চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জরুরি, ট্রাম্পকে ইঙ্গিত স্টারমারের

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৩১ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৫৩ বার
চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জরুরি, ট্রাম্পকে ইঙ্গিত স্টারমারের

প্রকাশ: ৩১  জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্ব রাজনীতির দ্রুত পরিবর্তনশীল বাস্তবতায় যুক্তরাজ্য ও চীনের সম্পর্ক নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প যখন চীনের সঙ্গে ব্যবসা করাকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ বলে মন্তব্য করছেন, ঠিক সেই সময় ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন—চীনের সঙ্গে সম্পর্ক না রাখাটা যুক্তরাজ্যের জন্য নিছকই বোকামি হবে। তার এই বক্তব্য কেবল একটি কূটনৈতিক অবস্থান নয়, বরং বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনীতি ও রাজনীতির জটিল বাস্তবতার প্রতিফলন হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকেরা।

স্থানীয় সময় শুক্রবার চীনের সাংহাইয়ে বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কিয়ার স্টারমার বলেন, তার সাম্প্রতিক চীন সফর ছিল অত্যন্ত সফল। এই সফরের মধ্য দিয়ে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের দূরত্ব কমানোর একটি বাস্তব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যা কিছু ঘটছে, তার সরাসরি প্রভাব যুক্তরাজ্যের ঘরোয়া অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং কর্মসংস্থানের ওপর পড়ছে। এমন এক অস্থির বিশ্বে নিজেকে বিচ্ছিন্ন রেখে টিকে থাকা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

স্টারমার বলেন, “আমি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মন্তব্য দেখেছি। আমরা এই সফরের আগে তার টিমের সঙ্গেও আলোচনা করেছি। ট্রাম্প নিজেও এ বছরের এপ্রিলে চীন সফরের পরিকল্পনা করছেন বলে আমাদের জানানো হয়েছে।” এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কার্যত বুঝিয়ে দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র নিজেও চীনের সঙ্গে পুরোপুরি সম্পর্ক ছিন্ন করার পথে যাচ্ছে না। বরং কৌশলগত প্রতিযোগিতা থাকা সত্ত্বেও যোগাযোগ ও সম্পর্ক বজায় রাখার বাস্তবতা সবাইকে মেনেই চলতে হচ্ছে।

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর মতে, বিশ্ব এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও প্রযুক্তি—সবকিছুই একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। চীন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি এবং বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার একটি কেন্দ্রবিন্দু। যুক্তরাজ্যের মতো একটি বাণিজ্যনির্ভর দেশের পক্ষে এই বাস্তবতা অগ্রাহ্য করা আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের শামিল হতে পারে। তাই মতাদর্শগত পার্থক্য থাকলেও বাস্তব সহযোগিতা বজায় রাখা জরুরি।

এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ক্রিস্টোফার পিসারিদিস। তিনি বলেছেন, বর্তমান বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাজ্য ও চীনের মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা ও সমন্বয় সময়ের দাবি। সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ফাঁকে চীনা সংবাদমাধ্যম সিজিটিএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পিসারিদিস বলেন, “বিশ্ব যখন আরও বিভক্ত হওয়ার ঝুঁকিতে, তখন এই ধরনের সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।”

পিসারিদিস আরও বলেন, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী যা করছেন, তা একেবারেই সঠিক পথে এগোচ্ছে। তিনি যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা সাম্প্রতিক বার্তা ও নীতির বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তার মতে, বিশ্ব ধীরে ধীরে তিনটি পরাশক্তির মধ্যে ভাগ হয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে, যেখানে প্রতিটি শক্তি নিজ নিজ প্রভাববলয় বিস্তারের চেষ্টা করছে। এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলো যদি ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি না অনুসরণ করে, তবে তারা বড় ধরনের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, কিয়ার স্টারমারের এই চীন সফর ছিল আট বছরের মধ্যে কোনো ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর প্রথম সফর। দীর্ঘ এই বিরতির ফলে দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক কিছুটা স্থবির হয়ে পড়েছিল। স্টারমারের সফর সেই বরফ গলানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সফরের মাধ্যমে যুক্তরাজ্য স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে তারা এককভাবে কোনো শিবিরে আটকে থাকতে চায় না; বরং জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখে বহুমাত্রিক কূটনীতি বজায় রাখতে আগ্রহী।

এই সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো লন্ডনে নতুন চীনা দূতাবাস নির্মাণের অনুমোদন। নোবেলজয়ী পিসারিদিস এটিকে ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন। তার মতে, কূটনৈতিক অবকাঠামো শক্তিশালী করা মানেই দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ ও বোঝাপড়া বাড়ানোর পথ সুগম করা। যদিও যুক্তরাজ্যের অভ্যন্তরে এ নিয়ে কিছু বিতর্ক রয়েছে, তবুও সরকার এটিকে ভবিষ্যৎ সম্পর্কের জন্য একটি প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ হিসেবেই বিবেচনা করছে।

এদিকে, ডনাল্ড ট্রাম্পের চীনবিরোধী বক্তব্য নতুন নয়। তিনি এর আগেও চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি, প্রযুক্তি নিরাপত্তা ও শিল্প গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ তুলে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তবে বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় করপোরেশন এবং বিনিয়োগকারীরাও চীনের বাজার থেকে পুরোপুরি সরে আসতে পারছে না। এই দ্বৈত অবস্থানই কিয়ার স্টারমারের বক্তব্যকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, স্টারমারের বক্তব্য মূলত একটি বাস্তববাদী কূটনীতির প্রতিফলন। আদর্শগত অবস্থান আর বাস্তব অর্থনৈতিক প্রয়োজন—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। যুক্তরাজ্য সেই ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঐতিহাসিক মিত্রতা বজায় রেখেও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের দরজা খোলা রাখা হচ্ছে।

বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্যও এই পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে। বৈশ্বিক শক্তিগুলোর মধ্যে টানাপোড়েনের সময়ে কৌশলগত নিরপেক্ষতা ও বহুপাক্ষিক সম্পর্ক বজায় রাখা যে কতটা জরুরি, তা আবারও স্পষ্ট হচ্ছে। চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় শক্তিগুলোর সঙ্গে সমান্তরাল সম্পর্ক বজায় রাখাই এখন অনেক দেশের জন্য টিকে থাকার কৌশল হয়ে উঠছে।

সব মিলিয়ে, কিয়ার স্টারমারের বক্তব্য শুধু যুক্তরাজ্য-চীন সম্পর্কের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনাই দেয় না, বরং বর্তমান বৈশ্বিক রাজনীতির বাস্তবতাকেও স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। বিভক্ত বিশ্বের মধ্যে সংযোগ বজায় রাখাই যে এখন সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক দক্ষতা, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর এই মন্তব্য সেই বার্তাই জোরালোভাবে সামনে নিয়ে এসেছে

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত