মোচন, হুঁশিয়ার ইরান

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৪৬ বার
সমুদ্রের নিচে ক্ষেপণাস্ত্র সুড়ঙ্গ উন্মোচন, হুঁশিয়ার ইরান

প্রকাশ: ২৯ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে সমুদ্রের নিচে গোপনে নির্মিত ‘ক্ষেপণাস্ত্র সুড়ঙ্গ’ বা আন্ডারসি মিসাইল টানেল নেটওয়ার্ক উন্মোচন করেছে ইরান। তেহরানের দাবি, এই সুড়ঙ্গগুলোর ভেতরে শত শত দূরপাল্লার ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র মজুত রয়েছে, যা প্রয়োজনে একযোগে মোতায়েন করা সম্ভব। একই সঙ্গে ইরান স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করে জানিয়েছে, দেশটির ওপর কোনো ধরনের সামরিক হামলা হলে হরমুজ প্রণালি আর নিরাপদ থাকবে না। এই ঘোষণাকে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে একটি বড় ধরনের বার্তা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

সংবাদমাধ্যম দ্য নিউ আরবের বরাতে জানা গেছে, ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক বিশেষ প্রতিবেদনে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) নৌবাহিনীর কমান্ডার আলিরেজা তাংসিরিকে সমুদ্রের নিচে অবস্থিত একটি ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনার ভেতরে হাঁটতে দেখা যায়। সম্প্রচারে সারিবদ্ধভাবে সাজানো উৎক্ষেপণের জন্য প্রস্তুত রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্রের দৃশ্য দেখানো হয়, যা ইরানের সামরিক সক্ষমতার একটি শক্তিশালী প্রদর্শন বলে মনে করা হচ্ছে।

আলিরেজা তাংসিরি বলেন, আইআরজিসি নৌবাহিনীর কাছে সমুদ্রের নিচে বিস্তৃত ক্ষেপণাস্ত্র টানেলের একটি সমন্বিত নেটওয়ার্ক রয়েছে। পারস্য উপসাগর ও ওমান সাগরের গুরুত্বপূর্ণ অংশজুড়ে বিস্তৃত এই নেটওয়ার্ক মূলত সেখানে অবস্থানরত বা চলাচলকারী মার্কিন যুদ্ধজাহাজ মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। তার ভাষায়, এই অবকাঠামো ইরানের প্রতিরক্ষামূলক কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং যেকোনো হুমকির জবাব দিতে সক্ষম।

আইআরজিসি নৌবাহিনীর কমান্ডার আরও জানান, এসব সুড়ঙ্গে এক হাজার কিলোমিটারেরও বেশি পাল্লার শত শত ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র সংরক্ষণ করা হয়েছে। বিশেষ করে ‘কাদের ৩৮০ এল’ নামের ক্ষেপণাস্ত্রের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর পাল্লা এক হাজার কিলোমিটারের বেশি এবং এতে অত্যাধুনিক স্মার্ট গাইডেন্স ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়েছে। এই প্রযুক্তি ক্ষেপণাস্ত্রকে আঘাতের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লক্ষ্যবস্তু অনুসরণ করার সক্ষমতা দেয়, যা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

এই ঘোষণার সময়টি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ সম্প্রতি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা নতুন করে বাড়ছে। পারমাণবিক কর্মসূচি, আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি—সবকিছু মিলিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক এখনো চরম অবিশ্বাসের মধ্যে রয়েছে। এরই মধ্যে সমুদ্রের নিচে ক্ষেপণাস্ত্র টানেলের তথ্য প্রকাশ করে ইরান কার্যত জানিয়ে দিল, তারা শুধু স্থল ও আকাশপথেই নয়, বরং পানির নিচ থেকেও শক্তিশালী আঘাত হানার সক্ষমতা অর্জন করেছে।

ইরানের পক্ষ থেকে হরমুজ প্রণালি নিয়ে দেওয়া বক্তব্য আন্তর্জাতিক মহলে বিশেষ মনোযোগ কাড়ছে। আইআরজিসি নৌবাহিনীর রাজনৈতিক উপ-প্রধান মোহাম্মদ আকবরজাদেহ বলেছেন, আকাশ, ভূখণ্ড এবং পানির নিচসহ সব ক্ষেত্রেই হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। ফার্স নিউজ এজেন্সিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, এই প্রণালির প্রতিটি গতিবিধি তাৎক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ করার মতো গোয়েন্দা সক্ষমতা ইরানের রয়েছে।

আকবরজাদেহের মতে, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা মূলত তেহরানে নেওয়া সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। ইরান চাইলে এই জলপথ পুরোপুরি নিরাপদ রাখতে পারে, আবার চাইলে পরিস্থিতি বদলেও দিতে পারে। তার এই বক্তব্যকে অনেকেই কৌশলগত হুঁশিয়ারি হিসেবে দেখছেন, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের উদ্দেশে।

হরমুজ প্রণালি বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সামুদ্রিক পথ। প্রতিদিন এই প্রণালি দিয়ে প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ ব্যারেলের বেশি তেল পরিবাহিত হয়, যা বৈশ্বিক তেল পরিবহনের প্রায় ৩৭ শতাংশের সমান। ফলে এই প্রণালিতে সামান্য অস্থিরতাও বিশ্ববাজারে তেলের দামে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। ইরানের সাম্প্রতিক বক্তব্য ও সামরিক প্রদর্শন তাই শুধু সামরিক নয়, অর্থনৈতিক দিক থেকেও বড় বার্তা বহন করছে।

ইরানি নৌবাহিনীর এই কর্মকর্তা আরও বলেন, আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় বিভিন্ন দেশের পতাকাবাহী জাহাজ শনাক্ত ও অনুসরণ করতে ইরান সক্ষম। তেহরান যুদ্ধ চায় না, তবে যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া হলে কঠোর জবাব দেওয়া হবে বলেও তিনি হুঁশিয়ারি দেন। তার ভাষায়, বিশেষ করে আকাশ প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে ইরানের প্রস্তুতি এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সমুদ্রের নিচে ক্ষেপণাস্ত্র সুড়ঙ্গের তথ্য প্রকাশের মাধ্যমে ইরান একটি কৌশলগত বার্তা দিতে চেয়েছে। এটি একদিকে যেমন প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানোর কৌশল, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণভাবে শক্তি ও আত্মবিশ্বাস প্রদর্শনেরও অংশ। মধ্যপ্রাচ্যের জটিল ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় এই ধরনের ঘোষণা পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলতে পারে বলে মত অনেকের।

তবে একই সঙ্গে ইরান দাবি করছে, তাদের এই প্রস্তুতি সম্পূর্ণরূপে প্রতিরক্ষামূলক। দেশটির কর্মকর্তাদের ভাষ্য, তারা কোনো যুদ্ধ শুরু করতে আগ্রহী নয়, বরং নিজেদের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষাই তাদের প্রধান লক্ষ্য। তবুও আন্তর্জাতিক মহল সতর্ক দৃষ্টিতে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে, কারণ হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে যেকোনো ভুল হিসাব বৈশ্বিক সংকট ডেকে আনতে পারে।

সব মিলিয়ে, সমুদ্রের নিচে ক্ষেপণাস্ত্র টানেল উন্মোচনের এই ঘটনা ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। এটি শুধু সামরিক শক্তির প্রদর্শন নয়, বরং একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক ও কৌশলগত বার্তা, যার প্রভাব আগামী দিনে মধ্যপ্রাচ্য ও বৈশ্বিক রাজনীতিতে গভীরভাবে অনুভূত হতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত