অতিরিক্ত সারের দামে দিশেহারা কৃষক, সিন্ডিকেট ভাঙার দাবি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৩ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৫৪ বার
অতিরিক্ত সারের দামে দিশেহারা কৃষক, সিন্ডিকেট ভাঙার দাবি

প্রকাশ: ৩ ফেব্রুয়ারি  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের কৃষি উৎপাদনের মূল ভিত্তি হলো সময়মতো ও ন্যায্যমূল্যে সার সরবরাহ। কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। চলতি মৌসুমে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে প্রতি কেজি সারে ২ থেকে ৩ টাকা বেশি গুনতে হচ্ছে কৃষকদের। এই অতিরিক্ত দামের চাপ সামলাতে না পেরে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন মাঠপর্যায়ের চাষিরা। তাদের অভিযোগ, সারের বাজার নিয়ন্ত্রণে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট সক্রিয়, যার কারণে সরকারি ভর্তুকির সুফল কৃষকের হাতে পৌঁছাচ্ছে না।

একজন কৃষক ফসল ফলানোর জন্য প্রথমে বীজ বা চারা সংগ্রহ করেন, এরপর সেচ, শ্রমিক ও সারের খরচ বহন করেন। কিন্তু সব উপকরণের মধ্যে সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তার জায়গা হয়ে উঠেছে সার। অনেক কৃষকই অভিযোগ করছেন, ইউনিয়ন পর্যায়ের ডিলারের কাছে গেলেও নির্ধারিত দামে সার পাওয়া যাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে খুচরা দোকান থেকে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে, যেখানে কোনো রসিদও দেওয়া হয় না।

কুমিল্লার কৃষক দেলোয়ার হোসেন বলেন, একদিকে সারের দাম বেশি, অন্যদিকে সরবরাহও ঠিকমতো নেই। ডিলারদের কাছে গেলে বলা হয় সার নেই, অথচ খুচরা দোকানে গেলে ঠিকই পাওয়া যায়, তবে বেশি দামে। এতে বোঝা যায়, কোথাও না কোথাও কারসাজি হচ্ছে। তার মতে, কারা প্রকৃত কৃষক এবং কারা সুযোগ নিচ্ছে—এই বিষয়টি সরকারকে কঠোরভাবে মনিটর করতে হবে।

সরকার নির্ধারিত দাম অনুযায়ী টিএসপি সারের কেজি ২৭ টাকা, এমওপি ২০ টাকা এবং ডিএপি ২১ টাকা। কিন্তু বাস্তবে কৃষকদের কিনতে হচ্ছে ২ থেকে ৩ টাকা বেশি দামে। এক কেজিতে এই পার্থক্য খুব বড় মনে না হলেও, এক মৌসুমে কয়েকশ কেজি সার ব্যবহারের ক্ষেত্রে এই বাড়তি খরচ কৃষকের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।

কৃষকদের অভিযোগ, অনেক ডিলার ইচ্ছাকৃতভাবে সার মজুত করে রাখছেন। পরে মৌসুমের চাহিদা বাড়লে তা বেশি দামে বাজারে ছাড়ছেন। ফলে সরকারি ভর্তুকি থাকা সত্ত্বেও কৃষকের উৎপাদন খরচ কমছে না। বরং সার, বীজ, ডিজেল ও শ্রমিকের দাম একসঙ্গে বাড়ায় কৃষকের লাভের জায়গা সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে সারের মোট চাহিদা ধরা হয়েছে প্রায় ৬৯ লাখ টন। এর মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ সার আমদানির ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে রবি মৌসুমে, অর্থাৎ নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত সারের চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে। এই সময়েই বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হলে তার প্রভাব পড়ে পুরো খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থায়।

সরকার প্রতিবছর বিপুল অঙ্কের ভর্তুকি দিয়ে সার আমদানি ও বিতরণ করে। তবু মাঠপর্যায়ে সংকট থাকায় প্রশ্ন উঠছে, এই ভর্তুকির সুফল কারা পাচ্ছে। কৃষকদের মতে, ডিলার ও পরিবহন পর্যায়ে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেটই এর প্রধান কারণ।

তবে ডিলাররা এসব অভিযোগ অস্বীকার করছেন। সারের ডিলার মোহাম্মদ হোসেন বলেন, সরকার যে কমিশন দেয়, তা দিয়ে পরিবহন খরচ ও ক্ষতিগ্রস্ত সারের ব্যয় মেটানো কঠিন। অনেক সময় আমাদের লোকসান গুনতে হয়। তার দাবি, মূলত খুচরা ব্যবসায়ীরাই বেশি দামে সার বিক্রি করে পরিস্থিতি ঘোলাটে করছে।

অর্থনীতিবিদরা বিষয়টিকে আরও গভীরভাবে দেখছেন। তাদের মতে, সারের দাম নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে এর সরাসরি প্রভাব পড়বে উৎপাদন খরচে, যা শেষ পর্যন্ত খাদ্যপণ্যের দাম বাড়াবে। এতে মূল্যস্ফীতি আরও তীব্র হতে পারে। কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, সরবরাহ ব্যবস্থায় সামান্য ঘাটতি দেখা দিলেই তৃণমূল পর্যায়ে দাম বেড়ে যায়। তাই মাদার ভেসেল থেকে শুরু করে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে কঠোর নজরদারি জরুরি।

তিনি আরও বলেন, যদি পরিবহন সিন্ডিকেট বা ডিলাররা ইচ্ছাকৃতভাবে সার খালাসে বিলম্ব করে, তাহলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে হবে। নচেৎ কাগজে-কলমে দাম নিয়ন্ত্রণ থাকলেও বাস্তবে কৃষক উপকৃত হবে না।

এদিকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর জানিয়েছে, সারের দাম নিয়ন্ত্রণ এবং অবৈধ মজুতদারি ঠেকাতে তারা একাধিক উদ্যোগ নিচ্ছে। বিসিআইসি ও বিএডিসির পৃথক ডিলার নীতিমালাকে একীভূত করে একটি সমন্বিত নীতিমালা তৈরির কাজ চলছে। এর মাধ্যমে ডিলার ছাড়া খুচরা পর্যায়ে সার বিক্রি বন্ধ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের মহাপরিচালক এস এম সোহরাব উদ্দিন জানান, প্রতিটি ইউনিয়নের তিনটি ওয়ার্ডে তিনজন করে অনুমোদিত ডিলার থাকবে। এতে কৃষকদের আর খুচরা দোকানে গিয়ে বেশি দামে সার কিনতে হবে না। পাশাপাশি ডিজিটাল মনিটরিংয়ের মাধ্যমে কে কোথায় কত সার পাচ্ছে, তা নজরদারিতে আনা হবে।

তবে মাঠপর্যায়ের কৃষকদের আশঙ্কা, কেবল নীতিমালা করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। অবৈধ মজুতদার ও অসাধু সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে পরিস্থিতির পরিবর্তন আসবে না। তাদের দাবি, চাহিদা অনুযায়ী জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বিশেষ সার বরাদ্দ দিতে হবে এবং কৃষক কার্ডের মাধ্যমে সরাসরি কৃষকের হাতে সার পৌঁছে দিতে হবে।

একদিকে পর্যাপ্ত বরাদ্দের সীমাবদ্ধতা, অন্যদিকে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য—এই দুই সংকট মিলিয়ে সারের বাজারে অস্থিরতা বাড়ছে। কৃষকরা মনে করছেন, আগামী সরকার যদি সত্যিকার অর্থে কৃষিবান্ধব হতে চায়, তাহলে সারের বাজারকে সিন্ডিকেটমুক্ত করাই হবে প্রথম ও সবচেয়ে জরুরি পদক্ষেপ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত