সঞ্চয়পত্রে হঠাৎ দ্বিগুণ উৎসে কর, কমছে মুনাফা বাড়ছে উদ্বেগ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৬৬ বার
সঞ্চয়পত্রে হঠাৎ দ্বিগুণ উৎসে কর, কমছে মুনাফা বাড়ছে উদ্বেগ

প্রকাশ: ৩০ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে হঠাৎ করেই উৎসে কর দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ায় দেশের লাখো ছোট বিনিয়োগকারীর মধ্যে তীব্র উদ্বেগ ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা বা প্রজ্ঞাপন ছাড়াই জানুয়ারি মাস থেকে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর ৫ শতাংশের পরিবর্তে ১০ শতাংশ উৎসে কর কেটে নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন মধ্যবিত্ত, অবসরপ্রাপ্ত ও গৃহিণী শ্রেণির ছোট বিনিয়োগকারীরা, যারা মাসিক মুনাফার ওপর নির্ভর করে সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটান।

রাজধানীর হাজারীবাগ এলাকার গৃহিণী সালমা আক্তার সেই ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের একজন। তিনি সোনালী ব্যাংকের ট্যানারি মোড় শাখা থেকে পাঁচ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র কিনেছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি প্রতি মাসে নিয়মিত চার হাজার ৫৬০ টাকা করে মুনাফা পেয়ে আসছিলেন। কিন্তু চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে হঠাৎ করে সেই মুনাফা কমে দাঁড়ায় চার হাজার ৩২১ টাকায়। মাত্র এক মাসের ব্যবধানে ২৩৯ টাকা কমে যাওয়ায় তিনি চিন্তিত হয়ে ব্যাংক শাখায় যোগাযোগ করেন। সেখানে জানতে পারেন, মুনাফার ওপর উৎসে কর ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। কোনো ঘোষণা ছাড়াই এভাবে কর বাড়ানোয় তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। সালমা আক্তারের মতো অসংখ্য গ্রাহক একই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হচ্ছেন বলে ব্যাংক ও পোস্ট অফিস সূত্রে জানা গেছে।

জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের উপপরিচালক (প্রশাসন ও জনসংযোগ) মো. রেজানুর রহমান এ প্রসঙ্গে জানান, আগে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে উৎসে কর ছিল ৫ শতাংশ এবং পাঁচ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগে কর ছিল ১০ শতাংশ। তবে আয়কর আইন ২০২৩ অনুযায়ী সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের সব ক্ষেত্রেই ১০ শতাংশ উৎসে কর আরোপের বিধান রাখা হয়েছিল। বাস্তবতা বিবেচনায় গত ডিসেম্বর পর্যন্ত এই ক্ষেত্রে একটি ছাড় কার্যকর ছিল। জানুয়ারি মাস থেকে সেই ছাড় প্রত্যাহার করা হয়েছে, ফলে এখন সব বিনিয়োগকারীর ক্ষেত্রেই ১০ শতাংশ উৎসে কর কাটা হচ্ছে। এর কারণেই পাঁচ লাখ টাকার কম বিনিয়োগকারীরা জানুয়ারিতে আগের তুলনায় কম মুনাফা পাচ্ছেন।

তবে এ বিষয়ে কোনো প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে কি না—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, বিষয়টি অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগকে জানানো হয়েছে, কিন্তু এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো প্রজ্ঞাপন জারি হয়নি। বিষয়টি আরও জটিল করে তুলেছে এই বক্তব্য। কারণ কর আরোপ বা ছাড় প্রত্যাহারের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত সাধারণত প্রজ্ঞাপন বা গেজেট আকারে প্রকাশের বিধান রয়েছে।

এদিকে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সচিব ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান জানান, এ বিষয়ে তিনি অবগত নন। তিনি বলেন, আগামী রোববার জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করবেন। সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে এ ধরনের বিভ্রান্তিকর অবস্থান বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক এলাকার বাসিন্দা কমরুল ইসলাম তাঁর স্ত্রীর নামে জনতা ব্যাংকের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা থেকে পাঁচ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র কিনেছিলেন। তিনিও জানুয়ারি মাসে মুনাফা কমে যাওয়ার বিষয়টি টের পেয়ে ব্যাংকে যোগাযোগ করেন। সেখানে জানতে পারেন, উৎসে কর দ্বিগুণ কেটে নেওয়া হয়েছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কোনো ধরনের প্রজ্ঞাপন বা সরকারি ঘোষণা ছাড়া হঠাৎ করে এভাবে কর বাড়ানো আইনসম্মত নয়। অবিলম্বে আগের হারে উৎসে কর কার্যকর করে কমে যাওয়া মুনাফা ফেরত দেওয়ার দাবি জানান তিনি।

অর্থনীতিবিদদের মতে, সঞ্চয়পত্র মূলত মধ্যবিত্ত ও অবসরপ্রাপ্ত মানুষের নিরাপদ বিনিয়োগের অন্যতম মাধ্যম। ঝুঁকিপূর্ণ শেয়ারবাজার বা অন্যান্য বিনিয়োগের তুলনায় সঞ্চয়পত্রকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বিবেচনা করেন সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে ছোট বিনিয়োগকারীদের জন্য তুলনামূলক কম উৎসে কর এই খাতে বিনিয়োগের একটি বড় প্রণোদনা ছিল। হঠাৎ করে সেই সুবিধা তুলে নেওয়ায় সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের আকর্ষণ অনেকটাই কমে যাবে বলে তারা মনে করছেন।

হাজারীবাগের সালমা আক্তার বলেন, “আমরা যারা ছোট বিনিয়োগকারী, তাদের ওপর নীরবে কর বাড়ানো হলো। কোথাও কোনো ঘোষণা নেই, কোনো প্রজ্ঞাপন নেই। এভাবে চুপিসারে সিদ্ধান্ত নেওয়া কেন?” একই ক্ষোভ প্রকাশ করেন জিগাতলার পোস্ট অফিস এলাকার বাসিন্দা আয়েশা। তিনি জানান, দুই লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে তিনি এক হাজার ৮২৪ টাকা মুনাফা পেয়েছিলেন। কিন্তু একই বিনিয়োগ থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে মুনাফা এসেছে মাত্র এক হাজার ৭২৮ টাকা। এই সামান্য অর্থ দিয়েই তিনি সংসারের টুকিটাকি খরচ চালান। তাঁর প্রশ্ন, এখানেও কি সরকারের করের হাত পড়বে?

উল্লেখ্য, গত ৩১ ডিসেম্বর সরকার একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে ১ জানুয়ারি থেকে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার কমানোর ঘোষণা দিয়েছিল। তবে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার মুখে চার দিনের মাথায় সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করা হয়। ফলে ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত যে মুনাফার হার ছিল, তা চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেও বহাল রয়েছে। অথচ মুনাফার হার অপরিবর্তিত থাকলেও উৎসে কর বাড়িয়ে দেওয়ায় বিনিয়োগকারীদের প্রকৃত আয় কমে গেছে।

বর্তমানে সঞ্চয়পত্রের বিনিয়োগকারীদের জন্য দুটি ধাপ বহাল রয়েছে। সাত লাখ ৫০ হাজার টাকার নিচে বিনিয়োগকারীরা প্রথম ধাপে এবং এর বেশি বিনিয়োগকারীরা দ্বিতীয় ধাপে পড়ছেন। স্কিমভেদে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার সর্বোচ্চ ১১ দশমিক ৮২ শতাংশ থেকে ১১ দশমিক ৯৮ শতাংশ পর্যন্ত। কিন্তু উৎসে কর বাড়ার ফলে এই হার কাগজে-কলমে যতটা আকর্ষণীয়, বাস্তবে বিনিয়োগকারীরা তার পুরো সুফল পাচ্ছেন না।

সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারের রাজস্ব বাড়ানোর চাপ থাকলেও ছোট বিনিয়োগকারীদের ওপর নীরবে অতিরিক্ত করের বোঝা চাপানো সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। স্বচ্ছতা ও পূর্বঘোষণা ছাড়া এ ধরনের সিদ্ধান্ত বিনিয়োগকারীদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এখন বিনিয়োগকারীরা তাকিয়ে আছেন সরকারের পরবর্তী সিদ্ধান্তের দিকে—এই করনীতি বহাল থাকবে নাকি জনস্বার্থে পুনর্বিবেচনা করা হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত