প্রকাশ: ৩০ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আমদানি নিষিদ্ধ পণ্যের প্রবেশ ঠেকাতে, শুল্ক ফাঁকি রোধে এবং জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকি কমাতে কঠোর অবস্থানে গেছে চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউস। আগে যেখানে অভিযুক্ত আমদানিকারকের লাইসেন্স বাতিল বা সাময়িকভাবে স্থগিত করাই ছিল প্রধান ব্যবস্থা, সেখানে এখন সরাসরি ফৌজদারি মামলার পথে হাঁটছে কর্তৃপক্ষ। সাম্প্রতিক সময়ে পপি সিড ও ঘন চিনি আমদানির ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। একই ধারাবাহিকতায় সিগারেট ও ক্ষতিকর কসমেটিক্স আমদানিকারকদের বিরুদ্ধেও মামলা করার প্রস্তুতি চলছে বলে জানিয়েছে কাস্টমস সূত্র।
চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন মাসে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে মিথ্যা ঘোষণায় আনা অন্তত ১০টি চালান জব্দ করা হয়েছে। এসব চালানের মধ্যে মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর সোডিয়াম সাইক্লোমেট বা ঘন চিনি, মাদক তৈরির উপকরণ হিসেবে পরিচিত পপি বীজ, পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ নিষিদ্ধ কসমেটিক্স ও সিগারেট রয়েছে। বাণিজ্য নীতিমালা অনুযায়ী এসব পণ্য অনেক আগেই আমদানি নিষিদ্ধ হলেও সংঘবদ্ধ চক্র নানা কৌশলে এগুলো দেশে ঢোকানোর চেষ্টা চালাচ্ছিল।
চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের সহকারী কমিশনার শরীফ মো. আল আমিন জানান, পপি সিড ও ঘন চিনির সঙ্গে সম্পৃক্ত আমদানিকারক ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে এরই মধ্যে ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়েছে। অন্য যেসব নিষিদ্ধ পণ্য জব্দ করা হয়েছে, সেগুলোর ক্ষেত্রেও প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলমান। তাঁর ভাষায়, “শুধু লাইসেন্স ব্লক করলে অপরাধীরা নিরুৎসাহিত হয় না। তাই এখন থেকে আইনগত ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হচ্ছে।”
কাস্টমস সূত্র জানায়, পাখির খাদ্যের আড়ালে পপি সিড এবং শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে ঘন চিনি আমদানির ঘটনায় বন্দর থানায় আলাদা মামলা করা হয়েছে। এসব ঘটনায় প্রাথমিক তদন্তে মিথ্যা ঘোষণা ও এইচএস কোড পরিবর্তনের প্রমাণ মিলেছে। সংশ্লিষ্টরা শুল্ক ফাঁকি দেওয়ার পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছিল বলে মনে করছে কর্তৃপক্ষ।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) উপ-কমিশনার আমিরুল ইসলাম জানান, দায়ের করা মামলাগুলো এখনো তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। কেমিক্যাল পরীক্ষার রিপোর্ট হাতে এলে তদন্তের পরবর্তী ধাপে অগ্রসর হওয়া যাবে। তদন্তে যদি অবৈধ আমদানির বিষয়টি প্রমাণিত হয়, তাহলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পুলিশ প্রশাসন কাস্টমসের সঙ্গে সমন্বয় করে বিষয়গুলো দেখছে বলেও জানান তিনি।
চট্টগ্রাম বন্দর দেশের প্রধান বাণিজ্যিক প্রবেশদ্বার। এখানে বছরে প্রায় ৩৩ লাখ কনটেইনার হ্যান্ডেলিং হয়, যার মধ্যে প্রায় ১৫ লাখ কনটেইনার আমদানি পণ্য। পাশাপাশি বছরে প্রায় ১৩ কোটি মেট্রিক টন কার্গো পণ্য বন্দরে আসে। এত বিপুল পরিমাণ পণ্যের শতভাগ কায়িক পরীক্ষা করা কাস্টমসের পক্ষে বাস্তবসম্মত নয়। এই সীমাবদ্ধতার সুযোগ নিয়েই কিছু অসাধু আমদানিকারক নিষিদ্ধ ও মিথ্যা ঘোষণার পণ্য দেশে ঢুকিয়ে দিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
চট্টগ্রাম কাস্টম এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. শাখাওয়াত আলী বলেন, “শতভাগ পণ্য পরীক্ষা করা সম্ভব নয়। নিষিদ্ধ পণ্য ঠেকাতে আধুনিক প্রযুক্তি ও উন্নত স্ক্যানিং ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়ানোই সবচেয়ে কার্যকর উপায়।” তাঁর মতে, ঝুঁকিভিত্তিক স্ক্যানিং ও গোয়েন্দা তথ্যের সমন্বয় ঘটাতে পারলে অবৈধ আমদানি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
কাস্টমসের অভ্যন্তরীণ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, একটি সংঘবদ্ধ চক্র শুল্ক ফাঁকি দিতেই এইচএস কোড পরিবর্তন করে নিষিদ্ধ পণ্য আমদানি করছে। জব্দ হওয়া ঘন চিনি, পপি সিড, কসমেটিক্স কিংবা সিগারেট সাধারণ স্ক্যানিং মেশিনে শনাক্ত করা কঠিন। এসব পণ্যের ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য গোয়েন্দা তথ্য ও সুনির্দিষ্ট কায়িক পরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে জনবল সংকট ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক সময় তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না।
এই বাস্তবতায় স্ক্যানিং ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও জনবল বাড়ানোর দাবি উঠেছে। বিকডার মহাসচিব রুহুল আমিন সিকদার বিপ্লব বলেন, “স্ক্যানিং ডিভিশনকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। নির্দিষ্ট ও দক্ষ জনবল নিয়োগের পাশাপাশি কাস্টমসের মোট জনবল প্রয়োজন অনুযায়ী বাড়ানো জরুরি।” তাঁর মতে, প্রযুক্তি ও জনবল একসঙ্গে শক্তিশালী না হলে নিষিদ্ধ আমদানি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।
চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউজ থেকে বছরে প্রায় ৭৫ থেকে ৮০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়ে থাকে। এই বিপুল রাজস্ব আদায়ের পাশাপাশি অবৈধ আমদানি ঠেকানোও কাস্টমসের বড় দায়িত্ব। কর্মকর্তারা বলছেন, নিষিদ্ধ পণ্য শুধু রাজস্ব ক্ষতি করে না, বরং জনস্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলার জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি করে। তাই সাম্প্রতিক কঠোর অবস্থান দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক ফল দেবে বলে তারা আশা করছেন।
ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, কাস্টমসের এই কড়াকড়ি একদিকে যেমন অসাধু আমদানিকারকদের জন্য সতর্কবার্তা, অন্যদিকে বৈধ ব্যবসায়ীদের জন্যও স্বস্তির। কারণ অবৈধ আমদানি বন্ধ হলে বাজারে ন্যায্য প্রতিযোগিতা নিশ্চিত হবে। তবে একই সঙ্গে তারা চাইছেন, বৈধ পণ্যের ছাড়পত্র প্রক্রিয়া যেন অযথা জটিল না হয় এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থার মাধ্যমে হয়রানি কমানো হোক।
সব মিলিয়ে, নিষিদ্ধ পণ্য আমদানি ঠেকাতে চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের বর্তমান কঠোর অবস্থান একটি নীতিগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। লাইসেন্স বাতিলের গণ্ডি পেরিয়ে ফৌজদারি মামলার পথে যাওয়া অবৈধ চক্রের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। এখন দেখার বিষয়, আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল ও আইনি ব্যবস্থার সমন্বয়ে এই উদ্যোগ কতটা টেকসই ও কার্যকর হয়।