প্রকাশ: ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজনীতির প্রচলিত মঞ্চ, স্লোগান কিংবা আনুষ্ঠানিক বক্তৃতার বাইরে গিয়ে তরুণ ভোটারদের সঙ্গে ভিন্নধর্মী এক সংলাপে অংশ নিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মেয়ে ব্যারিস্টার জাইমা রহমান। ‘চায়ের আড্ডা’ নামে আয়োজিত এই ইন্টারেক্টিভ অনুষ্ঠানে তরুণদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন তিনি, শোনেন তাদের ভাবনা, উদ্বেগ ও স্বপ্নের কথা। হাসি, কৌতূহল আর মুক্ত মতবিনিময়ের মধ্য দিয়ে পুরো আয়োজনটি হয়ে ওঠে তরুণদের রাজনৈতিক সচেতনতা ও নাগরিক ভাবনার এক ব্যতিক্রমী মিলনমেলা।
গতকাল রাজধানীর বনানী ডিওএইচএস খেলার মাঠে অনুষ্ঠিত হয় এই ‘চায়ের আড্ডা’। বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কনটেন্ট জেনারেশন টিমের উদ্যোগে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানের মূল লক্ষ্য ছিল জাতীয় রাজনীতির সঙ্গে তরুণদের সরাসরি সংযোগ তৈরি করা এবং তাদের কণ্ঠস্বর শোনা। আয়োজনের ধরন ছিল ভিন্ন; বড় মঞ্চে একমুখী বক্তব্যের বদলে ছোট ছোট টেবিলে বসে আলাপ, প্রশ্ন–উত্তর আর খোলামেলা আলোচনা। জাইমা রহমান প্রতিটি টেবিলে গিয়ে তরুণদের সঙ্গে কথা বলেন, জানতে চান তাদের অভিজ্ঞতা, প্রত্যাশা এবং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি।
অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া তরুণদের বড় একটি অংশ সামাজিক মাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে কথা বলেন। কেউ কেউ সামাজিক মাধ্যমকে মতপ্রকাশের শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখালেও, অনেকেই সেখানে বিদ্বেষ, হয়রানি ও বিভ্রান্তির বিষয়টি তুলে ধরেন। তরুণদের বক্তব্য শুনে জাইমা রহমান বলেন, সামাজিক মাধ্যমের ভালো দিক যেমন রয়েছে, তেমনি এর নেতিবাচক দিকও অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তাঁর মতে, প্রযুক্তিকে পুরোপুরি অস্বীকার না করে এর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
ঢাকার জীবনযাত্রা ও নগর সমস্যাও আলোচনায় গুরুত্ব পায়। তরুণরা বলেন, ক্যাম্পাসের বাইরে খেলাধুলা বা মুক্ত সময় কাটানোর মতো পর্যাপ্ত জায়গা নেই। পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগও কমে যাচ্ছে। এই প্রসঙ্গে জাইমা রহমান বলেন, ঢাকায় কমিউনিটি সেন্টার, পার্ক ও উন্মুক্ত জায়গা বাড়ানো গেলে মানুষ সেখানে একত্র হতে পারবে, সামাজিক যোগাযোগ বাড়বে। তাঁর মতে, এমন জায়গা তৈরি হলে নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং মানুষ হয়তো সারাক্ষণ মোবাইল ফোনে ডুবে থাকবে না, বরং বাস্তব জীবনের কার্যক্রমে অংশ নেবে।
নারীর স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা ছিল এই আড্ডার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়। সামাজিক মাধ্যমে নারীদের মতপ্রকাশ, চলাফেরা ও কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিয়ে তরুণদের উদ্বেগের কথা উঠে আসে। জাইমা রহমান বলেন, অনেক নারীই মতপ্রকাশ করতে ভয় পান, কারণ সামাজিক ও মানসিক বাধা এখনো প্রবল। তাঁর মতে, এই পরিবর্তন স্কুল থেকেই শুরু হওয়া দরকার। শিশুদের ছোটবেলা থেকেই শেখাতে হবে কোন আচরণ গ্রহণযোগ্য আর কোনটি নয়। শুধু আইন থাকলেই যথেষ্ট নয়, আইন সম্পর্কে সচেতনতা ও সামাজিক মূল্যবোধ গড়ে তোলাও জরুরি। তিনি আরও বলেন, প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকেও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে এবং প্রয়োজন হলে তাদের সঙ্গে আবার কার্যকরভাবে কাজ করতে হবে, যাতে অনলাইন হয়রানি কমানো যায়।
ঢাকার যানজট, রাস্তার অব্যবস্থাপনা, ফুটপাতে গাড়ি চলাচল, ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য, বায়ুদূষণ এবং খাল-বিল দখল করে ভবন নির্মাণের মতো বিষয়গুলোও আলোচনায় উঠে আসে। তরুণরা বলেন, এসব সমস্যা শুধু নাগরিক ভোগান্তি নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বড় হুমকি। এ প্রসঙ্গে জাইমা রহমান বলেন, একটি বাসযোগ্য ঢাকা গড়ে তুলতে হলে নিয়মকানুন সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর করতে হবে। তাঁর ভাষায়, গাছ কমে যাওয়ার ফলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, বায়ুদূষণ বাড়ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।
শিক্ষা ব্যবস্থার বৈষম্য নিয়েও তরুণদের একাংশ কথা বলেন। শহর ও গ্রামের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সুযোগ-সুবিধার ব্যবধান, পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সামাজিক বিভাজন এবং দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের মানসম্মত শিক্ষা পাওয়ার প্রতিবন্ধকতার বিষয়টি তারা তুলে ধরেন। তরুণদের মতে, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিয়ে নেতিবাচক ধারণা সমাজে প্রচলিত, যা অযৌক্তিক। স্কুলের অনেক শ্রেণিকক্ষের অবস্থা নাজুক বলেও তারা জানান। এই আলোচনা থেকে স্পষ্ট হয় যে, শিক্ষা ক্ষেত্রে সমতা ও মানোন্নয়ন তরুণদের অন্যতম বড় প্রত্যাশা।
এক তরুণের প্রশ্নের জবাবে জাইমা রহমান বলেন, দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশে এসে তিনি নতুন করে তরুণদের চিনছেন, দেখছেন। তাঁর মতে, তরুণদের কণ্ঠস্বর যথেষ্টভাবে সামনে আনা হয় না। অথচ বাংলাদেশে প্রত্যেকেরই নিজের মত ও আদর্শ প্রকাশের অধিকার রয়েছে এবং সেই অধিকার রক্ষা করা জরুরি। তিনি বলেন, এই স্বাধীনতাকে হারিয়ে ফেললে সমাজ ও রাষ্ট্র উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে, পরিবর্তনের জন্য একা কাজ করা সম্ভব নয়; সবাইকে মিলেই এগোতে হবে।
অনুষ্ঠানে নারীদের চলাফেরা ও চাকরির ক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিয়েও বিস্তর আলোচনা হয়। তরুণ নারী ও পুরুষ উভয়েই বলেন, নিরাপদ পরিবেশ ছাড়া নারীর পূর্ণ অংশগ্রহণ সম্ভব নয়। কর্মক্ষেত্র, গণপরিবহন ও জনসমাগমস্থলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজ—উভয়ের দায়িত্ব। জাইমা রহমান এ বিষয়ে একমত পোষণ করে বলেন, নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে নারীরা আরও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে এগোতে পারবে, যা সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য।
পুরো আয়োজন জুড়ে লক্ষ্য করা যায়, তরুণরা নিজেদের কথা সরাসরি বলার সুযোগ পেয়ে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন। রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে এমন অনানুষ্ঠানিক পরিবেশে সংলাপ তাদের কাছে নতুন অভিজ্ঞতা। অনেকেই বলেন, এ ধরনের আয়োজন নিয়মিত হলে তরুণদের রাজনৈতিক আগ্রহ ও সচেতনতা আরও বাড়বে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ‘চায়ের আড্ডা’ ধরনের কর্মসূচি তরুণদের সঙ্গে রাজনৈতিক সংযোগ তৈরির একটি কার্যকর পদ্ধতি হতে পারে। এতে সরাসরি ভোট চাওয়ার বদলে সমস্যা শোনা ও মতবিনিময়ের সুযোগ তৈরি হয়, যা গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য ইতিবাচক। একই সঙ্গে নারীদের নিরাপত্তা, নগর সমস্যা ও শিক্ষা বৈষম্যের মতো বিষয়গুলো সামনে আসায় রাজনৈতিক আলোচনার পরিসরও বিস্তৃত হয়।
সব মিলিয়ে, বনানীর এই ‘চায়ের আড্ডা’ ছিল তরুণদের ভাবনা ও প্রত্যাশা জানার এক উন্মুক্ত মঞ্চ। হাসি–আড্ডার আড়ালে উঠে আসে সমাজ ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। রাজনৈতিক অঙ্গনে তরুণদের সম্পৃক্ততা বাড়াতে এমন উদ্যোগ কতটা প্রভাব ফেলবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে এই আয়োজন তরুণ ভোটারদের কণ্ঠস্বর শোনার একটি উল্লেখযোগ্য প্রচেষ্টা হিসেবে ইতোমধ্যেই আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে।