নিপাহ আতঙ্কে ভারতে বিশ্বকাপ আয়োজন নিয়ে অনিশ্চয়তা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৩১ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৫২ বার
নিপাহ আতঙ্কে ভারতে বিশ্বকাপ আয়োজন নিয়ে অনিশ্চয়তা

প্রকাশ: ৩১ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ভারতে অনুষ্ঠিতব্য আসন্ন টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপকে ঘিরে শঙ্কা ও অনিশ্চয়তা দিন দিন ঘনীভূত হচ্ছে। দেশটির কয়েকটি রাজ্যে নিপাহ ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করায় আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অঙ্গনে আলোচনার ঝড় উঠেছে। একের পর এক ক্রিকেট খেলুড়ে দেশ তাদের খেলোয়াড় ও সাপোর্ট স্টাফদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। এরই মধ্যে ইংল্যান্ডের আপত্তির খবর প্রকাশ্যে আসার পর এবার অস্ট্রেলিয়ার পক্ষ থেকেও উদ্বেগের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। ফলে নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী ভারতে বিশ্বকাপ আয়োজন আদৌ সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।

পাকিস্তানের একাধিক সংবাদমাধ্যমের খবরে দাবি করা হয়েছে, ইংল্যান্ড ক্রিকেট বোর্ড (ইসিবি) ইতোমধ্যে ভারতের মাটিতে টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ নিয়ে তাদের আপত্তির বিষয়টি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে। ইংল্যান্ডের মূল উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দু নিপাহ ভাইরাসের উচ্চ সংক্রমণ ও মৃত্যুঝুঁকি। দেশটির আশঙ্কা, এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব যদি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তাহলে খেলোয়াড়দের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়তে পারে।

নিপাহ ভাইরাস নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগের বিষয়টি নতুন নয়, তবে সাম্প্রতিক সময়ে ভারতে সংক্রমণের খবর সামনে আসায় পরিস্থিতি আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, নিপাহ ভাইরাস অত্যন্ত প্রাণঘাতী। আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে মৃত্যুহার ৪০ থেকে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে, যা একে বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক ভাইরাসগুলোর একটি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে নিপাহ ভাইরাস করোনাভাইরাসের চেয়েও বেশি মারাত্মক প্রভাব ফেলতে সক্ষম।

ইংল্যান্ডের আপত্তির পর অস্ট্রেলিয়ার অবস্থানও বিশ্বকাপ আয়োজন নিয়ে শঙ্কাকে আরও জোরালো করেছে। অস্ট্রেলিয়ার ফেডারেল স্বাস্থ্যমন্ত্রী মার্ক বাটলার এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, নিপাহ পরিস্থিতি তারা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছেন। তিনি বলেন, আপাতত অসুস্থ যাত্রীদের জন্য বিদ্যমান স্বাস্থ্যবিধিতে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি, তবে অস্ট্রেলিয়া সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। এশিয়ার বিভিন্ন বিমানবন্দরে স্বাস্থ্য পরীক্ষা জোরদার করা হলেও অস্ট্রেলিয়ার বিমানবন্দরগুলোতে এখনো নতুন কোনো বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়নি।

অস্ট্রেলিয়ার এই বক্তব্য কূটনৈতিক ভাষায় হলেও, এর মধ্য দিয়ে দেশটির উদ্বেগ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ক্রিকেট বিশ্লেষকদের মতে, অস্ট্রেলিয়া সাধারণত এ ধরনের ইস্যুতে প্রকাশ্যে কঠোর অবস্থান নিতে সময় নেয়। ফলে ভবিষ্যতে তারা আইসিসির কাছে নির্দিষ্ট কিছু শর্ত বা নিরাপত্তা নিশ্চয়তা দাবি করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ভারতের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ অবশ্য পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। নিপাহ ভাইরাসের ঝুঁকি মোকাবিলায় ভারতের ন্যাশনাল সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল (এনসিডিসি) ইতোমধ্যে স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য কঠোর নির্দেশনা জারি করেছে। হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রে মাস্ক, গগলস ও ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম (পিপিই) ব্যবহারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সম্ভাব্য সংক্রমণ শনাক্তে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে বলে দাবি করেছে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ।

তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশ্ন উঠছে, শুধু স্বাস্থ্য নির্দেশনা জারিই কি যথেষ্ট? বিশ্বকাপে অংশ নিতে যাওয়া শত শত খেলোয়াড়, কোচ, ম্যাচ অফিসিয়াল, সাংবাদিক এবং হাজারো সমর্থকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কি আদৌ সম্ভব হবে? এই প্রশ্নগুলোই এখন আইসিসি ও আয়োজক দেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পাকিস্তানি গণমাধ্যম আরও জানিয়েছে, ইংল্যান্ডের অবস্থানের পর ইউরোপের কয়েকটি দেশও ভারতে খেলতে অনাগ্রহ প্রকাশ করছে। যদিও এসব দেশের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি, তবে বিষয়টি আইসিসির অভ্যন্তরীণ আলোচনায় জায়গা করে নিয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। এমনকি পুরো টুর্নামেন্ট শ্রীলঙ্কায় সরিয়ে নেওয়ার সম্ভাবনা নিয়েও নাকি প্রাথমিক আলোচনা শুরু হয়েছে।

বর্তমান সূচি অনুযায়ী, ২০ দল নিয়ে অনুষ্ঠিতব্য এই টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপের মোট ৫৫টি ম্যাচের মধ্যে ২০টি ম্যাচ শ্রীলঙ্কায় এবং বাকি ৩৫টি ম্যাচ ভারতে আয়োজন করার পরিকল্পনা রয়েছে। যদি ভারতে আয়োজন নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ে, তাহলে শ্রীলঙ্কার ওপর অতিরিক্ত ম্যাচ আয়োজনের চাপ পড়তে পারে। তবে অবকাঠামো, নিরাপত্তা, সম্প্রচার এবং বাণিজ্যিক দিক বিবেচনায় পুরো টুর্নামেন্ট এক দেশ থেকে অন্য দেশে সরিয়ে নেওয়া আইসিসির জন্য সহজ সিদ্ধান্ত হবে না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শেষ মুহূর্তে ভেন্যু পরিবর্তন করা আইসিসির জন্য বড় ধরনের প্রশাসনিক ও আর্থিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। এর আগে নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ দেখিয়ে বাংলাদেশ কিছু ম্যাচের ভেন্যু পরিবর্তনের আবেদন করলেও আইসিসি তা প্রত্যাখ্যান করেছিল। সেই সিদ্ধান্তের প্রেক্ষাপটে এখন যদি স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণে ভারতের ভেন্যু বদলানো হয়, তাহলে আইসিসির নীতিগত অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে।

ক্রিকেট অঙ্গনে অনেকেই মনে করছেন, আইসিসি এই মুহূর্তে এক কঠিন সমীকরণের মুখোমুখি। একদিকে খেলোয়াড়দের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা, অন্যদিকে টুর্নামেন্টের সময়সূচি, সম্প্রচার চুক্তি ও স্পন্সরদের স্বার্থ—সবকিছু মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কোনো একটি পক্ষকে অবহেলা করলে সেটির প্রভাব পড়তে পারে বিশ্ব ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ আয়োজনেও।

ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই) এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ভেন্যু পরিবর্তন নিয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। তবে দেশটির গণমাধ্যমে আলোচনা চলছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না এলে বিকল্প পরিকল্পনা প্রস্তুত রাখতে হতে পারে। শ্রীলঙ্কা ছাড়াও সংযুক্ত আরব আমিরাতের নামও সম্ভাব্য বিকল্প ভেন্যু হিসেবে আলোচনায় আসছে।

সব মিলিয়ে, নিপাহ ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ভারতের টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপ আয়োজনকে ঘিরে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে। আগামী কয়েক সপ্তাহে পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, সেটির ওপরই নির্ভর করবে বিশ্বকাপের ভাগ্য। তবে এটুকু নিশ্চিত, স্বাস্থ্যঝুঁকি আর ক্রিকেটের মতো বৈশ্বিক ইভেন্ট—এই দুইয়ের ভারসাম্য রক্ষা করা এবার আইসিসির জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত