বিদ্রোহী শঙ্কায় বাগেরহাটে চাপের মুখে বিএনপি প্রার্থীরা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৫৩ বার

প্রকাশ: ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সংসদ নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে বাগেরহাট জেলার চারটি আসনে ততই বাড়ছে রাজনৈতিক উত্তাপ। ভোটের মাঠে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ছুটে বেড়াচ্ছেন প্রার্থীরা। পোস্টার লিফলেট মাইকিং আর ঘরে ঘরে গণসংযোগে মুখর হয়ে উঠেছে ফকিরহাট মোরেলগঞ্জ শরণখোলা মোংলা লালমাইসহ গোটা জেলা। তবে প্রচারের এই ব্যস্ততার আড়ালে বড় ধরনের দুশ্চিন্তায় রয়েছেন বিএনপির প্রার্থীরা। প্রতিটি আসনেই বিদ্রোহী প্রার্থীর উপস্থিতি দলীয় ভোট বিভক্ত হওয়ার শঙ্কা তৈরি করেছে। সেই সুযোগে তুলনামূলক স্বস্তিতে রয়েছে জামায়াতে ইসলামী।

বাগেরহাট জেলার চারটি সংসদীয় আসনে এবারের নির্বাচনে মোট ২১ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। দলীয় মনোনয়নে মাঠে আছেন ১৮ জন আর স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন ৩ জন। সংখ্যার বিচারে প্রতিদ্বন্দ্বিতা যতটা বিস্তৃত বাস্তবে মূল লড়াই সীমাবদ্ধ বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যেই। তবে বিএনপির ক্ষেত্রে প্রতিটি আসনেই বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় নির্বাচনী কৌশল বাস্তবায়নে বাড়তি চাপে পড়েছে দলটি।

নির্বাচনী প্রচারের ফাঁকে সাধারণ মানুষের কাছে জানতে চাওয়া হলে উঠে আসে দীর্ঘদিনের বঞ্চনা আর অপূর্ণ প্রত্যাশার কথা। ফকিরহাট উপজেলার কৃষক আনোয়ার হোসেন বলেন জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে লবণাক্ততা বেড়ে কৃষিকাজ প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে। ধান সবজি ফলনের ক্ষতি হচ্ছে প্রতি বছর। তিনি জানান প্রতিটি নির্বাচনে প্রার্থীরা এসে আশ্বাস দেন কিন্তু ভোট শেষ হলে আর তাদের খোঁজ মেলে না। এবার তিনি এমন জনপ্রতিনিধি চান যিনি শুধু প্রচারের সময় নয় সারা বছর মাঠে থাকবেন।

শরণখোলার জেলে মনিরুল ইসলামের কণ্ঠে শোনা যায় নিরাপত্তাহীনতার কথা। দস্যু আতঙ্ক আর ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ তাদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। মাছ ধরতে গিয়ে প্রাণ হারানোর ঝুঁকি নিয়েই প্রতিদিন নদীতে নামতে হয়। দুর্যোগের সময় বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা না থাকলে জেলেদের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে বলেও জানান তিনি।

বাগেরহাট শহরের বাসিন্দা জাবের শেখের অভিযোগ চিকিৎসা ব্যবস্থার চরম দুর্বলতা নিয়ে। একটি জেলা শহর হয়েও এখানে উন্নত চিকিৎসা সুবিধা নেই। সামান্য জটিল রোগ হলেই খুলনা কিংবা ঢাকায় ছুটতে হয়। গুরুতর রোগে আক্রান্ত হলে বাগেরহাটে চিকিৎসা করানো কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ে।

মোংলার বাসিন্দা দীপঙ্কর দাস দীর্ঘদিনের একটি দাবি তুলে ধরেন। মোংলা নদীর ওপর একটি সেতু নির্মাণ এই অঞ্চলের মানুষের স্বপ্ন। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ ঝুঁকি নিয়ে নৌকায় নদী পারাপার করছে। দুর্ঘটনার আশঙ্কা লেগেই থাকে। একটি সেতু হলে যোগাযোগ সহজ হবে সময় বাঁচবে আর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও বাড়বে বলে তিনি মনে করেন।

নারী সমাজকর্মী নিলুফা আক্তার বলেন গ্রামাঞ্চলের নারীরা এখনও স্বাস্থ্য শিক্ষা কর্মসংস্থান আর নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার। মাতৃত্বকালীন সেবা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ খুবই সীমিত। তিনি চান এমন জনপ্রতিনিধি যারা নারীর অধিকার কেবল স্লোগানে নয় বাস্তব নীতিমালার মাধ্যমে নিশ্চিত করবেন।

বাগেরহাট ভূমি উন্নয়ন ব্যাংকের ম্যানেজার শাহানুর রহমান শাহিন জেলার সামগ্রিক অবনতি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন। ইতিহাস ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ একটি জেলা ধীরে ধীরে প্রথম শ্রেণি থেকে দ্বিতীয় শ্রেণিতে নেমে গেছে। পরিকল্পিত নগরায়ন আর দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন ছাড়া এই অবস্থা থেকে উত্তরণ সম্ভব নয় বলেও মত দেন তিনি।

বাগেরহাট-১ আসনে জামায়াতের প্রার্থী মশিউর রহমান খান সুশাসন আর দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। শিক্ষা ধর্মীয় মূল্যবোধ আর মানবিক উন্নয়নের সমন্বয়ে ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের কথা বলছেন তিনি। একই আসনে বিএনপির প্রার্থী মাতুয়া সম্প্রদায়ের নেতা কপিল কৃষ্ণ মণ্ডল দলে নবাগত। ফলে ভোটারদের কাছে নিজেকে পরিচিত করতে বাড়তি পরিশ্রম করতে হচ্ছে তাকে।

বাগেরহাট-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী ব্যারিস্টার শেখ জাকির হোসেন দীর্ঘদিনের বঞ্চনার অবসান আর শক্তিশালী সংসদীয় প্রতিনিধিত্বের কথা তুলে ধরছেন। অবকাঠামো উন্নয়ন কর্মসংস্থান সৃষ্টি আর আইনের শাসন তার প্রচারের মূল বিষয়। বিপরীতে জামায়াত প্রার্থী শেখ মঞ্জুরুল হক রাহাদ নৈতিক নেতৃত্ব আর জনগণের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।

বাগেরহাট-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী লায়ন ড. ফরিদুল ইসলাম স্বাস্থ্য শিক্ষা পর্যটন আর যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। নির্বাচিত হলে জনগণের পাশে থেকে কাজ করার আশ্বাস দিচ্ছেন তিনি। জামায়াত প্রার্থী মওলানা আব্দুল ওয়াদুদ মোংলা বন্দর আধুনিকায়ন আর মাদক সন্ত্রাস চাঁদাবাজি নির্মূলের প্রতিশ্রুতি তুলে ধরছেন।

বাগেরহাট-৪ আসনে জামায়াত প্রার্থী অধ্যক্ষ আব্দুল আলিম শরণখোলা মোড়লগঞ্জ অঞ্চলের দীর্ঘদিনের অবহেলার কথা তুলে ধরছেন। রাস্তাঘাট সংস্কার পর্যটন নগরী গড়ে তোলা আর একটি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার কথা বলছেন তিনি। একই আসনে বিএনপির প্রার্থী সোমনাথ দে জনগণের দুঃখ দুর্দশা লাঘবে কাজ করার আশ্বাস দিচ্ছেন।

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে বিএনপির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বিদ্রোহী প্রার্থীরা। প্রতিটি আসনেই বিদ্রোহী থাকায় দলীয় ভোট ভাগ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রবল। এর বিপরীতে জামায়াতে ইসলামী তুলনামূলক ঐক্যবদ্ধ অবস্থানে থাকায় কিছুটা সুবিধাজনক পরিস্থিতিতে রয়েছে। ভোটের অঙ্কে এই বিভাজন শেষ পর্যন্ত ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

বাগেরহাট জেলার ৭৫টি ইউনিয়ন আর ৩টি পৌরসভা নিয়ে মোট ভোটার সংখ্যা ১৩ লাখ ৬১ হাজার ১১১ জন। ভোট গ্রহণের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে ৫৪৭টি ভোটকেন্দ্র আর ২ হাজার ৬৫৯টি ভোটকক্ষ। ভোটাররা এবার আর শুধু প্রতিশ্রুতি শুনতে চান না। তারা চান নিয়মিত জনপ্রতিনিধির উপস্থিতি দায়বদ্ধতা আর সময়ভিত্তিক বাস্তবায়ন।

সব মিলিয়ে বাগেরহাটের চার আসনে এবারের নির্বাচন কেবল দলীয় শক্তির লড়াই নয়। এটি বিশ্বাসযোগ্যতা আর দায়িত্বশীল নেতৃত্বের পরীক্ষাও। বিদ্রোহী শঙ্কা কাটিয়ে বিএনপি কতটা সংগঠিত থাকতে পারে আর জামায়াত সেই সুযোগ কতটা কাজে লাগাতে পারে সেদিকেই তাকিয়ে আছে জেলার রাজনীতি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত