ইমরান খানকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল: পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৪৮ বার
ইমরান খানের চিকিৎসা নিয়ে বক্তব্য

প্রকাশ: ২৯ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

পাকিস্তানের রাজনীতিতে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) দলের কারাবন্দি নেতা ইমরান খান। তার শারীরিক অবস্থা, বিশেষ করে চোখের জটিল রোগ নিয়ে দলের নেতাকর্মী ও পরিবারের পক্ষ থেকে গভীর উদ্বেগ প্রকাশের মধ্যেই পাকিস্তান সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে, ইমরান খানকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। দেশটির তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন বলে জানিয়েছে পাকিস্তানের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম এক্সপ্রেস ট্রিবিউন।

২০২৩ সালের আগস্ট মাস থেকে তোশাখানা ও দুর্নীতিসহ একাধিক মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা কারাগারে বন্দি রয়েছেন পাকিস্তানের সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী। সাবেক ক্রিকেট তারকা থেকে রাজনীতিতে আসা ইমরান খান দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তানের রাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী ও বিতর্কিত চরিত্র। কারাবন্দি অবস্থায় তার শারীরিক অবস্থা নিয়ে বিভিন্ন সময় উদ্বেগ তৈরি হলেও সাম্প্রতিক দিনগুলোতে চোখের গুরুতর সমস্যার খবর সেই উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে তোলে।

চলতি সপ্তাহে পিটিআইয়ের চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার গহর খান এবং ইমরান খানের বোনেরা প্রকাশ্যে অভিযোগ করেন, কারাগারে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না পাওয়ায় ইমরান খানের শারীরিক অবস্থা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বিশেষ করে তার চোখে ‘রেটিনাল ভেইন অক্লুশন’ নামের একটি জটিল সমস্যা ধরা পড়েছে বলে দাবি করেন তারা। এই রোগের কারণে সময়মতো চিকিৎসা না হলে স্থায়ীভাবে দৃষ্টিশক্তি হারানোর আশঙ্কা থাকে বলেও জানান পিটিআই নেতারা।

এই দাবির পর পাকিস্তানের রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। বিরোধী দল ও মানবাধিকারকর্মীরা অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে সরকার ইমরান খানের ন্যূনতম চিকিৎসা অধিকারও নিশ্চিত করছে না। এমন প্রেক্ষাপটে তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারারের বক্তব্যকে সরকারের পক্ষ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তথ্যমন্ত্রী তারার বলেন, পিটিআই নেতাদের পক্ষ থেকে ইমরান খানের শারীরিক অবস্থা ও চোখের সমস্যা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করার পর সরকার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে। সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং সেই অংশ হিসেবেই তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। তার বক্তব্যে সরকার যে বিষয়টি অস্বীকার করছে না, বরং চিকিৎসার বিষয়টি স্বীকার করছে—তা স্পষ্টভাবে উঠে আসে।

আতাউল্লাহ তারার জানান, প্রথমে বিশেষজ্ঞ চক্ষু চিকিৎসকদের একটি দল আদিয়ালা কারাগারে গিয়ে ইমরান খানের শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা করে। কারাগারের ভেতরেই প্রাথমিক পরীক্ষা সম্পন্ন করা হয়। পরে চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী আরও উন্নত পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন দেখা দিলে তাকে ইসলামাবাদের পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সেস বা পিমস হাসপাতালে নেওয়া হয়, যা দেশটির অন্যতম প্রধান সরকারি হাসপাতাল।

তিনি আরও জানান, গত শনিবার রাতে ইমরান খানের চোখের বিস্তারিত পরীক্ষা করা হয়। প্রায় ২০ মিনিট ধরে চলা এই পরীক্ষার মাধ্যমে চিকিৎসকরা তার চোখের বর্তমান অবস্থা মূল্যায়ন করেন এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নির্দেশনা দেন। পরীক্ষা শেষে তাকে পুনরায় আদিয়ালা কারাগারে ফিরিয়ে আনা হয়। তথ্যমন্ত্রীর দাবি অনুযায়ী, পুরো প্রক্রিয়াটি চিকিৎসা নির্দেশনা ও কারা বিধি অনুসরণ করেই সম্পন্ন করা হয়েছে।

তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার জোর দিয়ে বলেন, ইমরান খান বর্তমানে সম্পূর্ণ সুস্থ আছেন এবং তার শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল। তিনি বলেন, পাকিস্তানের কারা ব্যবস্থার নিয়ম অনুযায়ী অন্যান্য বন্দিদের মতো ইমরান খানকেও নিয়মিত চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে তার শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

তবে সরকারের এই বক্তব্যে পুরোপুরি সন্তুষ্ট নয় পিটিআই। দলটির নেতারা এখনও দাবি করে আসছেন, সরকারি চিকিৎসকদের পাশাপাশি ইমরান খানের ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের দিয়েও তাকে পরীক্ষা করার সুযোগ দিতে হবে। তাদের মতে, একটি গুরুতর চোখের রোগের ক্ষেত্রে স্বাধীন ও বিশ্বস্ত চিকিৎসা মতামত অত্যন্ত জরুরি, বিশেষ করে যখন বিষয়টি একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যঝুঁকির সঙ্গে জড়িত।

পিটিআই নেতাদের অভিযোগ, কারাগারে থাকা অবস্থায় ইমরান খানের শারীরিক অবস্থা নিয়ে সরকারের বক্তব্য ও বাস্তবতার মধ্যে বড় ধরনের ফারাক রয়েছে। তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন, চিকিৎসা নিয়ে গাফিলতি হলে এর দায় সরকারকেই নিতে হবে। অন্যদিকে সরকার দাবি করছে, রাজনৈতিক চাপ বা জনমতের কারণে নয়, বরং আইন ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি বিবেচনায় রেখেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করা হচ্ছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইমরান খানের স্বাস্থ্য নিয়ে এই বিতর্ক পাকিস্তানের রাজনীতির গভীর মেরুকরণেরই প্রতিফলন। একদিকে সরকার আইনগত ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার কথা বলছে, অন্যদিকে বিরোধী দল এটিকে রাজনৈতিক নিপীড়নের অংশ হিসেবে তুলে ধরছে। এই টানাপোড়েনের মধ্যে সাধারণ মানুষের সহানুভূতি ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি ক্রমেই ইমরান খানের স্বাস্থ্য পরিস্থিতির দিকে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, কোনো বন্দিই তার চিকিৎসা অধিকার থেকে বঞ্চিত হতে পারেন না, তিনি যত বড় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বই হোন বা যত গুরুতর অপরাধে দণ্ডিতই হোন না কেন। এই নীতির আলোকে ইমরান খানের চিকিৎসা ইস্যুটি কেবল একটি রাজনৈতিক বিষয় নয়, বরং এটি মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

সব মিলিয়ে, ইমরান খানকে হাসপাতালে নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে নেওয়ার মাধ্যমে পাকিস্তান সরকার চলমান উদ্বেগ কিছুটা প্রশমিত করার চেষ্টা করেছে। তবে বিরোধী দলের আস্থার সংকট এবং চিকিৎসা নিয়ে চলমান সন্দেহ পুরোপুরি দূর হয়নি। ভবিষ্যতে তার শারীরিক অবস্থার উন্নতি বা অবনতি পাকিস্তানের রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিতে পারে বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত