প্রকাশ: ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
পবিত্র শবে বরাতের ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও নিরাপদ পরিবেশ বজায় রাখতে ঢাকা মহানগর এলাকায় ১২ ঘণ্টার জন্য একাধিক কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। সব ধরনের আতশবাজি ও পটকা ফাটানো, ফানুস ওড়ানো, গ্যাস বেলুন উড়ানোসহ বিস্ফোরক দ্রব্যের ক্রয়-বিক্রয়, পরিবহন ও ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) ডিএমপি কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলীর স্বাক্ষরিত এক গণবিজ্ঞপ্তিতে এই সিদ্ধান্ত জানানো হয়।
ডিএমপি জানায়, মঙ্গলবার ১৪ শাবান ১৪৪৭ হিজরি দিবাগত রাতে সারা দেশে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে পবিত্র শবে বরাত পালিত হবে। মুসলমানদের কাছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এই রজনীতে যাতে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা, শব্দদূষণ বা অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা না ঘটে এবং ধর্মপ্রাণ মানুষ নির্বিঘ্নে ইবাদত-বন্দেগিতে মগ্ন থাকতে পারেন, সে লক্ষ্যেই এই নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ অর্ডিন্যান্সের ২৮ ধারায় অর্পিত ক্ষমতাবলে ৩ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা ৬টা থেকে ৪ ফেব্রুয়ারি সকাল ৬টা পর্যন্ত এই বিধিনিষেধ কার্যকর থাকবে।
ডিএমপির গণবিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, নিষেধাজ্ঞার আওতায় ঢাকা মহানগর এলাকায় সব ধরনের আতশবাজি, পটকা ও ফানুস ওড়ানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। একই সঙ্গে যেকোনো ধরনের বিস্ফোরক দ্রব্যের ক্রয়-বিক্রয়, পরিবহন ও ব্যবহারও আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। নির্দেশনা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও সতর্ক করেছে পুলিশ।
প্রতি বছর শবে বরাতকে কেন্দ্র করে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় আতশবাজি ও পটকা ফাটানোর প্রবণতা দেখা যায়, যা একদিকে যেমন ধর্মীয় পরিবেশের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, অন্যদিকে তেমনি শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষের জন্য ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। শব্দদূষণের পাশাপাশি এসব কার্যক্রম থেকে অগ্নিকাণ্ড ও দুর্ঘটনার ঝুঁকিও তৈরি হয়। এ কারণে গত কয়েক বছর ধরেই ডিএমপি শবে বরাত, শবে কদরসহ গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় রাতে এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা জারি করে আসছে।
ডিএমপি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই নিষেধাজ্ঞা শুধু আইন প্রয়োগের অংশ নয়, বরং সামাজিক দায়িত্ববোধ জাগ্রত করার একটি উদ্যোগ। শবে বরাত মুসলমানদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা, আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের রাত। এ রাতে মসজিদ, ঘর ও কবরস্থানে ইবাদতে মগ্ন থাকেন ধর্মপ্রাণ মানুষ। এমন একটি পবিত্র সময়ে আতশবাজি বা পটকা ফাটিয়ে হৈচৈ করা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার পাশাপাশি জননিরাপত্তার জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ।
গণবিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, শবে বরাত উপলক্ষে রাজধানীর বিভিন্ন মসজিদ, ধর্মীয় স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহল বাড়ানো হবে এবং সন্দেহজনক কার্যকলাপের ওপর নজরদারি রাখা হবে। কোনো এলাকায় নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের খবর পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট থানা ও ইউনিটগুলোকে।
নগরবাসীর একাংশ এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাদের মতে, শবে বরাতের মতো ধর্মীয় রাতে আতশবাজি ও পটকার ব্যবহার সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় এবং অনেক সময় ভয় ও আতঙ্কের সৃষ্টি করে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের জন্য এসব শব্দ অত্যন্ত কষ্টদায়ক। আবার হাসপাতাল, ক্লিনিক ও আবাসিক এলাকায় শব্দদূষণের কারণে রোগীদের ভোগান্তিও বাড়ে। তাই ডিএমপির এই সিদ্ধান্ত সময়োপযোগী ও জনস্বার্থে নেওয়া হয়েছে বলে মনে করছেন তারা।
তবে কিছু তরুণের মধ্যে প্রতিবছরই এই নিষেধাজ্ঞা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ কেউ প্রশ্ন তোলেন, কেন ধর্মীয় উৎসবে আনন্দ প্রকাশের সুযোগ সীমিত করা হচ্ছে। এ বিষয়ে ডিএমপি কর্মকর্তারা বলছেন, আনন্দ প্রকাশের নামে যদি অন্যের নিরাপত্তা ও শান্তি বিঘ্নিত হয়, তবে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। ধর্মীয় উৎসবের মূল চেতনা হলো শান্তি, সংযম ও আত্মশুদ্ধি—শোরগোল নয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নগরজীবনে ধর্মীয় সহনশীলতা ও পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখতে এ ধরনের প্রশাসনিক পদক্ষেপ প্রয়োজন। ঢাকা একটি ঘনবসতিপূর্ণ মহানগর, যেখানে সামান্য অসতর্কতাও বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। আতশবাজি ও পটকার মতো দাহ্য সামগ্রী ব্যবহারে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি থাকে, যা সংকীর্ণ গলি ও বহুতল ভবনঘেরা এলাকায় মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
ডিএমপি আরও জানিয়েছে, নিষেধাজ্ঞার সময় কেউ যদি বিস্ফোরক দ্রব্য বিক্রি বা পরিবহনের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ধরা পড়ে, তাহলে তার বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী মামলা দায়ের করা হবে। পাশাপাশি অবৈধভাবে মজুত করা পটকা বা আতশবাজি উদ্ধার করে তা জব্দ করা হবে। পুলিশ জনগণকে অনুরোধ করেছে, কোথাও নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের ঘটনা চোখে পড়লে নিকটস্থ থানায় বা জরুরি নম্বরে জানানোর জন্য।
শবে বরাত উপলক্ষে রাজধানীর মসজিদগুলোতে বিশেষ দোয়া ও ইবাদতের আয়োজন করা হয়েছে। অনেক এলাকায় ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা কবরস্থানে গিয়ে মৃত স্বজনদের জন্য দোয়া করেন। এই পবিত্র রজনীতে যেন ধর্মীয় আচার-অনুশীলন নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করা যায়, সে জন্যই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থাকবে বলে জানিয়েছে ডিএমপি।
সব মিলিয়ে, শবে বরাতকে কেন্দ্র করে ১২ ঘণ্টার এই নিষেধাজ্ঞা শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, ধর্মীয় সহনশীলতা ও নগরনিরাপত্তা নিশ্চিত করার একটি প্রয়াস। এখন নগরবাসীর দায়িত্ব হলো আইন মেনে চলা এবং এই পবিত্র রাতের মর্যাদা রক্ষা করা।