কিউবাকে তেল দিলে চড়া শুল্ক, ট্রাম্পের নতুন হুঁশিয়ারি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৫৯ বার
কিউবাকে তেল দিলে চড়া শুল্ক, ট্রাম্পের নতুন হুঁশিয়ারি

প্রকাশ: ৩০ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

কিউবার কমিউনিস্ট সরকারের ওপর চাপ আরও জোরদার করতে নতুন ও কঠোর কৌশল হাতে নিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যেসব দেশ কিউবাকে তেল সরবরাহ করবে, তাদের পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রে চড়া শুল্ক আরোপ করা হবে—এমন হুঁশিয়ারি দিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করেছেন তিনি। বৃহস্পতিবার এ–সংক্রান্ত একটি নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেন ট্রাম্প, যা কার্যত কিউবার জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খলে যুক্ত দেশগুলোর জন্য স্পষ্ট বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

নির্বাহী আদেশে কোনো নির্দিষ্ট দেশের নাম বা শুল্কের হার উল্লেখ করা হয়নি। তবে আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্তের মূল লক্ষ্য লাতিন আমেরিকার সেই দেশগুলো, যারা কিউবার দীর্ঘদিনের জ্বালানিসংকট সামাল দিতে তেল পাঠিয়ে সহায়তা করে আসছে। বিশেষ করে মেক্সিকো, কিছু ক্যারিবীয় রাষ্ট্র এবং অতীতে ভেনেজুয়েলার ভূমিকার কথা আলোচনায় আসছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব তেল সরবরাহ কিউবার সরকারকে টিকিয়ে রাখছে এবং ওয়াশিংটনের চোখে তা “অগ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক সহায়তা” হিসেবে বিবেচিত।

ট্রাম্প প্রশাসনের এই পদক্ষেপ এমন এক সময়ে এলো, যখন কিউবা ভয়াবহ অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সংকটে জর্জরিত। বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঘাটতি, জ্বালানি আমদানির সীমাবদ্ধতা এবং বৈদেশিক মুদ্রার সংকট দেশটির সাধারণ মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলেছে। দিনের পর দিন বিদ্যুৎ না থাকা, পরিবহন ব্যবস্থার বিপর্যয় এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকট কিউবার বাস্তবতা হয়ে উঠেছে। এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক হুমকি কিউবার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে বলেই আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এর আগে চলতি মাসেই যুক্তরাষ্ট্রের এক অভিযানে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনার পর থেকে কিউবার ওপর চাপ বাড়ানোর ঘোষণা দিয়ে আসছিলেন ট্রাম্প। সে সময় তিনি প্রকাশ্যে দাবি করেন, ভেনেজুয়েলা থেকে কিউবায় তেল ও অর্থ পাঠানোর পথ কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। গত সপ্তাহে দেওয়া এক বক্তব্যে ট্রাম্প বলেন, “কিউবা খুব শিগগিরই ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হতে যাচ্ছে।” তাঁর এই মন্তব্য কেবল কিউবা নয়, পুরো লাতিন আমেরিকায় তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়।

বিশ্লেষকদের মতে, কিউবার ওপর এই নতুন চাপ ট্রাম্পের বৃহত্তর পররাষ্ট্রনীতির অংশ। দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তিনি শুল্ক আরোপের হুমকিকে কূটনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন। বাণিজ্য ও শুল্ককে রাজনৈতিক চাপ তৈরির মাধ্যম হিসেবে কাজে লাগানো ট্রাম্পের জন্য নতুন কিছু নয়। চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন কিংবা প্রতিবেশী দেশগুলোর ক্ষেত্রেও তিনি অতীতে এমন কৌশল নিয়েছেন। কিউবার ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও স্পর্শকাতর, কারণ দেশটি দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে।

কিউবা সরকারের প্রতিক্রিয়াও এসেছে দ্রুত এবং কড়া ভাষায়। দেশটির প্রেসিডেন্ট মিগুয়েল দিয়াজ-ক্যানেল এক বিবৃতিতে স্পষ্ট করে বলেন, ওয়াশিংটনের এমন কোনো নৈতিক অধিকার নেই, যার মাধ্যমে তারা কিউবাকে কোনো চুক্তিতে বাধ্য করতে পারে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্তকে “আধুনিক যুগের অর্থনৈতিক আগ্রাসন” হিসেবে বর্ণনা করেন এবং বলেন, কিউবা তার সার্বভৌম সিদ্ধান্তে অটল থাকবে। তাঁর ভাষায়, “আমরা বহু দশক ধরে অবরোধের মধ্যেই টিকে আছি, এই হুমকি আমাদের আত্মসম্মান বা স্বাধীনতা কেড়ে নিতে পারবে না।”

আন্তর্জাতিক মহলেও এই সিদ্ধান্ত নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। অনেক কূটনীতিক মনে করছেন, কিউবাকে তেল সরবরাহ করা দেশগুলোর ওপর শুল্ক আরোপ করলে তা শুধু কিউবাকে নয়, বরং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে যেসব উন্নয়নশীল দেশ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের ওপর নির্ভরশীল, তাদের জন্য এই হুমকি বড় চাপ হয়ে উঠতে পারে। এতে করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দৃষ্টিতেও বিষয়টি উদ্বেগজনক। তাদের মতে, কিউবার ওপর অতিরিক্ত অর্থনৈতিক চাপ দেশটির সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়াবে। জ্বালানি সংকট তীব্র হলে হাসপাতাল, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা ও পরিবহন খাতে মারাত্মক প্রভাব পড়তে পারে। এসব সংগঠন যুক্তরাষ্ট্রকে মানবিক দিকটি বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে, যদিও ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে এখনো কোনো ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি।

ট্রাম্প প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো বলছে, এই নির্বাহী আদেশ মূলত একটি ‘ভীতি প্রদর্শনমূলক কৌশল’। উদ্দেশ্য হলো কিউবাকে আন্তর্জাতিকভাবে আরও একঘরে করা এবং দেশটির ওপর চাপ বাড়িয়ে রাজনৈতিক পরিবর্তন ত্বরান্বিত করা। তবে ইতিহাস বলছে, দীর্ঘদিনের অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা কিউবায় কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক পরিবর্তন আনতে পারেনি। বরং অনেক ক্ষেত্রে এসব পদক্ষেপ দেশটির সরকারকে আরও কঠোর অবস্থানে যেতে উৎসাহিত করেছে।

কিউবার সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। কেউ কেউ মনে করছেন, নতুন করে চাপ বাড়লে দেশের পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। আবার কেউ কেউ বিশ্বাস করেন, কিউবা অতীতেও বহু সংকট মোকাবিলা করেছে এবং এবারও কোনো না কোনোভাবে টিকে থাকবে। হাভানার এক বাসিন্দা স্থানীয় গণমাধ্যমকে বলেন, “আমরা রাজনীতির খেলায় জিম্মি। তেল না থাকলে কষ্ট বাড়বে, কিন্তু আমরা বেঁচে থাকার পথ খুঁজে নেব।”

সব মিলিয়ে, কিউবাকে তেল সরবরাহ করলে চড়া শুল্ক আরোপের হুঁশিয়ারি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন এক উত্তেজনার অধ্যায় খুলে দিয়েছে। এই সিদ্ধান্ত কিউবার অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সংকটকে আরও ঘনীভূত করতে পারে, আবার একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সম্পর্কেও টানাপোড়েন সৃষ্টি করতে পারে। এখন দেখার বিষয়, ট্রাম্পের এই হুমকি বাস্তবে কতটা কার্যকর হয় এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এর জবাবে কী অবস্থান নেয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত