শ্যামপুরে ট্রান্সপোর্ট কর্মচারীকে কুপিয়ে ছিনতাই

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৩ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৫৬ বার
শ্যামপুরে ট্রান্সপোর্ট কর্মচারীকে কুপিয়ে ছিনতাই

প্রকাশ: ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজধানীতে আবারও ছিনতাইয়ের নৃশংস ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়েছে। ঢাকা দক্ষিণের শ্যামপুর এলাকায় এক ট্রান্সপোর্ট কর্মচারীকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে ৯০ হাজার টাকা ও একটি মুঠোফোন ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ভোররাতে কর্মস্থল থেকে বাড়ি ফেরার পথে এই হামলার শিকার হন মো. গোলাম কিবরিয়া (৪৫) নামের ওই কর্মচারী। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে, যেখানে তিনি বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

ঘটনাটি ঘটে মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) ভোর সাড়ে ৩টার দিকে শ্যামপুর খন্দকার রোডে শেখ কামাল স্কুলের সামনে। এলাকাবাসী ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ওই সময় রাস্তাটি তুলনামূলক ফাঁকা ছিল। সুযোগটি কাজে লাগিয়ে তিনজন ছিনতাইকারী রিকশার গতিরোধ করে কিবরিয়ার ওপর হামলা চালায়। ধারালো অস্ত্র ঠেকিয়ে তারা তার কাছে থাকা নগদ অর্থ ও মুঠোফোন ছিনিয়ে নেয়। বাধা দিতে গেলে ছিনতাইকারীরা নির্মমভাবে তার বাম হাতে ছুরিকাঘাত করে দ্রুত পালিয়ে যায়।

আহত গোলাম কিবরিয়ার সহকর্মী মেহেদী হাসান ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে জানান, কিবরিয়া বংশাল বোরাক ট্রান্সপোর্টে কর্মরত। তার বাসা শ্যামপুর আলমবাগ এলাকায়। প্রতিদিনের মতোই সেদিন রাতেও চট্টগ্রাম থেকে আসা ট্রান্সপোর্টের মালামাল ঢাকায় পৌঁছায়। দায়িত্ব অনুযায়ী কিবরিয়া মালামাল আনলোড করেন এবং গাড়ির ভাড়া পরিশোধ করেন। সেই ভাড়া পরিশোধ ও অন্যান্য হিসাব-নিকাশের জন্যই তার কাছে ছিল ৯০ হাজার টাকা। কাজ শেষে তিনি রিকশায় করে বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেন।

মেহেদী হাসান বলেন, ভোরের দিকে শ্যামপুর খন্দকার রোড শেখ কামাল স্কুলের সামনে পৌঁছালে হঠাৎ তিনজন দুর্বৃত্ত রিকশার সামনে এসে দাঁড়ায়। তারা প্রথমে কিবরিয়াকে ভয় দেখায় এবং ধারালো অস্ত্র বের করে তার কাছে থাকা টাকা ও ফোন দিতে বলে। কিবরিয়া বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে এক ছিনতাইকারী তার বাম হাতে ছুরিকাঘাত করে। এতে তিনি রক্তাক্ত অবস্থায় রিকশা থেকে পড়ে যান। এরপর ছিনতাইকারীরা টাকা ও ফোন নিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।

ঘটনার পর আশপাশের লোকজনের সহায়তায় কিবরিয়াকে উদ্ধার করে প্রথমে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর অবস্থার অবনতি হওয়ায় ভোর পাঁচটার দিকে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। বর্তমানে তিনি ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগের চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে রয়েছেন।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ মো. ফারুক চিকিৎসকদের বরাত দিয়ে জানান, কিবরিয়া বর্তমানে জরুরি বিভাগে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তার বাম হাতে গভীর ক্ষত রয়েছে এবং অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে তিনি শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছেন। চিকিৎসকরা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিচ্ছেন এবং তার অবস্থা পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। ঘটনার বিষয়টি শ্যামপুর থানা পুলিশকে অবহিত করা হয়েছে।

এদিকে এই ঘটনার পর শ্যামপুর ও আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, ভোররাত ও গভীর রাতে এ এলাকায় ছিনতাই ও চুরির ঘটনা আগেও ঘটেছে, তবে সাম্প্রতিক সময়ে এর মাত্রা বেড়েছে। বিশেষ করে শ্রমজীবী মানুষ, ট্রান্সপোর্ট কর্মচারী ও রিকশাচালকেরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ছেন। অনেকেই অভিযোগ করছেন, রাতে পুলিশের টহল থাকলেও তা পর্যাপ্ত নয়।

স্থানীয় এক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “ভোররাতে যারা কাজ শেষে বাড়ি ফেরেন, তারা সব সময় আতঙ্কের মধ্যে থাকেন। ট্রান্সপোর্টের লোকজনের কাছে নগদ টাকা থাকার বিষয়টি ছিনতাইকারীরা জানে। তাই তাদেরই বেশি টার্গেট করা হয়।” তিনি আরও বলেন, নিয়মিত পুলিশ টহল ও আলোকসজ্জা বাড়ানো না হলে এ ধরনের ঘটনা কমবে না।

অপরদিকে, ট্রান্সপোর্ট খাতের শ্রমিকদের মধ্যেও ক্ষোভ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। তাদের দাবি, রাতভর কাজ করার পর বাড়ি ফেরার সময় নিরাপত্তা না থাকলে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়বে। একজন ট্রান্সপোর্ট শ্রমিক বলেন, “আমরা সারা রাত মালামাল নামাই, ভাড়া পরিশোধ করি। হাতে টাকা থাকেই। কিন্তু রাস্তায় বের হলেই ভয় লাগে। আজ কিবরিয়া ভাইয়ের সঙ্গে যা হয়েছে, কাল সেটা যে কার সঙ্গে হবে বলা যায় না।”

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার পর শ্যামপুর থানা পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে এবং আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। ছিনতাইকারীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান জোরদার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। তবে এখন পর্যন্ত কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, রাজধানীতে ছিনতাইয়ের ঘটনা বাড়ার পেছনে কয়েকটি কারণ কাজ করছে। এর মধ্যে রয়েছে গভীর রাতে পর্যাপ্ত আলোর অভাব, সীমিত টহল ব্যবস্থা এবং দ্রুত নগরায়ণের ফলে অপরাধীদের লুকিয়ে পড়ার সুযোগ। তারা বলছেন, শুধু ঘটনার পর তদন্ত নয়, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাও জোরদার করতে হবে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় শ্রমজীবী মানুষ গভীর রাতে চলাচল করেন, সেখানে বিশেষ নজরদারি প্রয়োজন।

এই ঘটনার মানবিক দিকটিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। গোলাম কিবরিয়া পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি বলে জানিয়েছেন তার সহকর্মীরা। আহত অবস্থায় তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকায় তার পরিবারের দুশ্চিন্তা আরও বেড়েছে। সহকর্মীরা তার চিকিৎসা ও পরিবারের পাশে থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।

রাজধানীতে এ ধরনের ছিনতাইয়ের ঘটনা নতুন নয়, তবে প্রতিবারই তা নগরবাসীর নিরাপত্তাহীনতার চিত্রকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা, নাগরিক সচেতনতা এবং নগর ব্যবস্থাপনার সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সব মিলিয়ে, শ্যামপুরে ট্রান্সপোর্ট কর্মচারীকে কুপিয়ে ছিনতাইয়ের এই ঘটনা রাজধানীর নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। আহত কিবরিয়ার সুস্থতা কামনার পাশাপাশি অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও সহকর্মীরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত