নিপাহ আতঙ্কে কড়া নজরদারি: ভারত-বাংলাদেশি যাত্রীদের স্ক্রিনিং

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ১০ বার
নিপাহ আতঙ্কে কড়া নজরদারি: ভারত-বাংলাদেশি যাত্রীদের স্ক্রিনিং

প্রকাশ: ২৯ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

প্রাণঘাতী নিপাহ ভাইরাসের সম্ভাব্য বিস্তার রোধে আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা জোরদার করেছে মালয়েশিয়া। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আন্তর্জাতিক প্রবেশপথগুলোতে বিশেষ স্ক্রিনিং কার্যক্রম শুরু করেছে, যার মূল লক্ষ্য ভারত ও বাংলাদেশ থেকে আগত যাত্রীরা। কর্তৃপক্ষ বলছে, এটি কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞামূলক পদক্ষেপ নয়; বরং বৈশ্বিক স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করেই নেওয়া প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ।

বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) রাজধানী কুয়ালালামপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে মালয়েশিয়ার স্বাস্থ্যমন্ত্রী জুলকেফলি আহমদ জানান, দেশের সব আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, স্থল ও নৌবন্দরসহ প্রবেশপথগুলোতে স্বাস্থ্য নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। তিনি বলেন, “নিপাহ ভাইরাসের মতো উচ্চ ঝুঁকির রোগ প্রতিরোধে আগাম সতর্কতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা চাই কোনো ধরনের সংক্রমণ যেন সীমান্ত পেরিয়ে দেশে প্রবেশ না করতে পারে।”

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, ইতোমধ্যে সব আন্তর্জাতিক প্রবেশপথে শরীরের তাপমাত্রা পরিমাপের যন্ত্র পুনরায় সচল ও সক্রিয় করা হয়েছে। যাত্রীদের মধ্যে জ্বরসহ প্রাথমিক উপসর্গ শনাক্ত করাই এর মূল লক্ষ্য। স্ক্রিনিং প্রক্রিয়ায় কোনো যাত্রীর শরীরে জ্বর ধরা পড়লে তাকে তাৎক্ষণিকভাবে আলাদা করে পরবর্তী স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য বিশেষ মেডিকেল টিমের কাছে পাঠানো হবে। প্রয়োজনে আরও পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষা শেষে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

এই নজরদারির ক্ষেত্রে ভারত ও বাংলাদেশকে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ দেশ’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। তবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, এসব দেশ থেকে আসা যাত্রীদের জন্য আলাদা কোনো রুট বা বিশেষ করিডোর তৈরি করা হয়নি। সাধারণ আগমন প্রক্রিয়ার মধ্যেই তাদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হবে। এতে যাত্রীদের অপ্রয়োজনীয় ভোগান্তি এড়ানো সম্ভব হবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

মালয়েশিয়ার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, বৈশ্বিক পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যালোচনা করেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি ভারতে নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার পর দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশ সতর্ক অবস্থানে গেছে। মালয়েশিয়াও তার ব্যতিক্রম নয়। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জুলকেফলি আহমদ বলেন, “আমরা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছি। আন্তর্জাতিক মান ও বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতেই আমাদের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাগুলো সময়োপযোগীভাবে হালনাগাদ করা হচ্ছে।”

নিপাহ ভাইরাস মূলত একটি জুনোটিক ভাইরাস, যা প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে সংক্রমিত হয়। অতীতে দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশে এর প্রাদুর্ভাব দেখা গেছে। উচ্চ মৃত্যুহার এবং দ্রুত জটিলতা তৈরি করার ক্ষমতার কারণে ভাইরাসটিকে অত্যন্ত বিপজ্জনক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাই সম্ভাব্য সংক্রমণ ঠেকাতে প্রাথমিক পর্যায়ে নজরদারি ও স্ক্রিনিংকে সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হিসেবে দেখছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

মালয়েশিয়ার স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, বর্তমানে দেশের সব প্রবেশপথে স্বাস্থ্যকর্মীরা উচ্চ সতর্কতায় রয়েছেন। নিয়মিতভাবে স্ক্রিনিং ডেটা বিশ্লেষণ করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য বিশেষ টাস্কফোর্স প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পাশাপাশি বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ, ইমিগ্রেশন বিভাগ এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানো হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধরনের পদক্ষেপ শুধু মালয়েশিয়ার জন্য নয়, গোটা অঞ্চলের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক ভ্রমণ বেড়ে যাওয়ায় এক দেশ থেকে আরেক দেশে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি। ফলে আগাম সতর্কতা এবং সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও বলেন, এই স্ক্রিনিং কার্যক্রম সাময়িক হলেও পরিস্থিতি অনুযায়ী তা বাড়ানো বা কমানো হতে পারে। “আমাদের লক্ষ্য আতঙ্ক সৃষ্টি করা নয়, বরং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা,” বলেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি যাত্রীদের সহযোগিতা কামনা করে বলেন, স্ক্রিনিং প্রক্রিয়ায় কোনো অসুবিধা হলেও সবাই যেন ধৈর্য ও দায়িত্বশীল আচরণ করেন।

এদিকে, ভারত ও বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়াগামী যাত্রীদের জন্য দূতাবাস ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকেও সচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভ্রমণের আগে স্বাস্থ্য সংক্রান্ত তথ্য জানার পাশাপাশি যাত্রাপথে কোনো উপসর্গ দেখা দিলে তা লুকিয়ে না রেখে কর্তৃপক্ষকে জানাতে অনুরোধ করা হচ্ছে।

সব মিলিয়ে, নিপাহ ভাইরাসের সম্ভাব্য বিস্তার ঠেকাতে মালয়েশিয়ার এই পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশ্বায়নের এই যুগে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে একক দেশের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; বরং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সমন্বয়ই পারে বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলা করতে। মালয়েশিয়ার নেওয়া এই আগাম সতর্কতা সেই দিকেই একটি বাস্তবসম্মত ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত