সুদানে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে মানবিক বিপর্যয় আরও গভীর

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৩ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৬৪ বার
সুদানে আরএসএফ ও সেনাবাহিনীর সংঘর্ষ

প্রকাশ: ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সুদানের পশ্চিম ও দক্ষিণাঞ্চলে সেনাবাহিনী এবং আধাসামরিক বাহিনী র‌্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ)-এর মধ্যে নতুন করে শুরু হওয়া তীব্র সংঘর্ষ দেশটির চলমান গৃহযুদ্ধকে আরও ভয়াবহ রূপ দিচ্ছে। দারফুর ও কর্দোফান অঞ্চলে সোমবার পাল্টাপাল্টি হামলার মধ্য দিয়ে এই সংঘাত নতুন মাত্রা পেয়েছে। সামরিক সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, উভয় পক্ষই একে অপরের নিয়ন্ত্রিত অবস্থান লক্ষ্য করে ভারী হামলা চালিয়েছে, যার ফলে বেসামরিক মানুষের জীবন আরও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

পশ্চিম দারফুরের জালিংগেই শহর, যা বর্তমানে আরএসএফ-এর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, সেখানে সেনাবাহিনীর হামলার ঘটনা স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, হামলার পর শহরের একটি ভবন থেকে ধোঁয়া ও আগুনের কুণ্ডলী উঠতে দেখা যায়। সামরিক সূত্রের দাবি, ওই ভবনটি আরএসএফ তাদের অস্ত্র ও রসদ সংরক্ষণের জন্য গুদাম হিসেবে ব্যবহার করছিল। যদিও আরএসএফ এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি, তবে স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধের ভারে নুয়ে পড়া শহরটির বেসামরিক অবকাঠামো এমন হামলায় আরও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

অন্যদিকে, দক্ষিণ কর্দোফানের ডিলিং শহরে আরএসএফ-এর ড্রোন হামলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। সাম্প্রতিক সময়ে সেনাবাহিনী সেখানে আরএসএফ-এর দীর্ঘদিনের অবরোধ ভেঙে দেওয়ার পর পাল্টা প্রতিক্রিয়া হিসেবেই এই ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। স্থানীয় সূত্র জানায়, ড্রোনটি একটি সরকারি মানবিক সহায়তা সংস্থার কার্যালয়ে আঘাত হানে। এতে হতাহতের নির্দিষ্ট সংখ্যা জানা না গেলেও মানবিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া গৃহযুদ্ধে ডিলিং শহরটি অন্যতম প্রধান সংঘর্ষকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে, যেখানে বেসামরিক মানুষ প্রতিনিয়ত যুদ্ধের মাঝখানে আটকা পড়ছে।

সামরিক সূত্র জানিয়েছে, গত সপ্তাহে ডিলিংয়ের আশপাশে দুটি মানবিক করিডোর খোলার ঘোষণা দেওয়ার পর সেনাবাহিনী দক্ষিণ কর্দোফানের রাজধানী কাদুগলির দিকে অগ্রসর হতে শুরু করেছে। এই অগ্রযাত্রা আরএসএফ-এর জন্য একটি কৌশলগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে, কারণ কাদুগলি অঞ্চলটি কর্দোফানের রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। তবে এই অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে বেসামরিক মানুষের ঝুঁকিও বহুগুণে বেড়ে গেছে।

জাতিসংঘের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, চলমান সংঘাতের কারণে কাদুগলি শহরের প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ, অর্থাৎ আনুমানিক ১ লাখ ৪৭ হাজার বাসিন্দা, নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। বহু পরিবার নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে পার্শ্ববর্তী এলাকায় ছুটছে, কিন্তু সেখানেও খাদ্য, পানি ও চিকিৎসাসেবার তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থাগুলো সতর্ক করে বলছে, এই বাস্তুচ্যুতি পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে কর্দোফানে একটি বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয় অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে।

গত অক্টোবরে দারফুর অঞ্চলে সেনাবাহিনীর শেষ ঘাঁটি এল-ফাশের পতনের পর আরএসএফ তাদের কৌশলগত মনোযোগ উর্বর ও বিস্তৃত কর্দোফান অঞ্চলের দিকে সরিয়ে নেয়। এল-ফাশের পতনের পর আরএসএফ-এর বিরুদ্ধে বেসামরিক মানুষ হত্যা, যৌন সহিংসতা, অপহরণ ও লুটপাটের গুরুতর অভিযোগ ওঠে। জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো সেই সময় ঘটনাগুলোকে সম্ভাব্য গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। এখন আশঙ্কা করা হচ্ছে, কর্দোফানেও একই ধরনের সহিংসতার পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে।

নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিলের (এনআরসি) মহাসচিব জ্যান এগেল্যান্ড দক্ষিণ কর্দোফানের পরিস্থিতিকে ‘সুদানের সবচেয়ে বিপজ্জনক ও উপেক্ষিত এলাকা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। অঞ্চলটি পরিদর্শন শেষে তিনি বলেন, পুরো শহরের মানুষ চরম খাদ্যসংকটে ভুগছে এবং জীবন বাঁচাতে সবকিছু ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছে। তাঁর ভাষায়, এটি একটি সম্পূর্ণ মানবসৃষ্ট দুর্যোগ, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দ্রুত ও কার্যকর হস্তক্ষেপ ছাড়া আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।

জাতিসংঘ আগেই সতর্ক করেছে, কর্দোফানে সহিংসতা অব্যাহত থাকলে এল-ফাশের মতো গণহত্যা ও গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে। সংস্থাটি জানিয়েছে, বেসামরিক মানুষের ওপর লক্ষ্য করে চালানো হামলা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের ওপর সহিংসতা, খাদ্য ও চিকিৎসাসেবার ওপর হামলা পরিস্থিতিকে আরও সংকটময় করে তুলছে।

সেনাবাহিনী ও তাদের সাবেক মিত্র আরএসএফ-এর মধ্যে এই গৃহযুদ্ধ এখন সুদানের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ অধ্যায়গুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, এই সংঘাতে এখন পর্যন্ত হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছে এবং প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। দেশটির অর্থনীতি, স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও সামাজিক কাঠামো প্রায় ভেঙে পড়েছে। স্কুল, হাসপাতাল ও বাজারগুলো যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হওয়ায় সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপন কার্যত অসম্ভব হয়ে উঠেছে।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বারবার যুদ্ধবিরতি ও রাজনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানালেও এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, সুদানের এই সংঘাত কেবল একটি সামরিক লড়াই নয়, বরং এটি ক্ষমতা, সম্পদ ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা দীর্ঘদিনের সংকটের বহিঃপ্রকাশ। দ্রুত সমাধান না হলে এই যুদ্ধ শুধু সুদান নয়, পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্যও মারাত্মক হুমকি হয়ে উঠতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত