প্রকাশ: ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্ব বাণিজ্য ও ভূরাজনীতির অঙ্গনে নতুন এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের সম্পর্ক। ভারতের ওপর আরোপিত উচ্চ শুল্ক উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে সম্মত হয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সর্বশেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ভারতীয় পণ্যের ওপর আরোপিত শুল্ক ৫০ শতাংশ কমিয়ে ১৮ শতাংশে নামিয়ে আনা হবে। ভারতের পক্ষ থেকে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা হ্রাস, রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করা এবং যুক্তরাষ্ট্র ও সম্ভাব্যভাবে ভেনিজুয়েলা থেকে জ্বালানি আমদানির প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে এই শুল্ক ছাড় দেওয়া হচ্ছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
এই সিদ্ধান্ত এসেছে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এক ফোনালাপের পরপরই। ফোনালাপ শেষে নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প জানান, প্রধানমন্ত্রী মোদির প্রতি তাঁর বন্ধুত্ব ও শ্রদ্ধা এবং মোদির অনুরোধের প্রেক্ষিতেই তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর একটি বাণিজ্য চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে। ট্রাম্পের ভাষায়, এই সমঝোতার ফলে যুক্তরাষ্ট্র ভারতীয় পণ্যের ওপর আরোপিত শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৮ শতাংশ নির্ধারণ করবে, যা দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কে একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও দাবি করেন, এই চুক্তির অংশ হিসেবে ভারত যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিপুল পরিমাণ পণ্য আমদানির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, নরেন্দ্র মোদি ৫০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি মূল্যের মার্কিন জ্বালানি, প্রযুক্তি, কৃষিপণ্য এবং অন্যান্য পণ্য কেনার অঙ্গীকার করেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এই অঙ্ক শুধু প্রতীকী নয়, বরং এটি বাস্তবায়িত হলে আগামী কয়েক বছরে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
হোয়াইট হাউসের একটি সূত্র বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছে, এই সিদ্ধান্তের আওতায় শুধু পারস্পরিক ২৫ শতাংশ শুল্ক কমানোই নয়, বরং রাশিয়া থেকে তেল কেনার শাস্তিস্বরূপ ভারতের সব আমদানির ওপর আরোপিত অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্কও প্রত্যাহার করা হচ্ছে। এর ফলে ভারতের ওপর মোট শুল্কের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে এবং দুই দেশের বাণিজ্যিক লেনদেন আরও সহজ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ভারতের দিক থেকেও এই সমঝোতাকে অত্যন্ত ইতিবাচক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনালাপের পর নরেন্দ্র মোদি নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, “আজ আমার প্রিয় বন্ধু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলতে পেরে দারুণ লাগছে। আমি অত্যন্ত আনন্দিত যে ভারতে তৈরি পণ্যের ওপর শুল্ক কমিয়ে ১৮ শতাংশ করা হয়েছে।” তাঁর এই মন্তব্যে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে যে, নয়াদিল্লি এই চুক্তিকে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক—উভয় দিক থেকেই বড় সাফল্য হিসেবে দেখছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই শুল্ক হ্রাসের সিদ্ধান্ত শুধু ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার বাণিজ্য সম্পর্কের ক্ষেত্রেই নয়, বরং বৈশ্বিক জ্বালানি ও ভূরাজনীতির সমীকরণেও প্রভাব ফেলতে পারে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকে রাশিয়ান তেলের ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও চাপ বেড়েছে। ভারত দীর্ঘদিন ধরে তুলনামূলক সস্তা দামে রাশিয়া থেকে তেল কিনে আসছিল। এখন সেই অবস্থান বদলে যুক্তরাষ্ট্র ও সম্ভাব্যভাবে ভেনিজুয়েলার দিকে ঝুঁকলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন ভারসাম্য তৈরি হতে পারে।
বিশ্লেষকরা আরও বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্ত দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের প্রভাব মোকাবিলার কৌশলের অংশ হিসেবেও দেখা যেতে পারে। ভারতকে বাণিজ্যিক সুবিধা দিয়ে ওয়াশিংটন নয়াদিল্লির সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক আরও গভীর করতে চাইছে। বিশেষ করে প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা এবং জ্বালানি খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র এ অঞ্চলে নিজের অবস্থান শক্ত করতে আগ্রহী।
অন্যদিকে, ভারতের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির জন্যও এই শুল্ক কমানো বড় স্বস্তির খবর। যুক্তরাষ্ট্র ভারতের অন্যতম বৃহৎ রপ্তানি বাজার। উচ্চ শুল্কের কারণে সাম্প্রতিক সময়ে ভারতীয় রপ্তানিকারকরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছিলেন। নতুন শুল্ক কাঠামো কার্যকর হলে ভারতীয় পোশাক, ওষুধ, প্রযুক্তিপণ্য ও কৃষিপণ্যের রপ্তানি বাড়তে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। এর ফলে কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
তবে সমালোচকরা বলছেন, এই চুক্তির কিছু শর্ত ভারতের জন্য দীর্ঘমেয়াদে চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করার সিদ্ধান্ত ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে, কারণ রাশিয়ান তেল তুলনামূলকভাবে সস্তা ছিল। যুক্তরাষ্ট্র বা ভেনিজুয়েলা থেকে তেল আমদানিতে খরচ বাড়লে তার প্রভাব দেশটির অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানির দামে পড়তে পারে। ফলে সরকারকে ভর্তুকি বা মূল্যনিয়ন্ত্রণে নতুন করে ভাবতে হতে পারে।
তবু সামগ্রিকভাবে এই সমঝোতাকে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের এক নতুন অধ্যায় হিসেবে দেখছেন পর্যবেক্ষকরা। ট্রাম্প ও মোদির ব্যক্তিগত বন্ধুত্ব এবং পারস্পরিক রাজনৈতিক স্বার্থ এই চুক্তি বাস্তবায়নে বড় ভূমিকা রেখেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দ্রুত কার্যকর বাণিজ্য চুক্তির ঘোষণা সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে।
সব মিলিয়ে, ভারতের ওপর শুল্ক কমানোর বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সম্মতি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অঙ্গনে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। এটি একদিকে যেমন ভারতীয় রপ্তানিকারকদের জন্য স্বস্তি বয়ে আনবে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতেও নতুন বাজার ও বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করবে। আগামী দিনে এই চুক্তি কতটা বাস্তবায়িত হয় এবং এর বাস্তব প্রভাব কী দাঁড়ায়, সেদিকেই এখন তাকিয়ে আছে বিশ্ব বাণিজ্য ও রাজনীতির পর্যবেক্ষকরা।