ভোটের আগে রেমিট্যান্সে জোয়ার, দুই মাসে ৬ বিলিয়ন ডলার

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৩৩ বার
ভোটের আগে রেমিট্যান্সে জোয়ার, দুই মাসে ৬ বিলিয়ন ডলার

প্রকাশ: ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের অর্থনীতিতে স্বস্তির বার্তা নিয়ে এসেছে প্রবাসী আয়। টানা দুই মাসে বাংলাদেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ ছাড়িয়েছে ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ, আমদানি ব্যয় এবং ডলারের সংকট নিয়ে দীর্ঘদিনের উদ্বেগের মধ্যে এই প্রবৃদ্ধি অর্থনীতিতে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সদ্য সমাপ্ত জানুয়ারি মাসে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ৩১৭ কোটি বা ৩ দশমিক ১৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। রোববার (১ ফেব্রুয়ারি) বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, জানুয়ারির এই রেমিট্যান্স দেশের ইতিহাসে একক মাস হিসেবে তৃতীয় সর্বোচ্চ এবং চলতি ২০২৪–২৫ অর্থবছরের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ প্রবাহ।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যান বলছে, বছর ব্যবধানে জানুয়ারি মাসে রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪৫ দশমিক ১০ শতাংশ। আগের বছর একই মাসে দেশে এসেছিল ২১৮ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে প্রবাসী আয়ে বড় ধরনের উল্লম্ফন ঘটেছে, যা অর্থনীতিবিদদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

এর আগের মাস ডিসেম্বরেও রেমিট্যান্স প্রবাহ ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। ওই মাসে দেশে আসে ৩২২ কোটি ৬৭ লাখ বা ৩ দশমিক ২২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এটি দেশের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং চলতি অর্থবছরের একক মাস হিসেবে সর্বোচ্চ হিসেবেই বিবেচিত। ডিসেম্বর ও জানুয়ারি—এই দুই মাস মিলিয়ে মোট রেমিট্যান্সের পরিমাণ দাঁড়ায় ৬ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি, যা সাম্প্রতিক সময়ের রেকর্ড অর্জনের কাছাকাছি।

ব্যাংক ও আর্থিক খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাধারণত রমজান, ঈদুল ফিতর ও বাংলা নববর্ষকে কেন্দ্র করে প্রবাসীরা পরিবার-পরিজনের জন্য তুলনামূলক বেশি অর্থ পাঠান। তবে এবারের চিত্র কিছুটা ভিন্ন। এসব মৌসুমি কারণের পাশাপাশি আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখেও প্রবাসীরা বেশি পরিমাণে দেশে টাকা পাঠাচ্ছেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। নির্বাচনের আগে দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রবাসীদের মধ্যে এক ধরনের সচেতনতা ও দায়িত্ববোধ কাজ করছে, যা রেমিট্যান্স প্রবাহে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, টানা দুই মাসে রেমিট্যান্সের এই প্রবৃদ্ধি শুধু পরিসংখ্যানগত সাফল্য নয়, বরং সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। দীর্ঘদিন ধরে ডলার সংকট, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়া এবং আমদানি ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাওয়ার বাস্তবতায় প্রবাসী আয় অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভরসা হয়ে উঠেছে। রেমিট্যান্স বাড়ায় ব্যাংকিং খাতে তারল্য কিছুটা স্বস্তি পাচ্ছে এবং বৈদেশিক লেনদেনে চাপ কমার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হুন্ডি প্রতিরোধে কঠোর অবস্থান, বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠাতে প্রণোদনা এবং ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবার সম্প্রসারণ এই প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে। বর্তমানে প্রবাসীরা বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে পাঠানো অর্থের ওপর সরকারের ঘোষিত নগদ প্রণোদনা পাচ্ছেন, যা অনানুষ্ঠানিক পথের বদলে আনুষ্ঠানিক পথে অর্থ পাঠাতে উৎসাহ দিচ্ছে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও প্রবাসীদের এই ইতিবাচক ভূমিকা দেশের অর্থনীতিতে আস্থার প্রতিফলন। নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রবাসীরা পরিবার-পরিজনের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং সম্ভাব্য ব্যয় মেটাতে আগেভাগেই অর্থ পাঠাচ্ছেন। একই সঙ্গে অনেকে দেশে বিনিয়োগ বা সঞ্চয়ের উদ্দেশ্যেও বাড়তি অর্থ পাঠাচ্ছেন বলে ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন।

রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ার আরেকটি দিক হলো বৈশ্বিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের অবস্থান। মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে কর্মরত প্রবাসীরা আগের তুলনায় নিয়মিতভাবে দেশে টাকা পাঠাচ্ছেন। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে জ্বালানি ও অবকাঠামো খাতে কাজ করা বাংলাদেশিদের আয় স্থিতিশীল থাকায় রেমিট্যান্সে তার প্রভাব পড়েছে।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, এই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে কাঠামোগত সংস্কার জরুরি। শুধু নির্বাচনের আগে সাময়িক উল্লম্ফন নয়, দীর্ঘমেয়াদে বৈধ পথে রেমিট্যান্স প্রবাহ নিশ্চিত করতে প্রবাসীদের আস্থা ধরে রাখা প্রয়োজন। ব্যাংকিং সেবার গতি, স্বচ্ছতা এবং প্রণোদনা নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে না পারলে এই প্রবৃদ্ধি টেকসই নাও হতে পারে।

এদিকে সাধারণ মানুষের মধ্যেও রেমিট্যান্স বৃদ্ধির প্রভাব পড়ছে। গ্রামাঞ্চলে প্রবাসী পরিবারের ব্যয়ক্ষমতা বাড়ছে, স্থানীয় বাজারে লেনদেন চাঙা হচ্ছে এবং ভোগব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতেও একটি ইতিবাচক সঞ্চালন তৈরি হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সব মিলিয়ে ভোটের আগে টানা দুই মাসে ৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স প্রবাহ বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য এক ধরনের স্বস্তির নিশ্বাস। নির্বাচনের প্রাক্কালে যখন নানা অনিশ্চয়তা নিয়ে আলোচনা চলছে, তখন প্রবাসী আয়ের এই জোয়ার অর্থনীতিকে কিছুটা স্থিতিশীল রাখবে বলে আশা করছেন নীতিনির্ধারকরা। এখন দেখার বিষয়, এই ধারা কতটা দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং নির্বাচন পরবর্তী সময়েও রেমিট্যান্স প্রবাহ একই গতিতে অব্যাহত থাকে কি না।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত