নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা দিতে প্রস্তুত অন্তর্বর্তী সরকার

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৪৬ বার
নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা দিতে প্রস্তুত অন্তর্বর্তী সরকার

প্রকাশ: ৩০ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রশ্নটি বরাবরই স্পর্শকাতর ও আলোচিত। ক্ষমতায় গেলে তা ধরে রাখার প্রবণতা, নির্বাচন ঘিরে অনাস্থা এবং গণতান্ত্রিক চর্চার ঘাটতি—এসব বিষয় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সমালোচনা রয়েছে। ঠিক এমন এক প্রেক্ষাপটে ধর্ম উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেনের বক্তব্য নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের লক্ষ্য ক্ষমতায় থাকা নয়, বরং একটি অবাধ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারের কাছে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করা।

বৃহস্পতিবার ২৯ জানুয়ারি বিকেলে রাজধানীর বাসাবোতে অবস্থিত ধর্মরাজিকা বৌদ্ধ মহাবিহার মিলনায়তনে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় এসব কথা বলেন ধর্ম উপদেষ্টা। গণভোটের প্রচার ও ভোটারদের উদ্বুদ্ধ করার লক্ষ্যে বৌদ্ধ ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্ট এবং খ্রিষ্টান ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্ট যৌথভাবে এ সভার আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি, সুশীল সমাজের সদস্য এবং রাজনৈতিক সচেতন নাগরিকরা উপস্থিত ছিলেন।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি দুঃখজনক প্রবণতা দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান—একবার ক্ষমতায় গেলে ছলেবলে কৌশলে চেয়ার আঁকড়ে ধরা। তিনি বলেন, “আমরা যেদিন দায়িত্ব নিয়েছি, সেদিন থেকেই বিদায়ের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি। আমাদের কাছে ক্ষমতা কোনো লক্ষ্য নয়, বরং একটি দায়িত্ব।” তার এই বক্তব্যে উপস্থিত শ্রোতাদের মধ্যে ইতিবাচক সাড়া লক্ষ্য করা যায়।

ধর্ম উপদেষ্টা আরও জানান, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ভবিষ্যৎ ক্ষমতা হস্তান্তরের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। এরই মধ্যে সরকারের অনেক উপদেষ্টা তাদের কূটনৈতিক পাসপোর্ট জমা দিয়েছেন, যা ক্ষমতা ধরে রাখার কোনো অভিপ্রায় নেই—এই বার্তাই স্পষ্ট করে। তিনি বলেন, “আমরা মানসিকভাবে প্রস্তুত রয়েছি। একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে যারা জনগণের রায়ে ক্ষমতায় আসবেন, তাদের হাতেই দায়িত্ব তুলে দেবো।”

এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সরকার যে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করতে চাচ্ছে, তা স্পষ্ট। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচন ও ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে যে অনাস্থা তৈরি হয়েছে, তা দূর করতে এমন প্রকাশ্য অঙ্গীকার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণে আয়োজিত সভা থেকে এ ধরনের বক্তব্য আসা সামাজিক সম্প্রীতির বার্তাও বহন করে।

ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন তার বক্তব্যে আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির গণভোটের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এই নির্বাচন বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। তার মতে, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হলে ভবিষ্যতে দেশে স্বৈরতন্ত্রের পুনরুত্থানের পথ বন্ধ হবে। তিনি বলেন, “ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি হবে, রাষ্ট্র পরিচালনায় জবাবদিহি নিশ্চিত হবে এবং দেশকে টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।”

তিনি আরও যোগ করেন, গণভোটের মাধ্যমে জনগণ যদি স্পষ্টভাবে মত প্রকাশ করে, তবে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। ক্ষমতা আর কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত থাকবে না; বরং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী হবে। এজন্য তিনি সবাইকে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে জনমত গড়ে তোলার আহ্বান জানান।

সভায় উপস্থিত বক্তারা বলেন, ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের একত্রিত করে গণভোট বিষয়ে আলোচনা আয়োজন একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। তারা মনে করেন, ভোটারদের সচেতন করা এবং শান্তিপূর্ণ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠনগুলোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে ভোটাধিকার ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিয়ে যে শঙ্কা থাকে, তা দূর করতে এ ধরনের মতবিনিময় সভা কার্যকর হতে পারে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় অন্তর্বর্তী বা অস্থায়ী সরকার নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। অতীতে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া ঘিরে সহিংসতা, অনাস্থা ও আন্তর্জাতিক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে বর্তমান সরকারের এই অঙ্গীকার অনেকের কাছে আশাব্যঞ্জক বলে মনে হচ্ছে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, শুধু বক্তব্য নয়—বাস্তবায়নই হবে আসল পরীক্ষা। নির্বাচন কতটা অবাধ ও নিরপেক্ষ হয়, প্রশাসন কতটা নিরপেক্ষ ভূমিকা রাখে এবং ফলাফল মেনে নেওয়ার সংস্কৃতি কতটা গড়ে ওঠে—এসব বিষয়ের ওপরই নির্ভর করবে সরকারের ঘোষণার বিশ্বাসযোগ্যতা।

ধর্ম উপদেষ্টার বক্তব্যে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল মানসিক প্রস্তুতির কথা। তিনি বারবার উল্লেখ করেন, ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য তারা মানসিকভাবে প্রস্তুত। রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এই মানসিকতার ঘাটতিকেই অনেক সময় সংকটের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ক্ষমতা ছাড়াকে যদি স্বাভাবিক ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া হিসেবে গ্রহণ করা যায়, তবে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাও নিশ্চিত হয়—এমনটাই মত বিশেষজ্ঞদের।

সভা শেষে অংশগ্রহণকারীরা আশা প্রকাশ করেন, আসন্ন গণভোট ও নির্বাচন শান্তিপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হবে এবং জনগণের মতামত প্রতিফলিত হবে। তাদের মতে, নির্বাচিত সরকারের কাছে সুষ্ঠুভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর হলে তা দেশের গণতান্ত্রিক যাত্রায় একটি নতুন অধ্যায় সূচিত করবে।

সব মিলিয়ে ধর্ম উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেনের বক্তব্য শুধু একটি রাজনৈতিক ঘোষণা নয়; এটি দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি স্পষ্ট বার্তা। ক্ষমতা নয়, জনগণের রায়ই যে চূড়ান্ত—এই অবস্থান যদি বাস্তবে প্রতিফলিত হয়, তবে বাংলাদেশ রাজনৈতিকভাবে আরও পরিণত ও স্থিতিশীল রাষ্ট্রে রূপ নিতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত