মিয়ানমারের নির্বাচন এখনো স্বীকৃতি পায়নি জোট আসিয়ান

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৫৯ বার
মিয়ানমারের নির্বাচন আসিয়ান স্বীকৃতি

প্রকাশ: ৩০ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সামরিক শাসিত মিয়ানমারে সদ্য অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনকে এখনো স্বীকৃতি দেয়নি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক জোট আসিয়ান। ফিলিপিন্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী থেরেসা লাজারো স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, তিন ধাপে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনকে অনুমোদন বা স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়ে আসিয়ানের ভেতরে এখনো কোনো ঐকমত্য গড়ে ওঠেনি। ফলে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও বৈধতা অর্জনের যে প্রচেষ্টা মিয়ানমারের সামরিক সরকার চালিয়ে যাচ্ছে, তাতে নতুন করে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) ফিলিপিন্সের মধ্যাঞ্চলীয় শহর সেবুতে আয়োজিত আসিয়ানের চলতি বছরের প্রথম বড় পরিসরের মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে থেরেসা লাজারো এ কথা বলেন। তিনি জানান, “মিয়ানমারে অনুষ্ঠিত তিন ধাপের নির্বাচন আসিয়ান এখনো অনুমোদন বা স্বীকৃতি দেয়নি। এই মুহূর্তে স্পষ্ট উত্তর হলো—হ্যাঁ, আসিয়ান নির্বাচনকে স্বীকৃতি দেয়নি।” তার এই বক্তব্যে পরিষ্কার হয়ে যায়, আঞ্চলিক জোটটি মিয়ানমারের সাম্প্রতিক নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে নিয়ে এখনও গভীর সংশয় ও দ্বিধার মধ্যে রয়েছে।

তবে ভবিষ্যতে আসিয়ানের অবস্থান পরিবর্তিত হতে পারে কি না—এ বিষয়ে নির্দিষ্ট করে কিছু বলেননি ফিলিপিন্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। স্থানীয় অনলাইন সংবাদমাধ্যম র‍্যাপলারের প্রতিবেদনে বলা হয়, থেরেসা লাজারো জানিয়েছেন, মিয়ানমারের নির্বাচন নিয়ে আসিয়ান সদস্য দেশগুলো এখনো সম্মিলিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি। তিনি আরও উল্লেখ করেন, যদিও তিন দফায় ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে, তবুও পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়াকে এখনো সম্পূর্ণ সমাপ্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে না। এই বক্তব্য আসিয়ানের সতর্ক অবস্থানেরই প্রতিফলন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

মিয়ানমারের সামরিক সরকারের জন্য আসিয়ানের এই অবস্থানকে বড় ধরনের কূটনৈতিক ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন গণতান্ত্রিক সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়ার পর থেকেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে দেশটির সামরিক জান্তা। সেই বিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে ওঠার এবং নিজেদের শাসনকে বৈধ রূপ দেওয়ার লক্ষ্যেই সম্প্রতি নির্বাচন আয়োজন করে তারা।

সামরিক সংঘাত ও নিরাপত্তাজনিত কারণে তিন ধাপে আয়োজন করা এই নির্বাচন শুরু হয় গত ২৮ ডিসেম্বর এবং শেষ হয় ২৫ জানুয়ারি। দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে চলমান সংঘর্ষ, বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সক্রিয়তা এবং প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের সীমাবদ্ধতার কারণে একসঙ্গে সারাদেশে ভোট আয়োজন সম্ভব হয়নি বলে সামরিক সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়। নির্বাচনের পরপরই গত সোমবার (২৬ জানুয়ারি) সামরিক বাহিনী-সমর্থিত দল ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (ইউএসডিপি) নির্বাচনে বিজয় দাবি করে।

ইউএসডিপির এক শীর্ষ কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা এএফপিকে জানান, প্রাথমিক ফলাফলের ভিত্তিতে তারা ইতোমধ্যেই সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছেন। সামরিক সরকারের ঘোষণায় বলা হয়েছে, চলতি সপ্তাহের মধ্যেই নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক ফল প্রকাশ করা হবে। পাশাপাশি মার্চ মাসে নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশন বসবে এবং এপ্রিল থেকে নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করবে।

তবে এই নির্বাচনকে ঘিরে আন্তর্জাতিক মহল এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সমালোচনা ছিল তীব্র। প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়নি। বিশেষ করে অং সান সু চির দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) কার্যত নিষিদ্ধ থাকায় প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন হওয়ার কোনো বাস্তব সুযোগ ছিল না। মানবাধিকার সংগঠন ও অধিকারকর্মীরা একে সামরিক শাসনকে বৈধতা দেওয়ার একটি কৌশল হিসেবে অভিহিত করেছেন।

আসিয়ানভুক্ত ১১টি দেশের অন্যতম সদস্য মিয়ানমার। তবে ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকেই আসিয়ান দেশটির সামরিক সরকারকে পূর্ণ স্বীকৃতি দেয়নি। সেই অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমার ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ, সহিংসতা এবং মানবিক সংকটে নিমজ্জিত হয়েছে। লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে, অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে এবং দেশজুড়ে নিরাপত্তাহীনতা চরম আকার ধারণ করেছে।

এই প্রেক্ষাপটে আসিয়ান দীর্ঘদিন ধরে মিয়ানমারের সংকট সমাধানে কূটনৈতিক পথ অনুসরণের কথা বলে আসছে। সংগঠনটির তথাকথিত ‘ফাইভ-পয়েন্ট কনসেনসাস’-এ সহিংসতা বন্ধ, সংলাপ শুরু এবং মানবিক সহায়তার ওপর জোর দেওয়া হলেও বাস্তবে তেমন অগ্রগতি হয়নি। বরং সামরিক সরকার বারবার এসব আহ্বান উপেক্ষা করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

মিয়ানমার পরিস্থিতি নিয়ে সেবু বৈঠকে সিঙ্গাপুরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিভিয়ান বালাকৃষ্ণনও গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, “মিয়ানমারে অর্থবহ রাজনৈতিক অগ্রগতির জন্য সহিংসতা বন্ধ, অন্তর্ভুক্তিমূলক সংলাপ এবং সব পক্ষের অংশগ্রহণ অপরিহার্য।” তার মতে, এসব শর্ত পূরণ না হলে এমন কোনো সরকার গড়ে ওঠা সম্ভব নয়, যা প্রকৃত অর্থে জনগণের সমর্থন ও বৈধতা পাবে।

ভিভিয়ান বালাকৃষ্ণনের এই বক্তব্য আসিয়ানের ভেতরে থাকা উদ্বেগ ও শর্তসাপেক্ষ অবস্থানকে আরও স্পষ্ট করে। বিশ্লেষকদের মতে, কেবল নির্বাচন আয়োজন করলেই বৈধতা পাওয়া যায় না; বরং সেই নির্বাচন কতটা গ্রহণযোগ্য, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং জনগণের মতামত প্রতিফলিত করে, সেটিই মূল বিবেচ্য।

বর্তমানে আসিয়ানের বার্ষিক ঘূর্ণায়মান সভাপতির দায়িত্ব পালন করছে ফিলিপিন্স। মিয়ানমারের সামরিক অভ্যুত্থানের পর দেশটিকে এই সভাপতির দায়িত্ব থেকে স্থগিত করা হয়েছিল, যা আঞ্চলিক জোটটির কঠোর মনোভাবেরই আরেকটি উদাহরণ। ফিলিপিন্সের নেতৃত্বে এবছর আসিয়ান মিয়ানমার ইস্যুতে আরও দৃঢ় অবস্থান নিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সব মিলিয়ে, মিয়ানমারের সাম্প্রতিক নির্বাচন ঘিরে আসিয়ানের অনড় অবস্থান স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে—আঞ্চলিক বৈধতা পেতে হলে শুধু নির্বাচন আয়োজনই যথেষ্ট নয়। সহিংসতা বন্ধ, রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি এবং জনগণের প্রকৃত অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো প্রক্রিয়াকেই গ্রহণযোগ্য হিসেবে দেখা হবে না। এই বাস্তবতায় মিয়ানমারের সামরিক সরকারের সামনে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির পথ আরও কঠিন হয়ে উঠছে, আর দেশটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা ক্রমেই গভীরতর হচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত