৯ মাসে ২৬০ কোটি মুনাফা, বার্জারের স্থিতিশীল অগ্রযাত্রা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৬৬ বার
৯ মাসে ২৬০ কোটি মুনাফা, বার্জারের স্থিতিশীল অগ্রযাত্রা

প্রকাশ: ৩০ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশ লিমিটেড চলতি হিসাব বছরের প্রথম নয় মাসে শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছে। এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর—এই নয় মাসে কোম্পানিটি মোট ২ হাজার ১০১ কোটি টাকার ব্যবসা করেছে এবং সব ধরনের খরচ ও কর বাদ দিয়ে নিট মুনাফা অর্জন করেছে ২৬০ কোটি টাকা। আগের হিসাব বছরের একই সময়ে এই মুনাফার অঙ্ক ছিল ২৪১ কোটি টাকা। ফলে এক বছরের ব্যবধানে বার্জারের মুনাফা বেড়েছে ১৯ কোটি টাকা, যা শতাংশের হিসাবে প্রায় ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধিকে নির্দেশ করে।

গত বৃহস্পতিবার দেশের দুই স্টক এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানায় বার্জার পেইন্টস। এর আগে বুধবার কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদের সভায় নয় মাসের এই আর্থিক প্রতিবেদন অনুমোদন দেওয়া হয়। বার্জার পেইন্টসের হিসাব বছর এপ্রিল থেকে মার্চ পর্যন্ত বিবেচিত হয়। সে হিসেবে এটি কোম্পানিটির চলতি হিসাব বছরের প্রথম তিন প্রান্তিকের আর্থিক চিত্র।

আর্থিক প্রতিবেদনের বিশ্লেষণে দেখা যায়, কোম্পানিটির মোট ব্যবসার পরিমাণ আগের বছরের তুলনায় মাঝারি হারে বেড়েছে। ২০২৪ সালের এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর সময়ে যেখানে বার্জারের বিক্রয় আয় ছিল ২ হাজার ১৫ কোটি টাকা, সেখানে চলতি হিসাব বছরের একই সময়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ১০১ কোটি টাকায়। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে কোম্পানিটির ব্যবসা বেড়েছে ৮৬ কোটি টাকা, যা শতাংশের হিসাবে সোয়া ৪ শতাংশের কিছু বেশি। বাজারে নির্মাণ ও আবাসন খাতে ধীরগতির মধ্যেও এই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখাকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, ব্যবসার প্রবৃদ্ধির তুলনায় মুনাফার প্রবৃদ্ধি বেশি হয়েছে। এর পেছনে প্রধান ভূমিকা রেখেছে ব্যয় ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা এবং আর্থিক খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা। আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর সময়ে বার্জারের পরিচালন খরচ ছিল ৩৩৭ কোটি টাকা। চলতি হিসাব বছরের একই সময়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩৩২ কোটি টাকায়। অর্থাৎ নয় মাসে পরিচালন খরচ কমেছে প্রায় ৫ কোটি টাকা।

পরিচালন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি আর্থিক খরচ হ্রাস পাওয়াও মুনাফা বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রেখেছে। ঋণের সুদসহ অন্যান্য আর্থিক খরচ আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০২৪ সালের এপ্রিল–ডিসেম্বর সময়ে কোম্পানিটির সুদসহ আর্থিক খরচ ছিল ৩০ কোটি টাকা, যা চলতি হিসাব বছরের একই সময়ে কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১২ কোটি টাকায়। এক বছরের ব্যবধানে এই খাতে ব্যয় কমেছে প্রায় ১৮ কোটি টাকা। বিশ্লেষকদের মতে, ঋণ ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা, কম সুদে পুনঃঅর্থায়ন এবং নগদ প্রবাহের উন্নতির ফলেই এই সাশ্রয় সম্ভব হয়েছে।

বার্জার পেইন্টসের ব্যবসা মূলত নির্মাণ খাত, আবাসন প্রকল্প এবং ভোক্তা পর্যায়ের রং ও কোটিং পণ্যের ওপর নির্ভরশীল। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে আবাসন খাতে কিছুটা স্থবিরতা থাকলেও সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণমূলক কাজে রঙের চাহিদা তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে। এর পাশাপাশি করপোরেট ও অবকাঠামো প্রকল্পে বার্জারের উপস্থিতি কোম্পানিটির বিক্রয় আয় ধরে রাখতে সহায়ক হয়েছে বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।

বহুজাতিক কোম্পানি হিসেবে বার্জার পেইন্টস দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের রং ও কোটিং শিল্পে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। ব্র্যান্ড শক্তি, বিস্তৃত ডিলার নেটওয়ার্ক এবং নতুন পণ্যের উদ্ভাবন এই অবস্থান ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি কাঁচামাল আমদানিতে দক্ষতা এবং উৎপাদন প্রক্রিয়ায় প্রযুক্তির ব্যবহার কোম্পানিটির ব্যয় নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করেছে।

তবে আর্থিক সাফল্যের পরও শেয়ারবাজারে এর প্রতিফলন পুরোপুরি দেখা যায়নি। গতকাল দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) বার্জার পেইন্টসের শেয়ারের দাম ৫০ পয়সা কমে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪১১ টাকায়। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সামগ্রিক শেয়ারবাজারের মন্দাভাব, বিনিয়োগকারীদের সতর্ক মনোভাব এবং স্বল্পমেয়াদি মুনাফা তুলে নেওয়ার প্রবণতার কারণেই ভালো আর্থিক ফল প্রকাশের পরও শেয়ারের দামে তাৎক্ষণিক ইতিবাচক প্রভাব পড়েনি।

বিনিয়োগকারীদের একাংশ মনে করছেন, বার্জার পেইন্টসের আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী হলেও বাজারের সামগ্রিক পরিস্থিতির কারণে শেয়ারের দাম এখনো চাপে রয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে কোম্পানিটির ধারাবাহিক মুনাফা, শক্তিশালী ব্র্যান্ড এবং স্থিতিশীল নগদ প্রবাহ বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে পারে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বর্তমান বৈশ্বিক ও দেশীয় অর্থনৈতিক বাস্তবতায় ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করে মুনাফা বাড়ানো একটি বড় সাফল্য। কাঁচামালের দাম ওঠানামা, ডলার সংকট এবং আমদানি ব্যয়ের চাপের মধ্যেও বার্জার যেভাবে আর্থিক খরচ কমাতে পেরেছে, তা ব্যবস্থাপনার দক্ষতার প্রমাণ। একই সঙ্গে এটি অন্য তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্যও একটি দৃষ্টান্ত হতে পারে।

আগামী প্রান্তিকগুলোতে বার্জার পেইন্টসের পারফরম্যান্স অনেকটাই নির্ভর করবে দেশের নির্মাণ খাতের গতি, ভোক্তা চাহিদা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর। বাজার পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে কোম্পানিটির বিক্রয় ও মুনাফা আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সব মিলিয়ে, নয় মাসে ২৬০ কোটি টাকার মুনাফা অর্জনের মাধ্যমে বার্জার পেইন্টস আবারও প্রমাণ করেছে যে, প্রতিকূলতার মধ্যেও দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও কৌশলগত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা সম্ভব। বিনিয়োগকারী ও বাজার পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি এখন কোম্পানিটির পরবর্তী প্রান্তিক ও পূর্ণ হিসাব বছরের ফলাফলের দিকে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত