প্রকাশ: ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আজকের প্রযুক্তিনির্ভর জীবনে কম্পিউটার, ল্যাপটপ, ট্যাবলেট এবং স্মার্টফোন ব্যবহারের মাত্রা দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। কর্মক্ষেত্র থেকে শিক্ষা, বিনোদন এবং দৈনন্দিন কাজের প্রায় সবক্ষেত্রেই মানুষ ডিজিটাল ডিভাইসের উপর নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে। তবে এই দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহার চোখের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে পরিণত হচ্ছে। চোখের বিভিন্ন সমস্যার মধ্যে পড়ে দৃষ্টিশক্তির হ্রাস, চোখের পানি পড়া, লাল চোখ, মাথাব্যথা এবং চোখে জ্বালা হওয়া। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব সমস্যার মূল কারণ হল চোখের উপর ক্রমাগত চাপ, পর্যাপ্ত বিরাম না দেওয়া এবং অনিয়মিত চোখের যত্ন।
চোখের স্বাস্থ্যের জন্য প্রথম এবং সবচেয়ে সহজ কৌশল হলো নিয়মিত পলক ফেলা। যখন আমরা মনিটর বা স্ক্রিনের দিকে মনোযোগ দিয়ে কাজ করি, আমাদের পলক ফেলার হার স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কমে যায়। ফলে চোখ শুষ্ক হয়ে যায় এবং আর্দ্রতা হারায়। নিয়মিত পলক ফেলার মাধ্যমে চোখের ভেতরের আর্দ্রতা বজায় থাকে, যা চোখকে শুষ্কতা এবং জ্বালা থেকে রক্ষা করে।
কম্পিউটারের ব্যবহারকালে উপযুক্ত আলোর পরিবেশ বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। মনিটরে যদি কোনো আলো বা প্রতিফলন পড়ে, তা চোখকে অতিরিক্ত চাপ দেয়। দিনের বেলায় সরাসরি সূর্যের আলো থেকে দূরে বসা এবং রাতের সময় সম্পূর্ণ অন্ধকারে কম্পিউটার ব্যবহার এড়ানো উচিত। মনিটরের আলোর উজ্জ্বলতা এমনভাবে সমন্বয় করা উচিত, যা চোখকে আরাম দেয়। অতিরিক্ত উজ্জ্বলতা বা কম আলো চোখকে ক্লান্ত করে এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারে দৃষ্টিশক্তি হ্রাস করতে পারে।
চোখ ও মনিটরের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। মনিটরের উপরের অংশ চোখের লেভেলের কাছাকাছি রাখা উচিত। এই উচ্চতার সামঞ্জস্য চোখকে স্বাভাবিকভাবে মনিটরের দিকে তাকাতে সহায়তা করে এবং ঘাড় ও চোখের মাংসপেশিতে চাপ কমায়। পাশাপাশি, পর্দায় ব্যবহৃত ফন্টও বড় এবং স্পষ্ট হওয়া উচিত। খুব ছোট ফন্ট চোখকে বেশি কষ্ট দেয়। বয়স্ক ব্যবহারকারীরা তাদের কম্পিউটারের কন্ট্রোল প্যানেল থেকে ফন্ট সাইজ এবং রেজুলেশন সামঞ্জস্য করে নিতে পারেন, যাতে চোখের চাপ কমে।
চোখের আরাম বজায় রাখার জন্য বিশেষজ্ঞরা ২০-২০-২০ নিয়মের পরামর্শ দেন। এর অর্থ হলো প্রতি ২০ মিনিট পর পর স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে অন্তত ২০ সেকেন্ডের জন্য ২০ ফুট দূরের কোনো স্থির বস্তুর দিকে তাকানো। এটি চোখকে পুনরায় স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনে এবং চোখের পেশীকে বিশ্রাম দেয়।
মনিটরের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা ও চোখের যত্নের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। স্ক্রিনে ধুলাবালু বা আঙুলের ছাপ থাকলে তা চোখের উপর চাপ বাড়ায় এবং দৃশ্যমানতা কমায়। নিয়মিত পর্দা পরিষ্কার রাখা চোখের স্বাস্থ্যের জন্য সহায়ক। এছাড়া দীর্ঘক্ষণ কম্পিউটার ব্যবহারের সময় চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়াও কার্যকর একটি পদ্ধতি।
চোখের স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দীর্ঘ সময় নিরবচ্ছিন্নভাবে স্ক্রিনের দিকে তাকানো এড়ানো। দীর্ঘ সময় কম্পিউটার বা মোবাইলের স্ক্রিনে তাকালে চোখের পেশী ও লেন্সের ওপর চাপ পড়ে এবং তা দৃষ্টিশক্তি হ্রাসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই কাজের মধ্যে ছোট বিরতি নেওয়া এবং চোখের ব্যায়াম করা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
বিশেষজ্ঞরা আরও পরামর্শ দেন, পর্দার সামনের বসা বা দাঁড়ানো অবস্থায় চোখের উচ্চতা এবং ব্যাকসপোর্ট সঠিক রাখার মাধ্যমে ঘাড়, কাঁধ ও চোখের চাপ কমানো সম্ভব। পাশাপাশি পর্যাপ্ত জল পান করা, সঠিক খাদ্যাভ্যাস এবং পর্যাপ্ত ঘুম চোখের স্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য। ভিটামিন এ, সি এবং ই সমৃদ্ধ খাবার চোখের দৃষ্টিশক্তি ও স্বাস্থ্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।
কম্পিউটার ব্যবহারকারীদের চোখের যত্ন শুধু শারীরিক স্বাস্থ্যের জন্য নয়, মানসিক স্বস্তি ও কর্মক্ষমতার জন্যও জরুরি। চোখে সমস্যা থাকলে মনোযোগ কমে যায়, কাজের উৎপাদনশীলতা হ্রাস পায় এবং দীর্ঘমেয়াদে চোখের স্থায়ী সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই প্রতিদিনের জীবনে ছোট ছোট পরিবর্তন ও সচেতনতা চোখের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য।
সংক্ষেপে, চোখের সুরক্ষা ও স্বাস্থ্যের জন্য নিয়মিত পলক ফেলা, পর্দার উজ্জ্বলতা নিয়ন্ত্রণ, স্ক্রিনের উচ্চতা ঠিক রাখা, ২০-২০-২০ নিয়ম অনুসরণ, স্ক্রিন পরিষ্কার রাখা এবং চোখের পেশীকে বিরাম দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সহজ প্রতিদিনের অভ্যাস চোখকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে এবং দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা প্রতিরোধ করে। কম্পিউটার ও ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহারের সময় এই নিয়মগুলো মেনে চললে চোখের স্বাস্থ্যের ক্ষতি কমানো সম্ভব এবং চোখ দীর্ঘ সময় সক্রিয় ও সতেজ থাকে।