প্রকাশ: ৩০ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী আয়ের প্রবাহে লক্ষণীয় ঊর্ধ্বগতি দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি জানুয়ারি মাসের প্রথম ২৮ দিনেই দেশে এসেছে ২৯৪ কোটি ৩০ লাখ মার্কিন ডলারের প্রবাসী আয়, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৫০ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি। এক বছর আগে জানুয়ারির প্রথম ২৮ দিনে দেশে এসেছিল মাত্র ১৯৫ কোটি ৫০ লাখ ডলার। এই প্রবৃদ্ধি শুধু মাসভিত্তিক নয়, সামগ্রিক অর্থবছরের হিসাবেও রেমিট্যান্স প্রবাহকে শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যাচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শুরু অর্থাৎ গত জুলাই মাস থেকে চলতি ২৮ জানুয়ারি পর্যন্ত মোট প্রবাসী আয় এসেছে ১ হাজার ৯২১ কোটি ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই অঙ্ক ছিল ১ হাজার ৫৭৩ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে প্রবাসী আয় বেড়েছে প্রায় ২২ শতাংশ। অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকারদের মতে, এই প্রবৃদ্ধি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পুনরুদ্ধার এবং ডলারের বাজার স্থিতিশীল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
ব্যাংকিং খাতের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সাধারণত দেশে দুই ঈদের আগে প্রবাসী আয় উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ে। তবে চলতি জানুয়ারিতে ঈদের আগাম কোনো প্রভাব না থাকলেও জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে। তাঁদের মতে, নির্বাচনী ব্যয় মেটাতে অনেক প্রার্থী ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বিদেশে অবস্থানরত স্বজন ও সমর্থকদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করছেন। সেই অর্থ বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে দেশে আসছে প্রবাসী আয়ের হিসাবেই। বিশেষ করে যেসব দেশে বাংলাদেশি প্রবাসীর সংখ্যা বেশি—মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার কয়েকটি দেশ—সেখান থেকেই রেমিট্যান্স প্রবাহ তুলনামূলক বেশি দেখা যাচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মাসভিত্তিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত ডিসেম্বর মাসে দেশে প্রবাসী আয় এসেছিল ৩২২ কোটি ডলার, যা ছিল সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর আগে টানা পাঁচ মাসে প্রবাসী আয় ছিল ৩ বিলিয়ন ডলারের নিচে। নভেম্বর মাসে ২৮৯ কোটি ডলার নিয়ে কিছুটা ইতিবাচক ইঙ্গিত মিললেও জুলাই ও আগস্টে প্রবাসী আয় যথাক্রমে ২৪৮ ও ২৪২ কোটি ডলারে সীমাবদ্ধ ছিল। সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৬৯ কোটি ডলার, আর অক্টোবরে কিছুটা কমে আসে ২৫৬ কোটি ডলারে। এই ধারাবাহিক ওঠানামার পর ডিসেম্বর ও জানুয়ারির প্রবৃদ্ধি অর্থনীতির জন্য স্বস্তির বার্তা দিচ্ছে।
২০২৫ সালের সার্বিক হিসাবেও প্রবাসী আয়ের চিত্র ছিল ইতিবাচক। ওই বছর মোট ৩ হাজার ২৮২ কোটি ডলারের প্রবাসী আয় দেশে এসেছে, যা বাংলাদেশ ব্যাংকে গচ্ছিত বর্তমান বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের প্রায় সমান। অর্থাৎ শুধু এক বছরের রেমিট্যান্সই দেশের বৈদেশিক মুদ্রা মজুতের সমপরিমাণ শক্তি জুগিয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য আরও শক্ত হবে।
প্রবাসী আয়ের গতি ভালো থাকায় ২০২৫ সালে দেশে ডলারের তেমন সংকট দেখা যায়নি। বাংলাদেশ ব্যাংক বছরজুড়ে বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ডলার কিনেছে, যাতে বাজারে অতিরিক্ত চাপ না পড়ে। এর ফলে ধীরে ধীরে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়তে শুরু করে। এক সময় যে রিজার্ভ নিয়ে উদ্বেগ চরমে পৌঁছেছিল, এখন তা আবার তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক পর্যায়ে ফিরছে।
উল্লেখযোগ্য যে, ২০২১ সালে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রথমবারের মতো ৪৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়, যা ছিল দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। তবে এরপর বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ চাপে রিজার্ভ দ্রুত কমতে থাকে। ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের সময় দেশের মোট রিজার্ভ নেমে আসে প্রায় ২৫ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলারে। সেই অবস্থায় ডলার সংকট প্রকট আকার ধারণ করে এবং আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হয়।
বর্তমানে পরিস্থিতি অনেকটাই পাল্টেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ২৬ বিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ প্রায় ৩ হাজার ২০০ কোটি ডলার। এই পুনরুদ্ধারে প্রবাসী আয়ের অবদান সবচেয়ে বেশি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। একই সঙ্গে রপ্তানি আয় ও বৈদেশিক সহায়তাও কিছুটা ভূমিকা রেখেছে।
ডলার সংকটের সময় দেশের ব্যাংকিং খাতে ডলারের দাম একপর্যায়ে ১২৮ টাকা পর্যন্ত উঠে গিয়েছিল। এতে আমদানিকারক ও সাধারণ গ্রাহক উভয়ই চাপে পড়েছিলেন। তবে সংকট কেটে যাওয়ার পর এখন ডলারের দাম কমে ১২২ থেকে ১২৩ টাকার মধ্যে লেনদেন হচ্ছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, রেমিট্যান্স প্রবাহ যদি এমন গতিতেই অব্যাহত থাকে, তাহলে ডলারের বাজার আরও স্থিতিশীল থাকবে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, নির্বাচনকেন্দ্রিক এই অতিরিক্ত প্রবাসী আয় স্বল্পমেয়াদে অর্থনীতির জন্য সহায়ক হলেও দীর্ঘমেয়াদে টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য রেমিট্যান্সকে প্রাতিষ্ঠানিক ও উৎপাদনমুখী খাতে কাজে লাগানো জরুরি। একই সঙ্গে হুন্ডির মতো অবৈধ চ্যানেল বন্ধ রেখে বৈধ পথে প্রবাসী আয় আনার জন্য প্রণোদনা ও ব্যাংকিং সেবা আরও সহজ করার ওপর জোর দিচ্ছেন তাঁরা।
সব মিলিয়ে বলা যায়, জাতীয় নির্বাচনের আগে প্রবাসী আয়ের এই উল্লম্ফন দেশের অর্থনীতিতে স্বস্তির নিঃশ্বাস এনে দিয়েছে। রিজার্ভ বাড়া, ডলারের দাম স্থিতিশীল থাকা এবং ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফেরার পেছনে রেমিট্যান্সের ভূমিকা এখন স্পষ্ট। সামনে নির্বাচন শেষ হওয়ার পরও এই ইতিবাচক ধারা ধরে রাখা গেলে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আরও জোরদার হবে—এমনটাই আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।