প্রকাশ: ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দীর্ঘ আড়াই দশকের বেশি সময় ধরে টু-ডি অ্যানিমেশন জগতের অন্যতম পরিচিত ও বহুল ব্যবহৃত সফটওয়্যার ‘অ্যাডোবি অ্যানিমেট’ বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে বিশ্বখ্যাত সফটওয়্যার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান অ্যাডোবি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর অংশ হিসেবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে এই ঘোষণায় বিশ্বজুড়ে অ্যানিমেটর, ডিজাইনার এবং কনটেন্ট নির্মাতাদের মধ্যে ব্যাপক হতাশা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারি অ্যাডোবি তাদের অফিসিয়াল সাপোর্ট ওয়েবসাইটে হালনাগাদ এক বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে জানায়, ২০২৬ সালের ১ মার্চ থেকে অ্যাডোবি অ্যানিমেট আর ব্যবহারযোগ্য থাকবে না। একই সঙ্গে ব্যবহারকারীদের কাছে ইমেইলের মাধ্যমেও এই সিদ্ধান্ত জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, নির্ধারিত সময়ের পর সফটওয়্যারটির কোনো আপডেট, নিরাপত্তা প্যাচ কিংবা কারিগরি সহায়তা দেওয়া হবে না।
অ্যাডোবির এই ঘোষণায় সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্বাধীন অ্যানিমেটর ও ছোট স্টুডিওগুলো। কারণ টু-ডি অ্যানিমেশনের জন্য অ্যানিমেট দীর্ঘদিন ধরেই ছিল সহজ, তুলনামূলক কম খরচের এবং বহুমুখী একটি প্ল্যাটফর্ম। বিশেষ করে শিক্ষা, কার্টুন সিরিজ, ওয়েব কনটেন্ট এবং বিজ্ঞাপন খাতে এটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল।
তবে করপোরেট বা এন্টারপ্রাইজ গ্রাহকদের জন্য কিছুটা ছাড় রেখেছে অ্যাডোবি। বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, এন্টারপ্রাইজ ব্যবহারকারীরা ২০২৯ সালের ১ মার্চ পর্যন্ত সীমিত কারিগরি সহায়তা পাবেন। অন্যদিকে ব্যক্তিগত ও সাধারণ গ্রাহকদের জন্য এই সহায়তা থাকবে কেবল ২০২৭ সালের মার্চ পর্যন্ত। এরপর তাদের জন্যও সফটওয়্যারটির সব ধরনের সাপোর্ট পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে।
সিদ্ধান্ত ঘোষণার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়ার ঝড় ওঠে। বহু ব্যবহারকারী টুইটার, রেডিট ও বিভিন্ন ডিজাইন ফোরামে তাদের হতাশা প্রকাশ করেন। অনেকেই বলেন, অ্যাডোবি অ্যানিমেট শুধু একটি সফটওয়্যার নয়, বরং একটি প্রজন্মের অ্যানিমেটরদের শেখার ও সৃজনশীলতার মাধ্যম ছিল। কেউ কেউ অ্যাডোবির কাছে সফটওয়্যারটি ওপেন সোর্স করে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে কমিউনিটি চাইলে এর উন্নয়ন চালিয়ে যেতে পারে।
ব্যবহারকারীদের অভিযোগ, বাজারে এখনো অ্যাডোবি অ্যানিমেটের মতো পূর্ণাঙ্গ ও সহজ বিকল্প সফটওয়্যার নেই। বিশেষ করে যারা ফ্রেম-বাই-ফ্রেম অ্যানিমেশন, ইন্টারঅ্যাকটিভ কনটেন্ট কিংবা ওয়েব-ভিত্তিক অ্যানিমেশন তৈরি করতেন, তাদের জন্য বিকল্প খুঁজে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।
অ্যাডোবি তাদের এক প্রশ্নোত্তর পাতায় এই সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দিয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ২৫ বছরের বেশি সময় ধরে অ্যানিমেট অ্যানিমেশন জগতকে সমৃদ্ধ করেছে এবং অসংখ্য সৃজনশীল কাজের জন্ম দিয়েছে। তবে প্রযুক্তির ধারা দ্রুত বদলাচ্ছে। নতুন প্ল্যাটফর্ম, নতুন কাজের ধরণ এবং আধুনিক টুল ব্যবহারকারীদের বর্তমান চাহিদা আরও ভালোভাবে পূরণ করছে। এই বাস্তবতা মাথায় রেখেই অ্যানিমেটের সমর্থন বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, অ্যাডোবির বর্তমান কৌশল স্পষ্টভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক পণ্যের দিকে ঝুঁকছে। জেনারেটিভ এআই, অটোমেশন ও স্মার্ট ডিজাইন টুলে বিনিয়োগ বাড়াতে গিয়ে প্রতিষ্ঠানটি ধীরে ধীরে পুরোনো ও তুলনামূলক কম লাভজনক সফটওয়্যারগুলো থেকে সরে আসছে। সেই প্রেক্ষাপটে অ্যানিমেট আর অ্যাডোবির নতুন দিকনির্দেশনার সঙ্গে মানানসই নয় বলেই সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়েছে।
অবাক করার বিষয় হলো, অ্যানিমেটের সরাসরি পূর্ণ বিকল্প হিসেবে নির্দিষ্ট কোনো সফটওয়্যার অ্যাডোবি সুপারিশ করেনি। বরং তারা জানিয়েছে, ক্রিয়েটিভ ক্লাউড প্রো গ্রাহকেরা অন্য অ্যাডোবি অ্যাপ ব্যবহার করে অ্যানিমেটের কিছু কাজের বিকল্প সমাধান খুঁজে নিতে পারেন। উদাহরণ হিসেবে জটিল কী-ফ্রেম অ্যানিমেশনের জন্য আফটার ইফেক্টসের পাপেট টুল ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। আবার তুলনামূলক সহজ অ্যানিমেশন বা গ্রাফিক ইফেক্টের জন্য অ্যাডোবি এক্সপ্রেস ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
তবে অনেক ব্যবহারকারীর মতে, এসব টুল অ্যানিমেটের বিকল্প হতে পারে না। আফটার ইফেক্টস মূলত মোশন গ্রাফিক্স ও ভিজ্যুয়াল ইফেক্টের জন্য তৈরি, আর অ্যাডোবি এক্সপ্রেসের সক্ষমতাও সীমিত। ফলে টু-ডি অ্যানিমেশনের জন্য যেসব সুবিধা অ্যানিমেটে ছিল, তা অন্য সফটওয়্যারে পুরোপুরি পাওয়া কঠিন।
এর আগেও সফটওয়্যারটি বন্ধ হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছিল। গত বছরের অ্যাডোবি ম্যাক্স সম্মেলনে অ্যানিমেট নিয়ে উল্লেখযোগ্য কোনো ঘোষণা বা আলোচনা হয়নি। এমনকি ২০২৫ সংস্করণও প্রকাশ করা হয়নি, যা ব্যবহারকারীদের মধ্যে সন্দেহ তৈরি করেছিল। শেষ পর্যন্ত সেই আশঙ্কাই সত্যি হলো।
অ্যাডোবি জানিয়েছে, যেসব ব্যবহারকারীর কম্পিউটারে সফটওয়্যারটি ইতোমধ্যে ইনস্টল করা আছে, তারা আপাতত এটি ব্যবহার চালিয়ে যেতে পারবেন। তবে নতুন করে কোনো আপডেট বা নিরাপত্তা সহায়তা না থাকায় দীর্ঘমেয়াদে এর ব্যবহার ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। উল্লেখ্য, সফটওয়্যারটির মাসিক সাবস্ক্রিপশন মূল্য ছিল ৩৪ দশমিক ৪৯ ডলার। বার্ষিক চুক্তিতে এই খরচ কমে দাঁড়াত ২২ দশমিক ৯৯ ডলারে।
বিশ্বের পাশাপাশি বাংলাদেশেও অনেক অ্যানিমেটর, ফ্রিল্যান্সার ও ডিজিটাল কনটেন্ট নির্মাতা অ্যাডোবি অ্যানিমেট ব্যবহার করে আসছিলেন। তাদের অনেকেই এখন বিকল্প সফটওয়্যার খোঁজার চাপে পড়েছেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই সিদ্ধান্ত অ্যানিমেশন শিল্পে এক ধরনের শূন্যতা তৈরি করবে, যা পূরণ করতে সময় লাগবে।
সব মিলিয়ে অ্যাডোবি অ্যানিমেট বন্ধ হওয়ার ঘোষণা শুধু একটি সফটওয়্যার বিদায়ের খবর নয়; এটি টু-ডি অ্যানিমেশনের একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের সমাপ্তিরও ইঙ্গিত দিচ্ছে। প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ভবিষ্যৎ অ্যানিমেশন শিল্প কোন পথে এগোয়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।