চীনের সঙ্গে চুক্তি যুক্তরাজ্যের জন্য বিপজ্জনক: ট্রাম্প

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৫২ বার
চীনের সঙ্গে চুক্তি যুক্তরাজ্যের জন্য বিপজ্জনক: ট্রাম্প

প্রকাশ:  ৩০  জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চীন ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক জোরদার করার ঘোষণা এবং নতুন বাণিজ্য ও বিনিয়োগ চুক্তির উদ্যোগকে ঘিরে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের বেইজিং সফরের মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছেন, চীনের সঙ্গে চুক্তি করা যুক্তরাজ্যের জন্য “খুবই বিপজ্জনক” হতে পারে। ট্রাম্পের এই মন্তব্য শুধু যুক্তরাজ্য নয়, পশ্চিমা বিশ্বে চীনকে ঘিরে চলমান ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েনকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।

তিন দিনের সরকারি সফরে বৃহস্পতিবার বেইজিংয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। বৈঠকের পর দুই দেশই জানায়, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের লক্ষ্যে একাধিক চুক্তি ও সমঝোতার পথে এগোচ্ছে তারা। বিশেষ করে ভিসামুক্ত ভ্রমণ, হুইস্কির ওপর শুল্ক হ্রাস এবং ওষুধ ও প্রযুক্তি খাতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ এই সফরের গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, “চীনের সঙ্গে এ ধরনের চুক্তি করা তাদের জন্য খুবই বিপজ্জনক।” তিনি সরাসরি কোনো নির্দিষ্ট চুক্তির নাম উল্লেখ না করলেও ইঙ্গিত দেন, বেইজিংয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্ক দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাজ্যের নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। ট্রাম্পের মতে, চীন শুধু অর্থনৈতিক অংশীদার নয়, বরং একটি ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী, যার সঙ্গে গভীর সম্পর্ক পশ্চিমা দেশগুলোর জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

ট্রাম্পের এই মন্তব্যের পরপরই প্রতিক্রিয়া জানায় ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিট। তারা জানায়, কিয়ার স্টারমারের চীন সফর ও আলোচনার বিষয়গুলো সম্পর্কে ওয়াশিংটন আগে থেকেই অবগত ছিল। ব্রিটিশ সরকারের পক্ষ থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক অক্ষুণ্ন রেখেই চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক যোগাযোগ বাড়াতে চায় লন্ডন। এ ছাড়া ডাউনিং স্ট্রিট মনে করিয়ে দেয়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিজেও আগামী এপ্রিলে চীন সফরের পরিকল্পনা করছেন, যা যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের বাস্তবতাকেই তুলে ধরে।

স্টারমারের চীন সফরের অন্যতম আলোচিত দিক হলো বাণিজ্য ও বিনিয়োগ চুক্তি। সফরের সময় ঘোষণা আসে, যুক্তরাজ্যের ওষুধ শিল্পের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান অ্যাস্ট্রাজেনেকা চীনে উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপনের জন্য ১০ দশমিক ৯ বিলিয়ন পাউন্ড বিনিয়োগ করবে। এটিকে ব্রিটিশ অর্থনীতির জন্য বড় সাফল্য হিসেবে দেখছে লন্ডন। বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত ‘ইউকে-চায়না বিজনেস ফোরাম’-এ অংশ নিয়ে কিয়ার স্টারমার বলেন, “আমরা আন্তরিকভাবে আলোচনা করেছি এবং প্রকৃতপক্ষে বেশ কিছু অগ্রগতি অর্জন করেছি। যুক্তরাজ্যের দেওয়ার মতো অনেক কিছু আছে, আর চীনও একটি গুরুত্বপূর্ণ বাজার।”

স্টারমারের বক্তব্যে স্পষ্ট, ব্রেক্সিট-পরবর্তী যুক্তরাজ্য নতুন বাজার ও বিনিয়োগ আকর্ষণে মরিয়া। ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর যুক্তরাজ্যকে বৈশ্বিক বাণিজ্যে নতুন অংশীদার খুঁজতে হচ্ছে। এই বাস্তবতায় চীনের মতো বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করাকে লন্ডন একটি কৌশলগত প্রয়োজন হিসেবে দেখছে। তবে এই সিদ্ধান্তই যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প শুধু যুক্তরাজ্য নয়, একই দিনে কানাডার প্রতিও সতর্কবার্তা দেন। একটি প্রামাণ্যচিত্রের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, “আমার মনে হয় কানাডার জন্য এটি আরও বেশি বিপজ্জনক। তাদের অবস্থা ভালো নয়। তারা খুব খারাপ করছে। সমাধান হিসেবে চীনকে বেছে নেওয়া ঠিক নয়।” তার এই মন্তব্য কানাডা-চীন সাম্প্রতিক বাণিজ্য আলোচনার প্রেক্ষাপটে আসে।

সম্প্রতি কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বেইজিং সফর করে চীনের সঙ্গে শুল্কসংক্রান্ত একটি বাণিজ্য চুক্তি করেন। এই চুক্তি কার্যকর হলে যুক্তরাষ্ট্র অটোয়ার ওপর নতুন করে শুল্ক আরোপ করতে পারে বলে হুমকি দিয়েছে ওয়াশিংটন। ট্রাম্প প্রশাসনের দৃষ্টিতে, চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা মানেই যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত স্বার্থের সঙ্গে সংঘাতের সম্ভাবনা।

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের বক্তব্য আসলে তার “আমেরিকা ফার্স্ট” নীতিরই ধারাবাহিকতা। তিনি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলো যদি চীনের সঙ্গে গভীর বাণিজ্যিক সম্পর্কে জড়ায়, তবে তা যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমিয়ে দেবে। বিশেষ করে প্রযুক্তি, অবকাঠামো ও গুরুত্বপূর্ণ শিল্পখাতে চীনা বিনিয়োগকে ট্রাম্প বরাবরই সন্দেহের চোখে দেখেন।

অন্যদিকে, যুক্তরাজ্যের দৃষ্টিভঙ্গি কিছুটা ভিন্ন। ব্রিটিশ সরকার মনে করে, চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা মানেই রাজনৈতিক বা নিরাপত্তাগত আপস নয়। তারা বলছে, যুক্তরাজ্য তার জাতীয় নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থ সুরক্ষিত রেখেই চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে। এই অবস্থান ইউরোপের অন্যান্য দেশগুলোর সঙ্গেও মিল রয়েছে, যারা একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র, অন্যদিকে চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখছে।

ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় এই দ্বন্দ্ব নতুন নয়। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র চীনকে কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখছে, অন্যদিকে ইউরোপীয় ও কমনওয়েলথ দেশগুলো চীনের বাজার ও বিনিয়োগের সুযোগ ছাড়তে চাইছে না। ট্রাম্পের মন্তব্য এই টানাপোড়েনকে আরও প্রকাশ্য করে তুলেছে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের সতর্কবার্তা যুক্তরাজ্যের জন্য তাৎক্ষণিক কোনো নীতি পরিবর্তনের কারণ হবে না। বরং লন্ডন ও ওয়াশিংটনের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনার নতুন অধ্যায় শুরু হতে পারে। যুক্তরাজ্য চেষ্টা করবে যুক্তরাষ্ট্রকে আশ্বস্ত করতে যে, চীনের সঙ্গে তার সম্পর্ক সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত থাকবে এবং কোনোভাবেই পশ্চিমা নিরাপত্তা জোটের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করবে না।

একই সঙ্গে এই পরিস্থিতি বিশ্ব বাণিজ্যে নতুন করে বিভাজনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার ঘনিষ্ঠ মিত্ররা, অন্যদিকে চীনকে কেন্দ্র করে বিকল্প বাণিজ্যিক বলয়—এই দুই মেরুর টানাপোড়েনে যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলোকে ভারসাম্য রক্ষা করে চলতে হবে।

সব মিলিয়ে, চীনের সঙ্গে চুক্তি নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্তব্য কেবল একটি কূটনৈতিক সতর্কবার্তা নয়, বরং বৈশ্বিক শক্তির রাজনীতিতে চলমান প্রতিযোগিতার প্রতিফলন। যুক্তরাজ্য এই চাপের মধ্যে কীভাবে তার অর্থনৈতিক স্বার্থ ও কৌশলগত জোটের ভারসাম্য বজায় রাখে, সেটিই এখন আন্তর্জাতিক মহলের নজরে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত