পাকিস্তান সিরিজেই সাকিবকে ফেরাতে চায় বিসিবি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৩৮ বার
পাকিস্তান সিরিজেই সাকিবকে ফেরাতে চায় বিসিবি

প্রকাশ: ৩০ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশ ক্রিকেটের সবচেয়ে আলোচিত নাম সাকিব আল হাসানকে আবার জাতীয় দলের জার্সিতে ফেরানোর ইচ্ছা এবার প্রকাশ্যেই জানিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। দীর্ঘ সময় ধরে নানা জটিলতায় থমকে থাকা সেই প্রত্যাবর্তন পরিকল্পনায় এবার নির্দিষ্ট সময়সীমাও ঠিক করে ফেলেছে বোর্ড। বিসিবির চাওয়া, আগামী মার্চে ঘরের মাঠে পাকিস্তানের বিপক্ষে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ দিয়েই আবার জাতীয় দলে ফিরুন সাকিব। বোর্ডের এই অবস্থান বাংলাদেশের ক্রিকেট অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে—এটি কি সাকিব অধ্যায়ের শেষের শুরু, নাকি আরেকটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা?

সাকিব আল হাসান আগেও একাধিকবার দেশে ফিরে জাতীয় দলে খেলতে চেয়েছেন। বিশেষ করে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ঘরের মাঠে টেস্ট খেলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় জানানোর ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন তিনি। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ–অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক বাস্তবতায় পরিস্থিতি বদলে যায়। ওই বছরের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য হওয়া সাকিব এরপর আর দেশে ফিরতে পারেননি। তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা থাকায় দেশে এলে গ্রেপ্তারের আশঙ্কা ছিল, পাশাপাশি রাজনৈতিক বিরোধিতার মুখে পড়ার শঙ্কাও কম ছিল না। ফলে তাঁর বিদায়ী টেস্ট খেলার স্বপ্ন অপূর্ণই থেকে যায়।

ফারুক আহমেদের বোর্ড সভাপতি থাকার সময় থেকেই বিসিবির ভেতরে সাকিবকে ফেরানোর চেষ্টা চলছিল। তবে রাজনৈতিক বাস্তবতা ও নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কারণে সে উদ্যোগ সফল হয়নি। বর্তমান সভাপতি আমিনুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন বোর্ডেও শুরু থেকেই সাকিবকে ফেরানোর একটি চাপা আকাঙ্ক্ষা ছিল। পরিচালকদের মধ্যে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা হলেও বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে বোর্ড সভায় আসে প্রথমবার ২৪ জানুয়ারি। সেই সভাই মূলত সাকিব প্রত্যাবর্তন ইস্যুকে নতুন করে সামনে নিয়ে আসে।

সেই সভা শেষে বিসিবির মিডিয়া কমিটির প্রধান আমজাদ হোসেন সাংবাদিকদের জানান, সাকিব আল হাসানকে আবার জাতীয় দলের জন্য বিবেচনায় রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বোর্ড। ফর্ম ও ফিটনেস সন্তোষজনক হলে নির্বাচকেরা তাঁকে দলে নিতে পারবেন—এ কথাও স্পষ্ট করে বলা হয়। একই দিনে বিসিবির পরিচালক আসিফ আকবর সংবাদ সম্মেলনে জানান, বিষয়টি নিয়ে সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছেন বোর্ড সভাপতি আমিনুল ইসলাম। অর্থাৎ, সাকিবের ফেরাটা কেবল ক্রিকেটীয় সিদ্ধান্তেই সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাষ্ট্রীয় অনুমোদন ও নিরাপত্তার প্রশ্নও।

সর্বশেষ পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আসিফ আকবর জানান, বোর্ড সভাপতি সরকারের যথাযথ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। তাঁর ভাষায়, বিসিবি আশাবাদী যে মার্চে পাকিস্তানের বিপক্ষে ঘরের মাঠের সিরিজেই সাকিবকে আবার জাতীয় দলে দেখা যাবে। এই সিরিজই কি সাকিবের দেশের হয়ে শেষ সিরিজ হবে—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, বোর্ড চায় সাকিব আবার দেশের হয়ে খেলুক এবং সেটি পাকিস্তান সিরিজ থেকেই শুরু হোক। এরপর তিনি খেলা চালিয়ে যাবেন কি না, সেটি সম্পূর্ণ তাঁর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত।

বাংলাদেশে পাকিস্তানের আসন্ন সফরটি হবে দুই ভাগে। মার্চে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ খেলে পাকিস্তান দল দেশে ফিরবে। এরপর পাকিস্তান সুপার লিগ (পিএসএল) শেষ হলে মে মাসে আবার বাংলাদেশে এসে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজ খেলবে। বিসিবির পরিকল্পনা অনুযায়ী, সাকিবকে ওয়ানডে সিরিজ দিয়েই ফেরানো হলে টেস্ট সিরিজে তাঁর অংশগ্রহণ নিয়েও নতুন করে ভাবার সুযোগ থাকবে।

বোর্ড সূত্র জানায়, দেশের হয়ে খেলার ব্যাপারে সাকিবের সঙ্গে বিসিবির বর্তমান যোগাযোগ শুরু হয় প্রায় এক মাস আগে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বোর্ড পরিচালক বলেন, সাকিব নিজেই এবার আগ্রহ দেখিয়েছেন। তাঁর ধারণা, সরকারের ভেতরে কিছু পরিবর্তন আসায় সাকিব আত্মবিশ্বাসী হয়েছেন যে এবার উদ্যোগ নিলে ইতিবাচক কিছু হতে পারে। বিসিবিও মনে করে, জাতীয় দলের হয়ে সাকিবের খেলায় কোনো নৈতিক বা ক্রীড়াগত বাধা থাকা উচিত নয়। বাংলাদেশের ক্রিকেটে তাঁর অবদান বিবেচনায় নিয়ে দেশের মাটিতে খেলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় জানানোর সুযোগ পাওয়াটা তাঁর প্রাপ্য সম্মান।

উল্লেখ্য, সাকিবের বিরুদ্ধে মামলা থাকা সত্ত্বেও তাঁকে জাতীয় দলে নেওয়ার ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক কোনো নিষেধাজ্ঞা আগে ছিল না। তবে সাবেক ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া প্রকাশ্যে তাঁর দেশে ফেরার বিরোধিতা করেছিলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুজনের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য সেই সময় পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। সেই প্রেক্ষাপটে বিসিবির পক্ষে সাকিবের হয়ে দৃঢ় অবস্থান নেওয়া সম্ভব হয়নি, ফলে বিষয়টি দীর্ঘদিন চাপা পড়ে ছিল।

বর্তমানে পরিস্থিতি কিছুটা বদলেছে বলে মনে করছে বিসিবি। আসিফ মাহমুদ আর সরকারে না থাকায় বড় বাধাটি কেটে গেছে বলে বিশ্বাস বোর্ডের। যদিও সাকিবের বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলোর আইনগত নিষ্পত্তি এখনো প্রয়োজন, তবে আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল একই সঙ্গে ক্রীড়া উপদেষ্টার দায়িত্বে থাকায় এ বিষয়ে অগ্রগতি আগের চেয়ে সহজ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিসিবির ধারণা, সরকারের মনোভাবও এখন অনেকটা ইতিবাচক।

তবে বাস্তবতা হলো, ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের আগে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের হাতে খুব বেশি সময় নেই। এত অল্প সময়ের মধ্যে সাকিবের ফেরার প্রক্রিয়াকে কতটা মসৃণ করা যাবে—এ নিয়ে সংশয়ও আছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বোর্ড পরিচালক বলেন, মার্চের আগে এখনো সময় আছে। প্রক্রিয়া শুরু করতে সমস্যা নেই, আর নির্বাচনের পর পরিস্থিতি আরও সহজও হতে পারে।

এদিকে বিসিবির সিদ্ধান্তের পর নিউইয়র্কে অবস্থানরত সাকিব আল হাসানের সঙ্গেও কথা হয়েছে। তিনি আনুষ্ঠানিক কোনো বিবৃতি না দিলেও বাংলাদেশের হয়ে আবার খেলতে চান—এ ব্যাপারে কোনো দ্বিধা রাখেননি। সাকিব আশাবাদী যে সরকারের সঙ্গে বিসিবির আলোচনার মাধ্যমে তাঁর দেশে আসা ও জাতীয় দলের হয়ে খেলার পথ তৈরি হবে। পাকিস্তান সিরিজকেই তিনি নিজের প্রত্যাবর্তনের সম্ভাব্য মঞ্চ হিসেবে দেখছেন।

সব মিলিয়ে, সাকিব আল হাসানের প্রত্যাবর্তন শুধু একটি ক্রিকেটীয় ঘটনা নয়, এটি রাজনীতি, আইন ও আবেগের এক জটিল সমীকরণ। বিসিবি যদি তাদের পরিকল্পনায় সফল হয়, তাহলে পাকিস্তান সিরিজে সাকিবের ফেরা বাংলাদেশের ক্রিকেটে এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত হয়ে উঠতে পারে। আর যদি তা সম্ভব না হয়, তবে এই অধ্যায়টি হয়তো থেকে যাবে অপূর্ণতার গল্প হয়েই। দেশের ক্রিকেটপ্রেমীরা এখন তাকিয়ে আছেন মার্চের দিকে, অপেক্ষায় এক চেনা নামের আবার মাঠে নামার।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত