প্রকাশ: ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ফিলিস্তিনি রাজনীতিতে বহু প্রতীক্ষিত ও ঐতিহাসিক এক অধ্যায়ের সূচনার ঘোষণা দিয়েছেন ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস। আগামী ১ নভেম্বর প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন (পিএলও)-এর সংসদ প্যালেস্টিনিয়ান ন্যাশনাল কাউন্সিল (পিএনসি)-এর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। ফিলিস্তিনের সরকারি বার্তা সংস্থা ওয়াফার বরাতে বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, এই নির্বাচনের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো পিএনসি সদস্যরা সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হবেন। এতদিন এই পরিষদের সদস্যরা পারস্পরিক সমঝোতা ও রাজনৈতিক সমীকরণের ভিত্তিতে মনোনীত হয়ে আসছিলেন।
এই ঘোষণাকে ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রতিনিধিত্বমূলক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অভাব নিয়ে যে সমালোচনা ছিল, এই নির্বাচন তার জবাব দিতে পারে বলে মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক। প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস এক ডিক্রিতে বলেন, ফিলিস্তিনের ভেতরে এবং দেশের বাইরে বসবাসরত সব ফিলিস্তিনি নাগরিক যেন এই নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন, সে জন্য দেশ-বিদেশে ভোটগ্রহণের ব্যবস্থা করা হবে। পিএলও ও ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ—উভয় প্রতিষ্ঠানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি এই সিদ্ধান্তের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেন।
প্যালেস্টিনিয়ান ন্যাশনাল কাউন্সিল দীর্ঘদিন ধরে পিএলও-এর সংসদীয় কাঠামো হিসেবে কাজ করে আসছে। এই পরিষদই ফিলিস্তিনি জনগণের জাতীয় আকাঙ্ক্ষা, রাজনৈতিক কৌশল ও আন্তর্জাতিক অবস্থান নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই পরিষদের কার্যকারিতা ও প্রতিনিধিত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সরাসরি ভোটের মাধ্যমে সদস্য নির্বাচন না হওয়ায় অনেক ফিলিস্তিনি নাগরিকের মধ্যেই এটি এক ধরনের দূরত্ব তৈরি করেছিল। নতুন ঘোষিত নির্বাচনের মাধ্যমে সেই দূরত্ব কমানোর একটি প্রচেষ্টা হিসেবে বিষয়টি দেখা হচ্ছে।
পিএলও-এর ইতিহাস ফিলিস্তিনি জাতিসত্তার সংগ্রামের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ১৯৬০-এর দশকে ইয়াসির আরাফাত ও তাঁর সহযোদ্ধারা পিএলও সহ-প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ফিলিস্তিনিদের প্রধান প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন হিসেবে স্বীকৃতি পায়। আরাফাতের নেতৃত্বে পিএলও ফিলিস্তিনি স্বাধীনতার আন্দোলনে একটি কেন্দ্রীয় শক্তিতে পরিণত হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংগঠনটির ভেতরে বিভিন্ন রাজনৈতিক ধারা ও মতাদর্শের সমন্বয় ঘটলেও মূল নেতৃত্বে ফাতাহ আন্দোলনের প্রভাব দীর্ঘদিন ধরেই প্রবল।
বর্তমানে পিএলও ও এর সংসদীয় কাঠামো মূলত প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের নেতৃত্বাধীন ফাতাহ আন্দোলনের প্রভাবাধীন। সমালোচকেরা দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন, এই কাঠামো বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং তরুণ প্রজন্ম ও প্রবাসী ফিলিস্তিনিদের কণ্ঠ এতে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয় না। নতুন নির্বাচন সেই অভিযোগের জবাব দিতে পারে কি না, তা নিয়ে এখন আলোচনা শুরু হয়েছে।
তবে এই ঘোষণার পাশাপাশি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও সামনে এসেছে। উল্লেখযোগ্যভাবে, হামাস ও ফিলিস্তিনি ইসলামিক জিহাদ (পিআইজে) বর্তমানে পিএলও-এর সদস্য নয়। ফলে পিএলও-এর নীতিনির্ধারণী কোনো সংস্থায় এই দুই সংগঠনের প্রতিনিধিত্ব নেই। গাজা উপত্যকায় কার্যত নিয়ন্ত্রণকারী শক্তি হামাস দীর্ঘদিন ধরে পিএলও-এর বাইরে অবস্থান করছে, যা ফিলিস্তিনি রাজনীতিকে বিভক্ত করে রেখেছে। এই বিভক্ত বাস্তবতায় পিএনসি নির্বাচন কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা।
বিশ্লেষকদের মতে, সরাসরি ভোটের মাধ্যমে পিএনসি সদস্য নির্বাচন পিএলও-এর বৈধতা ও গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে পারে। বিশেষ করে প্রবাসী ফিলিস্তিনিদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা হলে এটি একটি বড় অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন মনে করে আসছিল। এই নির্বাচন তাদের অংশগ্রহণের একটি নতুন সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।
একই সঙ্গে বাস্তব চ্যালেঞ্জও কম নয়। ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের রাজনৈতিক বিভাজন, ইসরায়েলি দখলদারত্ব, চলমান সংঘাত ও নিরাপত্তাজনিত পরিস্থিতি নির্বাচন আয়োজনকে জটিল করে তুলতে পারে। পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে ভোটগ্রহণ কীভাবে পরিচালিত হবে, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। অতীতে ফিলিস্তিনি নির্বাচনগুলোতে এসব ইস্যু বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আন্তর্জাতিক মহল এই ঘোষণাকে সতর্ক আশাবাদ নিয়ে দেখছে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, একটি স্বচ্ছ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন ফিলিস্তিনি নেতৃত্বকে নতুন করে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ে সহায়ক হতে পারে। একই সঙ্গে এটি ফিলিস্তিনি জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার পথে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবেও বিবেচিত হবে।
ফিলিস্তিনি সমাজের ভেতরেও এই ঘোষণা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। কেউ কেউ এটিকে দীর্ঘদিনের স্থবির রাজনৈতিক ব্যবস্থায় প্রাণ ফেরানোর সুযোগ হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ কেউ সন্দেহ প্রকাশ করছেন যে, বাস্তবে ক্ষমতার ভারসাম্যে কতটা পরিবর্তন আসবে। বিশেষ করে হামাস ও পিএলও-এর মধ্যকার বিভাজন অটুট থাকলে এই নির্বাচন ফিলিস্তিনি ঐক্যে কতটা ভূমিকা রাখবে, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে।
তবু সব সংশয় ও চ্যালেঞ্জের মাঝেও আগামী ১ নভেম্বরের ঘোষিত পিএনসি নির্বাচন ফিলিস্তিনি রাজনীতিতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে। সরাসরি ভোটের মাধ্যমে প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হলে পিএলও-এর সংসদীয় কাঠামো আরও শক্তিশালী ও জনসম্পৃক্ত হয়ে উঠতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে দখলদারত্ব, সংঘাত ও রাজনৈতিক বিভাজনের মধ্যে থাকা ফিলিস্তিনি জনগণের জন্য এই নির্বাচন অন্তত একটি আশার বার্তা বহন করছে।