প্রকাশ: ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম, সুশাসনের ঘাটতি এবং প্রভাবশালী খেলাপিদের দৌরাত্ম্যে নাজুক অবস্থায় থাকা সরকারি ব্যাংকগুলো ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ানোর আভাস দিচ্ছে। বিশাল অংকের খেলাপি ঋণের চাপ থাকা সত্ত্বেও ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ দেশের চারটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে আমানত বেড়েছে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা। একই সময়ে নগদ অর্থ আদায়, প্রবাসী আয়ে প্রবৃদ্ধি এবং খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলের মতো সূচকগুলোও ইতিবাচক ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে এই অগ্রযাত্রাকে টেকসই করতে হলে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কঠোর পদক্ষেপের বিকল্প নেই বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
ব্যাংক সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, পরিকল্পিত অনিয়ম ও সেচ্ছাচারিতার মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোর ঋণ ব্যবস্থাপনাকে ব্যবহার করে বিপুল অর্থ লোপাট করা হয়েছে। ঋণের নামে অর্থ বের করে নেওয়ার এই প্রক্রিয়াটি কার্যত রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার মধ্যেই গড়ে উঠেছিল। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ধীরে ধীরে সেই চিত্র প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে। একই সঙ্গে নতুন পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনার অধীনে ব্যাংকগুলো নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করে। অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায়ী বছরের আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, গ্রাহকদের আস্থা ধরে রাখতে পেরেছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো, যা তাদের ভাঙা মেরুদণ্ড সোজা হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে চারটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে গ্রাহকরা নতুন করে জমা রেখেছেন মোট ৫০ হাজার ৪৩০ কোটি টাকা। এটি আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। একই সময়ে নগদ অর্থ আদায় বা ক্যাশ রিকভারি হয়েছে প্রায় ৪ হাজার ২৫৫ কোটি টাকা। প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের চমক দেখা গেছে। ওই বছরে চার ব্যাংক মিলিয়ে রেমিট্যান্স এসেছে প্রায় ৬৫ হাজার কোটি টাকা, যা ব্যাংকগুলোর তারল্য পরিস্থিতি কিছুটা হলেও স্বস্তিদায়ক করেছে।
চার ব্যাংকের মধ্যে সোনালী ব্যাংক উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখিয়েছে। ২০২৫ সালে ব্যাংকটির আমানত বেড়েছে ১৪ হাজার ৮৫৮ কোটি টাকা। একই সঙ্গে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা কমে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৬ হাজার ২৫০ কোটি টাকায়। ক্যাশ রিকভারি হয়েছে ১ হাজার ২০৩ কোটি টাকা। প্রবাসী আয়ে ব্যাংকটি পেয়েছে ১ হাজার ৮৪২ কোটি টাকা এবং পুনঃতফসিল করেছে প্রায় ৭৫০ কোটি টাকা। সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের দাবি, খেলাপি আদায়ের গতি অব্যাহত থাকলে খুব শিগগিরই মন্দ ঋণের হার আরও সহনীয় পর্যায়ে নামবে।
অগ্রণী ব্যাংকও ২০২৫ সালে ভালো পারফরম্যান্স দেখিয়েছে। এক বছরে ব্যাংকটির আমানত বেড়েছে ১৩ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা। শ্রেণিকৃত ঋণের হার প্রায় ২ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৩৮ দশমিক ৬৫ শতাংশে। ক্যাশ রিকভারি হয়েছে ১ হাজার ৩৭ কোটি টাকা। সবচেয়ে বড় সাফল্য এসেছে রেমিট্যান্স খাতে। চার ব্যাংকের মধ্যে সর্বোচ্চ প্রবাসী আয় এসেছে অগ্রণী ব্যাংকের মাধ্যমে, যার পরিমাণ প্রায় ৩৩ হাজার ৯৬১ কোটি টাকা। এই প্রবৃদ্ধি ব্যাংকটির আর্থিক সক্ষমতা বাড়াতে বড় ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জনতা ব্যাংক ২০২৫ সালে সর্বোচ্চ আমানত সংগ্রহকারী রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক হিসেবে উঠে এসেছে। এক বছরে ব্যাংকটি সংগ্রহ করেছে ১৫ হাজার ৭৪০ কোটি টাকা আমানত। একই সময়ে পুনঃতফসিল করা হয়েছে প্রায় ৪ হাজার ৮০০ কোটি টাকা ঋণ। ক্যাশ রিকভারি হয়েছে ৯১৫ কোটি টাকা। প্রবাসী আয় এসেছে ২৭ হাজার ৫৫৫ কোটি ৯০ লাখ টাকা। বিশ্লেষকদের মতে, জনতা ব্যাংকের এই পারফরম্যান্স প্রমাণ করে যে সঠিক ব্যবস্থাপনা ও আস্থার পরিবেশ তৈরি হলে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোও বড় অংকের আমানত টানতে সক্ষম।
রুপালী ব্যাংকও পিছিয়ে নেই। ২০২৫ সালে ব্যাংকটির আমানত বেড়েছে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা। খেলাপি ঋণের হার ৬ শতাংশ কমে বর্তমানে মোট ঋণের প্রায় ৩৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। রেমিট্যান্স খাতে ব্যাংকটি পেয়েছে প্রায় ১ হাজার ৪৭৬ কোটি টাকা। তুলনামূলকভাবে ছোট পরিসরের এই ব্যাংকের জন্য এটি একটি ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শওকত আলী জানিয়েছেন, খেলাপি অর্থ আদায়ের হার বাড়তে থাকায় চলতি বছরের মার্চের মধ্যে মন্দ ঋণের পরিমাণ আশান্বিত পর্যায়ে নেমে আসবে বলে তারা আশা করছেন। তার মতে, গ্রাহকদের আস্থা ফেরানোই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এবং সেই লক্ষ্যেই ব্যাংকটি কাজ করছে।
তবে অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করছেন, এই অগ্রগতি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং ও ইন্স্যুরেন্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শহীদুল জাহীদ মনে করেন, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয়েছে হেভিওয়েট খেলাপিদের মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা বেহাত হওয়ার কারণে। এই অর্থ উদ্ধার করা রাজনৈতিক সরকারের সহযোগিতা ছাড়া প্রায় অসম্ভব। তার ভাষায়, আইনি ও প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতরে থেকে শক্ত সিদ্ধান্ত না নিলে খেলাপি সংস্কৃতি বন্ধ হবে না।
আর্থিক খাত বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে এবং দেশের যে কোনো সংকট বা দুর্যোগে এই প্রতিষ্ঠানগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে এসেছে। কৃষি, শিল্প, অবকাঠামো এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে অর্থায়নের মাধ্যমে তারা অর্থনীতির একটি বড় ভরসা। তাই বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে এসব ব্যাংকের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে পরিচালনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত স্বাধীন ভাবমূর্তি বজায় রাখা না গেলে সাম্প্রতিক অগ্রগতি টেকসই হবে না বলেও মত দেন তারা।
সব মিলিয়ে, ২০২৫ সালে চার রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে আমানত বৃদ্ধির এই চিত্র আশার আলো দেখালেও সামনে পথ এখনো দীর্ঘ। সুশাসন, শক্ত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং খেলাপি ঋণ আদায়ে কার্যকর উদ্যোগই নির্ধারণ করবে সরকারি ব্যাংকগুলো সত্যিকারের ঘুরে দাঁড়াতে পারবে কি না।