হঠাৎ কৃষিঋণের তথ্য চাওয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংকে অস্বস্তি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ১১ বার
হঠাৎ কৃষিঋণের তথ্য চাওয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংকে অস্বস্তি

প্রকাশ: ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশে কৃষিক্ষেত্রে ঋণ সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহকে কেন্দ্র করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এক অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার হঠাৎ করে দেশের বিভিন্ন ব্যাংকের কাছে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণের বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়েছে। বিষয়টি স্বাভাবিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার বাইরে হওয়ায় ব্যাংকগুলোতে তাৎক্ষণিক তৎপরতা শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কৃষিঋণ বিভাগ থেকে ইমেইল মারফত ব্যাংকগুলোকে অনুরোধ করা হয়, রোববার দুপুর ১২টার মধ্যে তথ্য পাঠাতে হবে। ব্যাংক কর্মকর্তারা জানান, সাধারণভাবে এই ধরনের তথ্য চাওয়ার ক্ষেত্রে অনেক ধাপের অনুমোদন প্রয়োজন হয়; সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে নোট পাঠানো হয় নির্বাহী পরিচালক, ডেপুটি গভর্নর এবং ক্ষেত্রবিশেষে গভর্নরের কাছে। কিন্তু এই হঠাৎ তথ্য চাওয়ার ক্ষেত্রে এই সব প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি, যা ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি করেছে।

জানা গেছে, তথ্য চাওয়ার মূল অনুরোধকারী বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক অধ্যাপক রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি বেসরকারি গবেষণা সংস্থা ‘উন্নয়ন অন্বেষণ’এর চেয়ারপারসন হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, “পরিচালনা পর্ষদের একজন সদস্যের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণের তথ্য চাওয়া হয়েছে। এর বেশি কিছু বলার অনুমতি নেই।” ব্যাংকগুলোকে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ও পল্লি ঋণের মোট আসল, সুদ বা মুনাফা এবং বকেয়া স্থিতির বিস্তারিত তথ্য ইমেইলের মাধ্যমে পাঠাতে হবে। তথ্য প্রেরণের জন্য ব্যাংকগুলিকে মাত্র কয়েক ঘণ্টার সময় দেওয়া হয়েছিল।

ব্যাংক সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রথমে অন্য একটি পক্ষ থেকে এই তথ্য চাওয়া হলেও সংশ্লিষ্ট বিভাগ তা গ্রহণ করেনি। এরপর পরিচালনা পর্ষদের একজন সদস্যের পক্ষ থেকে জরুরি ভিত্তিতে তথ্য চাওয়া হয়। এই প্রক্রিয়ায় তথ্য সরবরাহ করা হবে কিনা, তা নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছিল।

এই ঘটনা দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত হওয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। গত বৃহস্পতিবার রাজশাহীতে নির্বাচনী সমাবেশে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঘোষণা দেন, সরকার গঠিত হলে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ করা হবে। তারেক রহমান বলেন, “দেশনেত্রী খালেদা জিয়া যখন প্রথমবার সরকার গঠন করলেন, তখন পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ করা হয়েছিল। আজ আমরা ঘোষণা দিচ্ছি, আমাদের সরকার গঠিত হলে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ করা হবে ইনশাআল্লাহ।”

তাদের পরিকল্পনায় কৃষকদের হাতে ‘কৃষক কার্ড’ পৌঁছে দেওয়া হবে। এই কার্ডের মাধ্যমে কৃষকরা একটি সিজনের প্রয়োজনীয় বীজ, সার ও কীটনাশক সরবরাহ পাবেন। তারেক রহমান আরও বলেন, “কার্ডটি দেশের প্রতিটি কৃষকের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে, যাতে তারা মৌসুমের এক ফসলের জন্য প্রয়োজনীয় সব উপকরণ সহজে পেতে পারেন।”

কৃষি ঋণ তথ্য চাওয়ার এই হঠাৎ উদ্যোগ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করেছে। ব্যাংক ও আর্থিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সাধারণত ঋণ সংক্রান্ত তথ্য চাওয়ার ক্ষেত্রে যথাযথ অনুমোদন, নোট পাঠানো এবং সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়। এই প্রক্রিয়া এ ক্ষেত্রে মানা হয়নি। ব্যাংকগুলোকে যে সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে তথ্য প্রেরণ করতে বলা হয়েছে, তা নিয়ন্ত্রণ ও সুনির্দিষ্ট যাচাই প্রক্রিয়ার জন্য যথেষ্ট নয়।

অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই ধরনের হঠাৎ তথ্য চাওয়ার ঘটনা প্রশাসনিক অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। এ ছাড়া রাজনৈতিক ঘোষণার সঙ্গে এই চাওয়ার কোনো সম্পর্ক আছে কি না, তা নিয়ে তত্ত্বাবধান ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। ব্যাংক কর্তৃপক্ষও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে এবং ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে আলোচনা চলছে, যাতে প্রক্রিয়াগত স্বচ্ছতা বজায় রাখা সম্ভব হয়।

অন্যদিকে, নির্বাচনী প্রেক্ষাপট বিবেচনায় এ ধরনের হঠাৎ তথ্য চাওয়া রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তারা বলছেন, নির্বাচনমুখী সময়ে অর্থনৈতিক তথ্যের দ্রুত সংগ্রহের প্রয়াস রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার হতে পারে। তবে ব্যাংক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা শুধুমাত্র নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশ অনুসরণ করছেন এবং কোনো রাজনৈতিক প্রভাব তাদের উপর নেই।

সর্বশেষ, বাংলাদেশের কৃষি ঋণ ব্যবস্থায় এ ধরনের হঠাৎ তথ্য চাওয়ার ঘটনা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর অতিরিক্ত নজরদারি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার গুরুত্ব পুনরায় তুলে ধরেছে। রাজনৈতিক ঘোষণার সঙ্গে আর্থিক তথ্যের সম্পর্ক, সময়সীমা সংক্রান্ত চাপ এবং প্রক্রিয়াগত স্বচ্ছতার অভাব—এই সবই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রশাসনিক অস্বস্তির কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত