রিজভী: জামায়াত ক্ষমতায় এলে সবচেয়ে ঝুঁকিতে পড়বে নারীরা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৪৫ বার
রুহুল কবির রিজভী

প্রকাশ: ৩০ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নারীর অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী মন্তব্য করেছেন, জামায়াত ক্ষমতায় এলে দেশের নারীরাই সবচেয়ে বেশি বিপন্ন হবে। তিনি অভিযোগ করেন, জামায়াতের রাজনৈতিক দর্শন ও চর্চায় নারীর স্বাধীন বিকাশ, নেতৃত্ব ও মতপ্রকাশের জায়গা সংকুচিত, অথচ ভোটের রাজনীতিতে নারীদের ব্যবহার করা হচ্ছে দ্বিচারিতার সঙ্গে।

শুক্রবার রাজধানীর গুলশানে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন রুহুল কবির রিজভী। সংবাদ সম্মেলনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাইবার বুলিংয়ের শিকার হওয়া একাধিক নারী উপস্থিত ছিলেন, যা অনুষ্ঠানের পরিবেশকে আরও মানবিক ও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে। রিজভী বলেন, নারীদের রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতায়ন নিয়ে যারা মুখে কথা বলে, বাস্তবে তারা সেই নারীদের কণ্ঠ রোধ করতেই সক্রিয়।

জামায়াতকে উদ্দেশ করে রুহুল কবির রিজভী বলেন, আপনারা নারীদের পরিপূর্ণ বিকাশ চাননি। তারা একটি রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব দিক, একটি রাষ্ট্রের নেতৃত্ব দিক—এটা আপনারা কখনোই চান না। কিন্তু ভোটের সময় নারীদের দিয়েই আপনারা ভোট চান, নারীদের দ্বারস্থ হন। এখানেই আপনাদের ভেতরের গলদ স্পষ্ট। তিনি আরও বলেন, যদি এই মানসিকতা রাষ্ট্রক্ষমতায় যায়, তাহলে এ দেশের নারীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তাদের নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও সম্মান হুমকির মুখে পড়বে।

সংবাদ সম্মেলনে রুহুল কবির রিজভী জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নাহরিন ইসলামের বাসায় হুমকিমূলক চিঠি পাঠানোর ঘটনার কথাও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এ ধরনের চিঠি সাধারণত পাহাড়ের গুহা থেকে দস্যু বা জঙ্গিরা পাঠায়—এই ভাষা ও কৌশল আমাদের অচেনা নয়। তাঁর অভিযোগ, সারাদেশে বিরোধী মতের নারীদের টার্গেট করে পরিকল্পিতভাবে সাইবার বুলিং, ভয়ভীতি ও সামাজিকভাবে হেয় করার প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে।

রিজভী বলেন, ধর্মের নাম ভাঙিয়ে রাজনীতি করতে গিয়ে নারীদের অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করা হচ্ছে। বট বাহিনী ও মব বাহিনী মিলিয়ে সমাজকে একটি ভয়ঙ্কর অধঃপতনের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। তাঁর ভাষায়, যারা ভিন্নমত পোষণ করে, বিশেষ করে নারীরা যদি কথা বলে, তাহলে তাদের চরিত্রহননই যেন একমাত্র কৌশল হয়ে উঠেছে। এই প্রবণতা গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের জন্য চরম হুমকি।

তিনি আরও বলেন, ভোট পাওয়ার জন্য জামায়াত বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। তাদের একেক নেতার মুখ থেকে একেক ধরনের বক্তব্য আসছে, যা সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করছে। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে তারা সর্বোচ্চ বাজে ও ইতর শব্দ ব্যবহার করছে, যা রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবক্ষয়েরই প্রমাণ।

হুমকির চিঠি পাওয়ার বিষয়ে নিজ অভিজ্ঞতা তুলে ধরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নাহরিন ইসলাম বলেন, কয়েকজন ব্যক্তি এসে তাঁর বাসার দারোয়ানের হাতে চিঠি দিয়ে গেছে। এ ঘটনায় থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে। তিনি জানান, এই হুমকির কারণে তিনি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। তবে একই সঙ্গে দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, চিঠি পাঠিয়ে বা ভয় দেখিয়ে তাঁকে কিংবা তাঁর মতো অন্য নারীদের থামিয়ে রাখা সম্ভব নয়।

নাহরিন ইসলাম বলেন, যারা এসব করছে, তারা সব নারীর বিরোধী নয়। তারা সেই নারীদের বিরোধী, যারা একটি শক্তিশালী ন্যারেটিভ তৈরি করতে পারে, প্রশ্ন তুলতে পারে। নারীদের তারা ব্যবহার করতে চায় শুধুমাত্র ভোট চাওয়ার হাতিয়ার হিসেবে, জান্নাতের টিকিট বিক্রির প্রতীক হিসেবে। কিন্তু নারীরা যখন নিজের অধিকার, মত ও অবস্থান নিয়ে কথা বলে, তখনই তারা আক্রমণের শিকার হয়।

সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী খাদিজাতুল কুবরা, যিনি অতীতে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ১৫ মাস কারাবন্দী ছিলেন। তিনি বলেন, নির্দিষ্ট একটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর তিনি আরেকটি রাজনৈতিক দলের শত্রুতে পরিণত হয়েছেন। জামায়াতের উদ্দেশে তিনি বলেন, তাদের কাছে কেবল তাদের দলের নারীরাই যোগ্য, পর্দাশীল ও চরিত্রবান। ভিন্ন মতাদর্শের নারীরা তাদের চোখে চরিত্রহীন, অযোগ্য ও ইসলামবিরোধী।

খাদিজাতুল কুবরা অভিযোগ করেন, জামায়াতের একটি সংগঠিত বট বাহিনী বা ‘স্পেশাল ফোর্স’ রয়েছে, যারা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে অনলাইনে সক্রিয়। তাদের প্রধান টার্গেট বিরোধী দলের সেই সব নারী, যারা নারীর অধিকার নিয়ে কথা বলে। ওপেন প্ল্যাটফর্মে হুমকি দেওয়া, ইনবক্সে ভয় দেখানো, অনলাইনে সাইবার বুলিং করা—সবকিছুই পরিকল্পিতভাবে করা হয় যেন নারীরা মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে এবং ঘরে বসে থাকতে বাধ্য হয়।

তিনি বলেন, জামায়াতের ছাত্রী সংস্থার নারীরাই নাকি তাদের কাছে ‘সেফ’। অন্য কোনো দলের নারীরা তাদের কাছে কোনোভাবেই নিরাপদ নয়। এই বিভাজন সমাজে নারীদের মধ্যে ভীতি ও বৈষম্য তৈরি করছে।

খাদিজাতুল কুবরা আরও বলেন, যখন অনেকেই কথা বলতে পারেননি, তখন তিনি শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে কথা বলে ১৫ মাস জেল খেটেছেন। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছেন এবং সেই আইনের বাতিলের দাবিতে কারাবরণ করেছেন। তাঁর ভাষায়, সেই আইনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের ফলেই বাকস্বাধীনতার একটি দরজা খুলেছে, কিন্তু এখন সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে তাঁরা পাচ্ছেন সাইবার বুলিং ও অবিরাম আক্রমণ।

সংবাদ সম্মেলন ঘিরে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নারীর নিরাপত্তা ও অধিকার নিয়ে এই বক্তব্য শুধু দলীয় রাজনীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি বৃহত্তর সামাজিক বাস্তবতার প্রতিফলন। অনলাইন ও অফলাইনে নারীদের প্রতি বিদ্বেষ, হুমকি ও সহিংস ভাষার ব্যবহার বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য উদ্বেগজনক ইঙ্গিত বহন করে।

এই সংবাদটি সোশ্যাল মিডিয়া থেকে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ও বাংলাদেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং অনলাইন তথ্য-উপাত্ত যাচাই ও পর্যবেক্ষণ করে বিষয়বস্তুর যথাসম্ভব নিরপেক্ষ ও দায়বদ্ধ উপস্থাপন নিশ্চিত করা হয়েছে। রাজনৈতিক বক্তব্যগুলো সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রকাশ্য মন্তব্যের আলোকে উপস্থাপন করা হয়েছে, যাতে পাঠক বাস্তব প্রেক্ষাপট অনুধাবন করতে পারেন।

সামগ্রিকভাবে, রুহুল কবির রিজভীর এই বক্তব্য ও সংবাদ সম্মেলন বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নারীর অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। ভবিষ্যতে এই ইস্যু কীভাবে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে এবং নীতিনির্ধারণে কী প্রভাব ফেলে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত