আরও বাড়ল এলপিজির দাম, বাড়তি চাপ ভোক্তা পর্যায়ে

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৬৫ বার
আরও বাড়ল এলপিজির দাম, বাড়তি চাপ ভোক্তা পর্যায়ে

প্রকাশ: ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ভোক্তা পর্যায়ে আবারও বাড়ানো হলো তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজির দাম। ফেব্রুয়ারি মাসের জন্য ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ৫০ টাকা বাড়িয়ে এক হাজার ৩৫৬ টাকা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। সোমবার ২ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা ৬টা থেকে এই নতুন দাম কার্যকর হয়েছে। একই সঙ্গে বাড়ানো হয়েছে অটো গ্যাসের দামও, যা পরিবহন খাতে নতুন করে ব্যয়ের চাপ সৃষ্টি করবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে সৌদি আরামকোর ঘোষিত প্রোপেন ও বিউটেনের মূল্য এবং ডলারের বিনিময় হার বিবেচনায় নিয়ে ফেব্রুয়ারি মাসের জন্য এলপিজির নতুন মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে। তার ভাষায়, “বিশ্ববাজারে দাম বাড়ার কারণে এলপিজির আমদানি খরচ বেড়েছে। সেই বাস্তবতা মাথায় রেখেই কমিশন দাম সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।”

এর আগে গত ৪ জানুয়ারি এলপিজির দাম সমন্বয় করা হয়েছিল। তখন ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ৫৩ টাকা বাড়িয়ে এক হাজার ৩০৬ টাকা নির্ধারণ করা হয়। মাত্র এক মাসের ব্যবধানে আবারও দাম বাড়ায় ভোক্তাদের মধ্যে উদ্বেগ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে শহর ও গ্রাম—উভয় পর্যায়েই যেসব পরিবার রান্নার কাজে এলপিজির ওপর নির্ভরশীল, তাদের মাসিক ব্যয় আরও বেড়ে গেল।

এলপিজি এখন দেশের জ্বালানি ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। প্রাকৃতিক গ্যাসের সংকটের কারণে অনেক এলাকা এখনও পাইপলাইনের আওতায় আসেনি। ফলে সেসব অঞ্চলে রান্নার প্রধান জ্বালানি হিসেবে এলপিজির ব্যবহার দ্রুত বেড়েছে। শুধু শহর নয়, গ্রামাঞ্চলেও ধীরে ধীরে এলপিজির চাহিদা বাড়ছে। এমন বাস্তবতায় বারবার দাম বাড়া সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় সরাসরি প্রভাব ফেলছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এলপিজির দাম বাড়ার প্রভাব শুধু রান্নার খরচেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পরিবহন, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং বিভিন্ন সেবা খাত। অটো গ্যাসের দাম বাড়ায় সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও অন্যান্য যানবাহনের ভাড়া বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এর ফলে যাত্রী সাধারণের দৈনন্দিন যাতায়াত ব্যয়ও বাড়তে পারে।

বিইআরসি সূত্র জানায়, আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির দাম প্রতি মাসে পরিবর্তিত হয়। বিশেষ করে সৌদি আরামকো যে কন্ট্রাক্ট প্রাইস ঘোষণা করে, সেটির ওপর ভিত্তি করেই বাংলাদেশের বাজারে দাম নির্ধারণ করা হয়। পাশাপাশি ডলারের বিনিময় হার, শিপিং খরচ এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয়ও দামের ওপর প্রভাব ফেলে। ফেব্রুয়ারি মাসে এসব সূচক ঊর্ধ্বমুখী থাকায় কমিশন দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়।

তবে ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর মতে, আন্তর্জাতিক বাজারের দামের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দাম সমন্বয় করা হলেও দেশের সাধারণ মানুষের আয় সেই হারে বাড়ছে না। ফলে প্রতিটি মূল্যবৃদ্ধিই তাদের জন্য বাড়তি চাপ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তারা সরকারের কাছে এলপিজির দাম নির্ধারণে ভোক্তাবান্ধব নীতি গ্রহণের দাবি জানিয়েছে।

এদিকে এলপিজি ব্যবসায়ীরা বলছেন, দাম সমন্বয়ের ফলে বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে। তাদের দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লেও যদি স্থানীয় বাজারে সমন্বয় না করা হয়, তাহলে আমদানি ও সরবরাহে সমস্যা দেখা দিতে পারে। এতে কৃত্রিম সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও থাকে। তাই নিয়মিত সমন্বয়কে তারা ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন।

তবে সাধারণ ভোক্তাদের অভিজ্ঞতা ভিন্ন। রাজধানীর এক গৃহিণী বলেন, “প্রতি মাসেই কোনো না কোনো কিছুর দাম বাড়ছে। আগে গ্যাস ছিল, এখন নেই। এলপিজিতে চলে এসেছি, কিন্তু সেটার দামও বারবার বাড়ছে। সংসার চালানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে।” একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেকেই।

অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানি খাতের মূল্যবৃদ্ধি সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিতে পারে। রান্নার গ্যাসের দাম বাড়লে খাদ্যপণ্যের উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয়ও বাড়ে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত বাজারে পড়ে। তাই এলপিজির দাম বাড়ার বিষয়টি শুধু একটি পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি নয়, বরং সামগ্রিক অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত।

সরকারি পর্যায়ে বলা হচ্ছে, জ্বালানি খাতে ধীরে ধীরে স্বচ্ছতা আনা হচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় রেখেই দাম নির্ধারণ করা হচ্ছে। তবে ভবিষ্যতে বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর মাধ্যমে আমদানিনির্ভরতা কমানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

সব মিলিয়ে, ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুতেই এলপিজির দাম বাড়ায় সাধারণ মানুষের ওপর নতুন করে চাপ তৈরি হলো। বিশ্ববাজারের বাস্তবতা ও স্থানীয় অর্থনৈতিক অবস্থার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে কীভাবে জ্বালানি নীতি প্রণয়ন করা যায়—সে প্রশ্ন আবারও সামনে এসেছে। ভোক্তারা এখন তাকিয়ে আছেন, সামনে মাসগুলোতে দাম স্থিতিশীল থাকবে কিনা, নাকি এলপিজির মূল্যবৃদ্ধির ধারা আরও অব্যাহত থাকবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত