হার্ভার্ডের বিরুদ্ধে ১ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ চাইলো ট্রাম্প প্রশাসন

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৩ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৩৩ বার
হার্ভার্ডের বিরুদ্ধে ট্রাম্প ক্ষতিপূরণ দাবি

প্রকাশ: ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চশিক্ষা অঙ্গন ও রাজনীতিতে নতুন করে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে সাবেক ও বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত ১ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতিপূরণ দাবি। বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী ও মর্যাদাপূর্ণ এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এমন নজিরবিহীন আর্থিক দাবি মার্কিন রাজনীতিতে যেমন আলোড়ন তুলেছে, তেমনি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের অধিকার এবং প্রশাসনিক চাপের প্রশ্নকেও সামনে এনে দিয়েছে।

নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে চলমান সমঝোতা আলোচনার সময় প্রতিষ্ঠানটি কিছু শর্তে ছাড় আদায় করার চেষ্টা করছে—এমন খবর প্রকাশ্যে আসার পরই সোমবার এই কঠোর অবস্থান নেন ট্রাম্প। তিনি নিজ মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে স্পষ্ট ভাষায় জানান, হার্ভার্ডের বিরুদ্ধে তাঁর প্রশাসন এখন এক বিলিয়ন ডলারের ক্ষতিপূরণ দাবি করবে এবং ভবিষ্যতে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে আর কোনো ধরনের সম্পর্ক রাখতে চায় না।

ট্রাম্প তাঁর পোস্টে লেখেন, “আমরা এখন এক বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দাবি করছি। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে আমাদের আর কোনো সম্পর্ক থাকবে না।” তাঁর এই মন্তব্যের পরপরই হোয়াইট হাউস ও বিচার বিভাগের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো বিষয়টি নিশ্চিত করে জানায়, হার্ভার্ডসহ একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে প্রশাসন আইনি ও আর্থিক চাপ বাড়ানোর কৌশল নিয়েছে।

প্রশাসনের কর্মকর্তাদের অভিযোগ, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় তথাকথিত ‘ওক’ বা অতিরিক্ত উদারপন্থী মতাদর্শ প্রচার করছে এবং সাম্প্রতিক সময়ে ফিলিস্তিনপন্থী বিক্ষোভ চলাকালে ইহুদি শিক্ষার্থীদের যথাযথ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতেই ট্রাম্প প্রশাসন বিশ্ববিদ্যালয়টির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা এবং বিপুল অঙ্কের অর্থদণ্ড দাবি করছে বলে জানানো হয়েছে।

তবে সমালোচকদের মতে, এই পদক্ষেপ মূলত যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় উদারপন্থী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির একটি কৌশল। তারা বলছেন, মতাদর্শিক পার্থক্য ও রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে ট্রাম্প প্রশাসন একাডেমিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করতে চাইছে। বিশেষ করে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ইস্যুতে ক্যাম্পাসে হওয়া আন্দোলন ও বিতর্ককে কেন্দ্র করে এই চাপ আরও বেড়েছে।

এর আগে ট্রাম্প প্রশাসনের চাপের মুখে কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটি ২০০ মিলিয়ন ডলার দিতে সম্মত হয়েছিল এবং ভর্তিতে জাতিগত পরিচয় বিবেচনা না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সেই ঘটনার পর থেকেই আশঙ্কা তৈরি হয়, অন্য আইভি লিগ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকেও একই ধরনের সমঝোতায় বাধ্য করার চেষ্টা করা হতে পারে।

ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী, শুরুতে হার্ভার্ডের কাছ থেকে ২০০ মিলিয়ন ডলারের একটি সমঝোতা অর্থ দাবি করা হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘ আলোচনার পর প্রশাসন সেই অবস্থান থেকে সরে এসে সরাসরি ১ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতিপূরণ দাবিতে অনড় থাকে। ট্রাম্প বলেন, হার্ভার্ড একটি “জটিল কর্মসংস্থান প্রশিক্ষণ পরিকল্পনা” প্রস্তাব করেছিল, যা তাঁর প্রশাসনের কাছে মোটেও গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি। তাঁর মতে, এই পরিকল্পনা ছিল অস্পষ্ট, অকার্যকর এবং বাস্তবে সফল হওয়ার সম্ভাবনাও খুব কম।

ট্রাম্প আরও দাবি করেন, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় ৫০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি নগদ অর্থের সমঝোতা এড়ানোর জন্য নানা কৌশল অবলম্বন করেছে। তিনি এই আচরণকে “গুরুতর ও নিকৃষ্ট অবৈধ কাজ” বলে অভিহিত করেন এবং বলেন, এসব কাজের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়টির বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। তবে ঠিক কোন আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে এই ক্ষতিপূরণ দাবি করা হচ্ছে, সে বিষয়ে তিনি কোনো নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দেননি, যা নিয়ে আইনজ্ঞ ও বিশ্লেষকদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে।

আইনি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান ও প্রচলিত আইনের আলোকে একটি স্বশাসিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এমন বিশাল অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দাবি আদালতে টিকবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। বিশেষ করে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, একাডেমিক স্বাধীনতা ও ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক সক্রিয়তার প্রশ্নে এই মামলা নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারে।

এই ঘটনাপ্রবাহে অতীতের আরেকটি সিদ্ধান্তও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। আইভি লিগভুক্ত ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়া গত বছর ট্রাম্প প্রশাসনের প্রবল চাপের মুখে নারী ক্রীড়ায় ট্রান্সজেন্ডার নারীদের অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। সে সময় অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, প্রশাসনের এই চাপ ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত আকার ধারণ করতে পারে। হার্ভার্ডের বিরুদ্ধে বর্তমান ক্ষতিপূরণ দাবি সেই আশঙ্কাকেই বাস্তব রূপ দিয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে।

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ট্রাম্পের এই ঘোষণার বিস্তারিত জবাব দেয়নি। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো জানিয়েছে, তারা বিষয়টি গভীরভাবে পর্যালোচনা করছে এবং প্রয়োজনে আইনি লড়াইয়ে যেতে প্রস্তুত। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের মতে, ক্যাম্পাসে সব শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা নীতিগতভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং কোনো ধরনের বৈষম্য বা সহিংসতাকে প্রশ্রয় দেওয়া হয় না।

বিশ্লেষকদের মতে, হার্ভার্ডের বিরুদ্ধে এই ক্ষতিপূরণ দাবি কেবল একটি আর্থিক বা আইনি বিষয় নয়, বরং এটি যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা, রাজনীতি ও মতাদর্শিক দ্বন্দ্বের প্রতিফলন। একদিকে রয়েছে প্রশাসনের কঠোর অবস্থান, অন্যদিকে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অধিকার রক্ষার প্রশ্ন।

সব মিলিয়ে, হার্ভার্ডের বিরুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের ১ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতিপূরণ দাবি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও একাডেমিক অঙ্গনে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। এই দাবি শেষ পর্যন্ত আদালত পর্যন্ত গড়াবে কি না, নাকি আবার কোনো সমঝোতার পথে হাঁটবে—সেদিকেই এখন সবার দৃষ্টি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত