প্রকাশ: ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পূর্ব ও পূর্বাঞ্চলজুড়ে নেমে এসেছে স্মরণকালের ভয়াবহ শীতকালীন দুর্যোগ। একের পর এক তীব্র তুষারঝড়, হিমাঙ্কের নিচে নেমে যাওয়া তাপমাত্রা, প্রবল বাতাস ও পিচ্ছিল সড়কের কারণে জনজীবন কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। প্রতিকূল এই আবহাওয়ার মধ্যে দেশটির বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে দুর্ঘটনা, বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা, চিকিৎসা সংকট ও যোগাযোগব্যবস্থার বিপর্যয়ের খবর মিলছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহে শীতজনিত নানা ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে প্রাণহানির সংখ্যা ১০০ ছাড়িয়েছে, যা দেশটির সাম্প্রতিক ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ শীতকালীন দুর্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উত্তর ক্যারোলিনা। অঙ্গরাজ্যটির বিভিন্ন এলাকায় রেকর্ড পরিমাণ তুষারপাত হয়েছে। কান্নাপোলিস শহরে প্রায় ১৪ ইঞ্চি এবং শার্লট ও গ্রিনভিলের মতো বড় শহরগুলোতে ১১ ইঞ্চির বেশি তুষার জমেছে। আবহাওয়া দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, শার্লট শহরের ইতিহাসে এটি চতুর্থ সর্বোচ্চ তুষারপাত। ঘন তুষারের আস্তরণে ঢেকে গেছে সড়ক, ফুটপাত ও আবাসিক এলাকা। অনেক জায়গায় বরফ পরিষ্কারের যন্ত্র পৌঁছাতে না পারায় সাধারণ মানুষ কার্যত গৃহবন্দি হয়ে পড়েছেন।
তীব্র শীত ও বরফে ঢাকা সড়কের কারণে উত্তর ক্যারোলিনায় এক হাজারেরও বেশি যানবাহন দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটেছে। অঙ্গরাজ্যটির গভর্নর জোশ স্টেইন জানিয়েছেন, শুধুমাত্র সড়ক দুর্ঘটনাতেই অন্তত দুইজনের মৃত্যু হয়েছে। তিনি জনগণকে অপ্রয়োজনে ঘর থেকে বের না হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, রাস্তাঘাট এখনও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। জরুরি পরিষেবা ছাড়া সব ধরনের ভ্রমণ সীমিত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় স্কুল, কলেজ ও সরকারি দপ্তর সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
উত্তর ক্যারোলিনার পাশাপাশি দক্ষিণ ক্যারোলিনা, জর্জিয়া ও ভার্জিনিয়াতেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে তুষারপাত হয়েছে। এসব অঙ্গরাজ্যে সাধারণত এত বেশি তুষার দেখা যায় না, ফলে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও অবকাঠামোর ঘাটতি প্রকট হয়ে উঠেছে। অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ লাইনের ওপর বরফ জমে খুঁটি ভেঙে পড়েছে, হাজার হাজার মানুষ বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় রাত কাটাচ্ছেন। শীতল আবহাওয়ায় বিদ্যুৎ না থাকায় বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষের জন্য পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে।
দক্ষিণের উষ্ণ রাজ্য হিসেবে পরিচিত ফ্লোরিডাও এই শৈত্যপ্রবাহের তীব্র প্রভাব থেকে রেহাই পায়নি। সেখানে গত দশ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঠাণ্ডা অনুভূত হচ্ছে। ভেরো বিচ ও মেলবোর্ন শহরে তাপমাত্রা নেমে এসেছে যথাক্রমে ২৭ ও ২৬ ডিগ্রি ফারেনহাইটে, যা গত কয়েক দশকের ফেব্রুয়ারির রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। হঠাৎ এমন তাপমাত্রা পতনে ফসলের ক্ষতি, পানির পাইপ জমে যাওয়া এবং গৃহহীন মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে। স্থানীয় প্রশাসন জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র খুলে দিলেও সব মানুষকে সহায়তার আওতায় আনা সম্ভব হয়নি।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলজুড়ে, বিশেষ করে নিউ ইয়র্কসহ আশপাশের অঙ্গরাজ্যগুলোতে ঘণ্টায় ২০ থেকে ৩০ মাইল বেগে হিমশীতল বাতাস বইছে। এই প্রবল বাতাস শীতের অনুভূতিকে আরও তীব্র করে তুলেছে। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, প্রকৃত তাপমাত্রার তুলনায় ‘উইন্ড চিল’ বা বাতাসজনিত শীত অনুভূত হচ্ছে আরও কয়েক ডিগ্রি কম। ফলে বাইরে বের হলেই শরীর দ্রুত অবশ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
প্রতিকূল এই আবহাওয়ার প্রভাব পড়েছে জরুরি সেবাব্যবস্থায়ও। অ্যাম্বুলেন্স ও ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি অনেক এলাকায় সময়মতো পৌঁছাতে পারছে না। হাসপাতালগুলোতে শীতজনিত অসুস্থ রোগীর চাপ বেড়েছে। হাইপোথার্মিয়া, হৃদ্রোগজনিত সমস্যা ও দুর্ঘটনায় আহত রোগীদের চিকিৎসা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসকরা। কিছু এলাকায় ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন করে উদ্ধার ও সহায়তা কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবেই এমন চরম আবহাওয়ার ঘটনা বাড়ছে। একদিকে রেকর্ড তাপপ্রবাহ, অন্যদিকে অস্বাভাবিক শীত ও তুষারঝড়—এই বৈপরীত্যই জলবায়ু সংকটের বড় ইঙ্গিত। যুক্তরাষ্ট্রের আবহাওয়া সংস্থাগুলো সতর্ক করে জানিয়েছে, এমন দুর্যোগ ভবিষ্যতে আরও ঘন ঘন ও আরও তীব্র আকারে দেখা দিতে পারে।
তবে কিছুটা স্বস্তির খবরও রয়েছে। আবহাওয়া পূর্বাভাস অনুযায়ী, নতুন সপ্তাহ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের তাপমাত্রা ধীরে ধীরে কিছুটা বাড়তে পারে এবং বাতাসের গতি কমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। যদিও কর্তৃপক্ষ সতর্ক করে বলছে, বরফ গলতে শুরু করলে নতুন করে বন্যা বা সড়ক ধসের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত জনগণকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সব মিলিয়ে, তীব্র তুষারঝড় যুক্তরাষ্ট্রের জনজীবনে এক গভীর সংকট তৈরি করেছে। প্রাণহানির মর্মান্তিক সংখ্যা, ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো ও লাখো মানুষের দুর্ভোগ এই দুর্যোগের ভয়াবহতাই তুলে ধরছে। শীতের এই কঠিন সময়ে মানবিক সহায়তা, দ্রুত উদ্ধার তৎপরতা ও সচেতন আচরণই পারে ক্ষয়ক্ষতি কিছুটা হলেও কমিয়ে আনতে।