প্রকাশ: ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
গাজীপুরে ২০১৬ সালে আলোচিত ‘জঙ্গি নাটক’ সাজিয়ে সাত যুবককে হত্যার অভিযোগে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক সাবেক কর্মকর্তাসহ মোট ১০ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ বা ফরমাল চার্জ দাখিল করা হয়েছে। অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক আইজিপি একেএম শহিদুল ইসলাম, সাবেক আইজিপি জাবেদ পাটওয়ারী এবং বহুল আলোচিত সাবেক ডিবি প্রধান হারুন অর রশিদ। এই মামলাকে ঘিরে আবারও নতুন করে আলোচনায় এসেছে বিচারবহির্ভূত হত্যা, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো গুরুতর ইস্যুগুলো।
মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে এই ফরমাল চার্জ দাখিল করা হয়। প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামীম বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, দীর্ঘ অনুসন্ধান ও প্রাথমিক তদন্ত শেষে অভিযোগপত্রটি আনুষ্ঠানিকভাবে জমা দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ গৃহীত হওয়ার মাধ্যমে এই মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে এক নতুন ধাপে প্রবেশ করল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালে গাজীপুরে একটি পরিকল্পিত অপারেশনের মাধ্যমে সাতজন তরুণকে জঙ্গি আখ্যা দিয়ে হত্যা করা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, এই অপারেশনটি প্রকৃত কোনো জঙ্গি দমন অভিযানের অংশ ছিল না; বরং সাজানো নাটকের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। নিহতদের পরিবারের দাবি, তাদের স্বজনদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তুলে নিয়ে গিয়ে পরে ‘বন্দুকযুদ্ধ’ বা ‘ক্রসফায়ার’-এর নামে হত্যা করা হয়।
এই ঘটনায় যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে, তারা সবাই সে সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করছিলেন। অভিযুক্তদের মধ্যে সাবেক ডিএমপি কমিশনার আসাদুজ্জামান মিয়া এবং সাবেক কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলামও রয়েছেন। ফলে এই মামলাটি শুধু একটি নির্দিষ্ট ঘটনার বিচার নয়, বরং পুরো একটি সময়কালের নিরাপত্তা নীতির জবাবদিহিতার প্রশ্নকেও সামনে এনে দিয়েছে।
প্রসিকিউশন সূত্রে জানা গেছে, অভিযোগপত্রে মানবতাবিরোধী অপরাধ, বেআইনি আটক, নির্যাতন এবং পরিকল্পিত হত্যার মতো গুরুতর অভিযোগ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এই অভিযোগ দাখিলের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে প্রথমবারের মতো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ আনুষ্ঠানিকভাবে বিচারাধীন হলো—যা বাংলাদেশের বিচার ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এই মামলার পেছনের প্রেক্ষাপট দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত। ২০১০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে দেশে জঙ্গিবিরোধী অভিযানের নামে একাধিক বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটে। সে সময় সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এসব অভিযানকে সন্ত্রাস দমনের সাফল্য হিসেবে তুলে ধরলেও মানবাধিকার সংগঠনগুলো ধারাবাহিকভাবে অভিযোগ করে আসছিল যে, অনেক ক্ষেত্রেই এগুলো ছিল বিচারবহির্ভূত হত্যা। গাজীপুরের এই সাত যুবকের মৃত্যুর ঘটনাটি তখনই প্রশ্নবিদ্ধ হয় এবং নিহতদের পরিবার ও স্বজনরা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়ে আসছিলেন।
নিহতদের পরিবারগুলো বলছে, বছরের পর বছর তারা বিচারহীনতার ভার বয়ে বেড়িয়েছে। অনেকেই অভিযোগ করেন, ক্ষমতাসীনদের প্রভাব ও ভয়ভীতি কারণে তারা এতদিন মুখ খুলতে পারেননি। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং আন্তর্জাতিক মহলের চাপের পরিপ্রেক্ষিতে অবশেষে এই মামলাটি আনুষ্ঠানিকভাবে বিচারের মুখোমুখি হলো বলে মনে করছেন তারা।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ফরমাল চার্জ দাখিলের ঘটনা বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। একজন সাবেক আইজিপি কিংবা ডিবি প্রধানের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দাখিল হওয়া মানে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগকে আর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। তারা বলছেন, এই বিচার যদি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন হয়, তাহলে তা ভবিষ্যতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখবে।
অন্যদিকে, অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া আসেনি। তবে তাদের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো দাবি করছে, তারা এই অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে করছেন এবং আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে নিজেদের নির্দোষ প্রমাণ করবেন। আদালতের প্রক্রিয়ায় সব তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করা হলে সত্য উদঘাটিত হবে বলেও তাদের আশাবাদ।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই ঘটনাকে স্বাগত জানিয়েছে। তারা বলছে, দীর্ঘদিন ধরে যে অভিযোগগুলো আন্তর্জাতিক পরিসরে উঠছিল—বিশেষ করে বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুমের বিষয়গুলো—এই মামলার মাধ্যমে সেগুলোর বিচারিক স্বীকৃতি মিলছে। অনেক সংগঠন মনে করছে, এই বিচার প্রক্রিয়া সফল হলে ভবিষ্যতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে মানবাধিকার মানদণ্ড মেনে চলার চাপ আরও বাড়বে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই মামলার প্রভাব শুধু আইন ও মানবাধিকার ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; এর রাজনৈতিক প্রভাবও সুদূরপ্রসারী হতে পারে। কারণ অভিযুক্তদের অনেকেই দীর্ঘদিন ক্ষমতাসীন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা কাঠামোর অংশ ছিলেন। ফলে এই বিচার প্রক্রিয়া অতীত শাসনামলের নীতিনির্ধারণ ও নিরাপত্তা কৌশল নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলতে পারে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সূত্রে জানা গেছে, অভিযোগ গ্রহণের পর পরবর্তী ধাপে আসামিদের হাজিরা, চার্জ গঠন এবং সাক্ষ্যগ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হবে। এই বিচার দীর্ঘ হতে পারে, তবে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, এটি একটি স্বচ্ছ ও দৃষ্টান্তমূলক রায়ে পরিণত হবে।
সব মিলিয়ে, গাজীপুরে ২০১৬ সালের সাত যুবক হত্যার ঘটনায় সাবেক ডিবি প্রধান হারুন অর রশিদসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে ফরমাল চার্জ দাখিল বাংলাদেশের বিচার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এটি শুধু অতীতের একটি ঘটনার বিচার নয়, বরং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সীমা, মানবাধিকারের মূল্য এবং আইনের শাসনের প্রশ্নে একটি বড় পরীক্ষা হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।