অসংক্রামক রোগে নীরব মহামারি, বাড়ছে মৃত্যু ও ব্যয়

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৩ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৪৬ বার
অসংক্রামক রোগে নীরব মহামারি, বাড়ছে মৃত্যু ও ব্যয়

প্রকাশ: ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশেও নীরবে কিন্তু ভয়ংকরভাবে বাড়ছে অসংক্রামক রোগের প্রকোপ। হৃদ্‌রোগ, ডায়াবেটিস, ক্যান্সার ও দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসযন্ত্রের রোগ এখন আর শুধু শহরকেন্দ্রিক নয়, গ্রামাঞ্চলেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা একে ‘নীরব মহামারি’ হিসেবে আখ্যায়িত করছেন। কারণ এই রোগগুলো একদিকে যেমন দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা নির্ভর, অন্যদিকে সচেতনতার অভাব ও আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেরিতে শনাক্ত হচ্ছে।

বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি প্রায় সব হাসপাতালেই এসব রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকার বড় হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিনই বাড়ছে রোগীর চাপ। ঢাকার বাইরে মানসম্মত চিকিৎসাসেবা ও আধুনিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ সীমিত হওয়ায় দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে রোগীরা বাধ্য হয়ে রাজধানীমুখী হচ্ছেন। এতে একদিকে যেমন চিকিৎসা ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে রোগী ও স্বজনদের সময়, শ্রম ও মানসিক চাপও বহুগুণ বাড়ছে।

রোগীদের অনেকেই বলছেন, জেলা বা বিভাগীয় পর্যায়ে উন্নত চিকিৎসা থাকলে ঢাকায় আসার প্রয়োজন হতো না। ঢাকায় এসে বাসা ভাড়া, যাতায়াত ও চিকিৎসা খরচ মিলিয়ে অনেক পরিবার নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে। গ্রাম থেকে আসা রোগীদের জন্য এই ব্যয় আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে, কারণ নিয়মিত চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য তাদের অনেকেরই নেই।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর বিশ্বে ৩০ থেকে ৬৯ বছর বয়সী প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ মানুষ অসংক্রামক রোগে মারা যায়। এর মধ্যে প্রায় ৮৫ শতাংশ মৃত্যু ঘটে নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলোতে। বাংলাদেশও এই ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর তালিকায় রয়েছে। সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশই ঘটছে অসংক্রামক রোগের কারণে, যা দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য বড় সতর্কবার্তা।

চিকিৎসকদের মতে, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, অতিরিক্ত তেল-চর্বিযুক্ত খাবার, ধূমপান, অ্যালকোহল সেবন, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব এবং দূষিত পরিবেশ—এই সবকিছু মিলেই অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাত্রার কারণে মানুষের দৈনন্দিন চলাফেরা কমে গেছে। দীর্ঘ সময় মোবাইল, কম্পিউটার বা টেলিভিশনের সামনে বসে থাকার অভ্যাস শরীরকে ধীরে ধীরে অসুস্থ করে তুলছে।

জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক ড. জাহাঙ্গীর কবীর বলেন, বর্তমানে ক্যান্সার, হৃদ্‌রোগ, কিডনি রোগ ও ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। তার মতে, অনেক রোগী এমন অবস্থায় হাসপাতালে আসছেন, যখন চিকিৎসা অত্যন্ত জটিল ও ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে। যদি প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত করা যেত, তাহলে মৃত্যুঝুঁকি ও চিকিৎসা খরচ—দুটিই অনেক কমানো সম্ভব হতো।

অন্যদিকে টিবি হাসপাতালের পরিচালক ডা. আয়শা আক্তার বলেন, ব্যক্তি সচেতনতা ছাড়া এই ঝুঁকি কমানো কঠিন। তার ভাষায়, মানুষ এখন আগের মতো বাইরে বের হয় না, মাঠে খেলাধুলা করে না। অনলাইননির্ভর জীবনযাত্রার কারণে শারীরিক পরিশ্রম কমে গেছে। এর ফলেই ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদ্‌রোগের মতো সমস্যা বাড়ছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু চিকিৎসাভিত্তিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা দিয়ে এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার ওপর জোর দেওয়া। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক ব্যায়াম ও মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন—এই বিষয়গুলোকে জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্ব দিতে হবে।

বাংলাদেশ পাবলিক হেলথ ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক মোনায়েমুল ইসলাম সিজার বলেন, গত দুই থেকে আড়াই দশক ধরে সরকারগুলোর মূল মনোযোগ ছিল চিকিৎসা অবকাঠামো উন্নয়নের দিকে। যদিও তা প্রয়োজনীয়, কিন্তু এখন সময় এসেছে প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার। তার মতে, যদি সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করা যায় এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় অসংক্রামক রোগ শনাক্তের ব্যবস্থা করা হয়, তাহলে আগামী দুই দশকের মধ্যে এই রোগগুলোর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, গত এক বছরে বিশ্বে প্রায় চার কোটি ৩০ লাখ মানুষ অসংক্রামক রোগে মারা গেছে। এই বিপুল সংখ্যক মৃত্যু শুধু স্বাস্থ্য খাতেই নয়, অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামোর ওপরও গভীর প্রভাব ফেলছে। বাংলাদেশেও এসব রোগে আক্রান্ত পরিবারগুলো দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক সংকটে পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসা চালাতে গিয়ে পরিবারকে জমি-জমা বিক্রি বা ঋণগ্রস্ত হতে হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অসংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হলে এখনই সমন্বিত ও কার্যকর সরকারি পদক্ষেপ নিতে হবে। স্বাস্থ্যনীতি, নগর পরিকল্পনা, পরিবেশ সুরক্ষা ও শিক্ষা—সব ক্ষেত্রেই স্বাস্থ্যবান্ধব সিদ্ধান্ত জরুরি। না হলে এই নীরব মহামারি আগামী দিনে দেশের টেকসই উন্নয়নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত