প্রকাশ: ৩০ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সমাজে মুসলিম শিশু-কিশোরদের লালন-পালন ও ধর্মীয় শিক্ষা নিয়ে আগ্রহ বাড়লেও বাস্তব জীবনে মাসআলা প্রয়োগের ক্ষেত্রে নানা ভুল ও বিভ্রান্তি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে এসব ভুল অজ্ঞতাজনিত, আবার কোথাও কোথাও অতিরিক্ত সহজীকরণের মানসিকতা থেকে শরিয়তের গুরুত্বপূর্ণ বিধান উপেক্ষিত হচ্ছে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে “এরা তো এখনও ছোট” এই ধারণা থেকে এমন কিছু আমলকে হালকা করে দেখা হয়, যেগুলো আদতে অভিভাবকদের দায়িত্ব ও জবাবদিহিতার আওতায় পড়ে। ফলে শিশুদের পাশাপাশি বড়রাও অনিচ্ছাকৃতভাবে গুনাহের মধ্যে জড়িয়ে পড়ছেন।
ইসলামে কিবলার মর্যাদা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হাদিসে স্পষ্টভাবে কিবলার দিকে মুখ করে বা পিঠ দিয়ে মলমূত্র ত্যাগ করতে নিষেধ করা হয়েছে। ফিকহবিদরা একে মাকরুহ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। সমাজে প্রচলিত একটি ভুল ধারণা হলো, এই বিধান কেবল বালেগদের জন্য প্রযোজ্য। তাই শিশুদের মলমূত্র ত্যাগের সময় কিবলার দিকের বিষয়ে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয় না। অথচ ফিকহের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, যে ব্যক্তি শিশুকে ওইভাবে ইস্তেঞ্জা করায়, দায়ভার তার ওপরই বর্তায়। অর্থাৎ শিশু নয়, বরং অভিভাবক বা দেখভালকারীর জন্য এটি সতর্কতার বিষয়।
একইভাবে কিবলার দিকে পা করে শোয়ার বিষয়টিও অনেকেই শুধু বড়দের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য মনে করেন। বাস্তবে দেখা যায়, ছোট শিশুদের নির্দ্বিধায় কিবলার দিকে পা দিয়ে শোয়ানো হয়। অথচ শরিয়তের দৃষ্টিতে এটি অনুচিত, এবং এখানেও দায় বর্তায় যিনি শিশুকে শোয়াচ্ছেন তার ওপর। কিবলার প্রতি সম্মানবোধ শিশু বয়স থেকেই গড়ে তোলার দায়িত্ব পরিবার ও অভিভাবকদের।
শিশুদের অলংকার ও সাজসজ্জার ক্ষেত্রেও ভুল প্রয়োগ কম নয়। পুরুষের জন্য স্বর্ণ ব্যবহার হারাম—এ বিধান প্রাপ্তবয়স্কদের পাশাপাশি ছেলেশিশুদের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য। কিন্তু সমাজে প্রায়ই দেখা যায়, নাবালেগ ছেলেশিশুদের হাতে স্বর্ণের আংটি পরানো হয় বা শরীরে মেহেদি লাগানো হয়। অনেকেই মনে করেন, ছোটদের জন্য এতে দোষ নেই। অথচ ফিকহের কিতাবগুলো স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে যে, ছেলেশিশুদের জন্যও এসব নিষিদ্ধ। এখানে শিশুর নয়, বরং অভিভাবকের দায়িত্বই মুখ্য।
কোরআন মাজিদ স্পর্শ করার ক্ষেত্রে পবিত্রতা রক্ষার বিষয়েও অবহেলা দেখা যায়। শিশুদের কষ্টের কথা ভেবে হিফজ বা কোরআন শিক্ষার্থীদের অজুর বিষয়ে কিছুটা শিথিলতার আলোচনা ফিকহে পাওয়া যায় ঠিকই, কিন্তু এর অপব্যবহার করে অনেকেই শিশুদের পবিত্রতার বিষয়ে মোটেও গুরুত্ব দেন না। অথচ যে শিশু বুঝমান, সে বালেগ না হলেও তাকে অজু অবস্থায় কোরআন স্পর্শ করার ব্যাপারে অভ্যস্ত করা কোরআনের আদব ও সম্মানেরই দাবি। এটি শিশুদের শেখানো বড়দেরই দায়িত্ব।
শিশুদের প্রস্রাব ও পবিত্রতা নিয়েও সমাজে বহু ভ্রান্ত ধারণা প্রচলিত। কেউ কেউ মনে করেন, যত দিন শিশু শুধু দুধ পান করে, তত দিন তার প্রস্রাব নাপাক নয়। কারণ এ সময় প্রস্রাবের দুর্গন্ধ কম থাকে। এই ধারণার কোনো শরয়ি ভিত্তি নেই। হাদিসে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে যে, দুধের শিশুর প্রস্রাবও নাপাক। দুর্গন্ধ থাকা বা না থাকার সঙ্গে নাপাকির কোনো সম্পর্ক নেই। এই ভুল ধারণার কারণে অনেক সময় নামাজ ও পবিত্রতার ক্ষেত্রে বিড়ম্বনা তৈরি হয়।
দুধের শিশুর বমি নিয়েও অনুরূপ বিভ্রান্তি রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, দুধ পান করার পরপরই যদি শিশু বমি করে এবং সেটি দুর্গন্ধযুক্ত না হয়, তবে তা নাপাক নয়। অথচ ফিকহ অনুযায়ী, শিশুর বমির হুকুম বড়দের বমির মতোই। মুখভরে বমি হলে তা নাপাক, তা দুধপানের পর হোক বা পরে, দুর্গন্ধ থাকুক বা না থাকুক। তবে মুখভরে না হলে সেই বমি নাপাক নয়। আবার এর বিপরীত ভুলও দেখা যায়—অনেকে অল্প বমিকেও নাপাক মনে করেন, যা শরিয়তসম্মত নয়।
শিশুদের পোশাক ও সতরের বিষয়েও সমাজে উদাসীনতা লক্ষ্য করা যায়। তিন-চার বছর বয়সী শিশুর ওপর পূর্ণ সতরের বিধান না থাকলেও, অপ্রয়োজনে তাদের উলঙ্গ করে রাখা ঠিক নয়। বিশেষ করে চার বছর বা তার বেশি বয়সী শিশুদের সামনে ও পেছনের সতরের অংশ ঢেকে রাখা জরুরি। এর পরও যদি তাদের সম্পূর্ণ বস্ত্রহীন রাখা হয়, তবে তা গুনাহের মধ্যে পড়ে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিশুদের শালীন পোশাকে অভ্যস্ত করানো জরুরি, যেন সাত বছর বয়স থেকেই তারা পূর্ণ পোশাকে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। আজকাল ছয়-সাত বছর বয়সী শিশুদের হাফপ্যান্ট পরানোর প্রবণতা দেখা যায়, যা শরিয়তের দৃষ্টিতে অনুচিত। আর নয়-দশ বছর বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে তো এটি স্পষ্টভাবেই নাজায়েজ।
নামাজের ক্ষেত্রে অবহেলাও একটি বড় বাস্তবতা। হাদিসে সুস্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে—সন্তানের বয়স সাত বছর হলে তাকে নামাজের নির্দেশ দিতে হবে। এর অর্থ হলো, তার আগেই ধীরে ধীরে নামাজের সুরা-কিরাত, দোয়া ও নিয়ম-কানুন শেখাতে হবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অনেক পরিবারে দশ বছর বয়স পর্যন্তও শিশুদের নামাজ শুদ্ধভাবে শেখানো হয় না। নামাজের প্রতি এই অবহেলা ভবিষ্যতে দ্বীনি জীবনে বড় ঘাটতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
রমজানের তারাবি নামাজে নাবালেগ ইমামের পেছনে বালেগদের ইকতিদার বিষয়টিও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা। শরিয়ত অনুযায়ী, নাবালেগের পেছনে বালেগের নামাজ সহিহ নয়। তবু গ্রামাঞ্চলে ও অনেক ঘরে নাবালেগ হাফেজের পেছনে তারাবি পড়ার প্রচলন রয়েছে। এমনকি কেউ কেউ মনে করেন, নাবালেগ পুরুষদের ইমামতি করতে না পারলেও মহিলাদের ইমামতি করতে পারবে—এ ধারণাও ভুল। এখানে পুরুষ ও মহিলা উভয়ের ক্ষেত্রেই একই হুকুম প্রযোজ্য।
সবশেষে সন্তানদের শোয়ার ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করা জরুরি। হাদিসে নির্দেশ রয়েছে, সন্তানের বয়স দশ বছর হলে তার শোয়ার জায়গা পৃথক করতে হবে। এই বয়সের আগেই শিশুদের আলাদা করে শোয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন। কিন্তু বাস্তবে অনেক পরিবারে দশ বছরের বেশি বয়সী ছেলে-মেয়েরা মা-বাবার সঙ্গেই ঘুমায় বা ভাই-বোন একসঙ্গে শোয়। ইসলামের এই নির্দেশনা উপেক্ষা করলে শিশুদের মানসিক ও নৈতিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, মুসলিম শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রে শরিয়তের মাসআলা প্রয়োগে অবহেলা মূলত অভিভাবকদের অজ্ঞতা ও অসচেতনতা থেকেই জন্ম নেয়। শিশুরা দায়মুক্ত হলেও তাদের লালন-পালনের দায়িত্বে থাকা বড়রা দায়মুক্ত নন। তাই ধর্মীয় জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি বাস্তব জীবনে তা সঠিকভাবে প্রয়োগ করাই একটি সচেতন ও দায়িত্বশীল মুসলিম সমাজ গঠনের পূর্বশর্ত।