৩০ পেরোলেই সতর্কতা: নারীর জন্য জরুরি ৭ স্বাস্থ্য পরীক্ষা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৩ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৩৩ বার
৩০ পেরোলেই সতর্কতা: নারীর জন্য জরুরি ৭ স্বাস্থ্য পরীক্ষা

প্রকাশ: ০৩ ফেব্রুয়ারি  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নারীর জীবনে ৩০ বছর একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। এই সময় থেকে শরীরে ধীরে ধীরে শুরু হয় নানামুখী শারীরিক ও হরমোনজনিত পরিবর্তন, যার প্রভাব পড়ে সামগ্রিক স্বাস্থ্যে। কর্মব্যস্ত জীবন, মানসিক চাপ, অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস ও পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব মিলিয়ে অনেক রোগ নীরবে বাসা বাঁধতে থাকে। অথচ শুরুতেই শনাক্ত করা গেলে এসব সমস্যার বড় অংশই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। সেজন্যই বিশেষজ্ঞরা ৩০ বছরের পর নারীদের জন্য নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষাকে অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করেন।

পরিসংখ্যান বলছে, নারীরা সাধারণত পুরুষদের তুলনায় বেশি দিন বেঁচে থাকলেও জীবনের দীর্ঘ সময় জুড়ে অস্টিওপোরোসিস, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, থাইরয়েড সমস্যা, ডিপ্রেশন ও অটোইমিউন রোগের মতো জটিলতায় ভোগেন। পাশাপাশি হৃদরোগ ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকিও এই বয়সে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে শুরু করে। এসব রোগের বেশিরভাগই প্রাথমিক পর্যায়ে উপসর্গহীন থাকে, ফলে নিয়মিত পরীক্ষা ছাড়া শনাক্ত করা কঠিন। এ কারণে বছরে অন্তত একবার পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্য পরীক্ষা নারীর সুস্থ জীবনের জন্য অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।

৩০ বছরের পর নারীদের ক্ষেত্রে প্রথম যে পরীক্ষাটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তা হলো রক্তচাপ পরীক্ষা। উচ্চ রক্তচাপকে অনেক সময় ‘নীরব ঘাতক’ বলা হয়, কারণ এটি দীর্ঘদিন কোনো লক্ষণ ছাড়াই শরীরের ক্ষতি করতে পারে। অতিরিক্ত মানসিক চাপ, অনিয়মিত ঘুম, স্থূলতা কিংবা অতিরিক্ত লবণ গ্রহণের কারণে রক্তচাপ বাড়তে পারে। স্বাভাবিক রক্তচাপ ১২০/৮০-এর মধ্যে থাকাই নিরাপদ। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে না থাকলে হৃদযন্ত্র, কিডনি ও রক্তনালির ক্ষতির পাশাপাশি স্ট্রোকের ঝুঁকিও বহুগুণ বেড়ে যায়। নিয়মিত হাঁটা, হালকা ব্যায়াম, যোগব্যায়াম এবং সুষম খাদ্যাভ্যাস রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

এরপর আসে লিপিড প্রোফাইল বা কোলেস্টেরল পরীক্ষা। আধুনিক জীবনযাপনে ভাজাপোড়া ও প্রক্রিয়াজাত খাবারের প্রবণতা বেড়ে যাওয়ায় অনেক নারীরই অজান্তে কোলেস্টেরল বেড়ে যাচ্ছে। এই পরীক্ষার মাধ্যমে রক্তে এলডিএল, এইচডিএল ও ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা জানা যায়, যা হৃদরোগের ঝুঁকি নির্ণয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, এলডিএল কোলেস্টেরল ১০০ মিলিগ্রামের বেশি হলে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। ৩০ বছরের পর বছরে অন্তত একবার এই পরীক্ষা করালে ভবিষ্যতের হৃদরোগ প্রতিরোধ করা সহজ হয়।

ডায়াবেটিস পরীক্ষাও এই বয়সের নারীদের জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ। ফাস্টিং ব্লাড সুগার বা ওরাল গ্লুকোজ টলারেন্স টেস্টের মাধ্যমে প্রিডায়াবেটিস ও টাইপ-২ ডায়াবেটিস শনাক্ত করা যায়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বৃদ্ধি পাওয়ায় ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ে। বিশেষ করে যাদের অতিরিক্ত ওজন রয়েছে, গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের ইতিহাস আছে বা পরিবারে ডায়াবেটিসের প্রবণতা রয়েছে, তাদের নিয়মিত এই পরীক্ষা করা জরুরি। সময়মতো শনাক্ত করা গেলে জীবনযাপনের পরিবর্তনের মাধ্যমেই অনেক ক্ষেত্রে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাগুলোর একটি হলো প্যাপ স্মিয়ার ও এইচপিভি পরীক্ষা। জরায়ুমুখের ক্যান্সার নারীদের মধ্যে অন্যতম সাধারণ ক্যান্সার হলেও নিয়মিত স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে এটি প্রায় পুরোপুরি প্রতিরোধযোগ্য। ৩০ বছরের পর এইচপিভি সংক্রমণ দীর্ঘস্থায়ী হলে ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ে। প্যাপ স্মিয়ার তিন বছর অন্তর বা এইচপিভি কো-টেস্ট পাঁচ বছর অন্তর করালে প্রাথমিক পর্যায়েই ঝুঁকি শনাক্ত করা যায়। পরিচ্ছন্নতা, সচেতনতা ও সময়মতো টিকাদানের মাধ্যমে এই ক্যান্সার প্রতিরোধ সম্ভব।

থাইরয়েড ফাংশন টেস্টও ৩০ বছরের বেশি বয়সী নারীদের জন্য অত্যন্ত জরুরি একটি পরীক্ষা। গবেষণা অনুযায়ী, এই বয়সের প্রতি আটজন নারীর একজন কোনো না কোনো থাইরয়েড সমস্যায় ভোগেন। অকারণে ওজন বৃদ্ধি, অতিরিক্ত ক্লান্তি, চুল পড়া, ঠান্ডা সহ্য না হওয়া কিংবা মুড সুইং থাইরয়েড সমস্যার লক্ষণ হতে পারে। টিএসএইচ, টি-৩ ও টি-৪ পরীক্ষার মাধ্যমে থাইরয়েডের কার্যকারিতা জানা যায়। সময়মতো চিকিৎসা শুরু করলে এই সমস্যাগুলো সহজেই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

স্তন ক্যান্সার নারীদের মধ্যে আরেকটি বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি। যদিও সাধারণত ৪০ বছরের পর ম্যামোগ্রাম করার পরামর্শ দেওয়া হয়, তবে ৩০ বছরের পর থেকেই নিয়মিত ক্লিনিক্যাল ব্রেস্ট পরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মাসে একবার নিজে স্তন পরীক্ষা করা এবং বছরে অন্তত একবার চিকিৎসকের মাধ্যমে পরীক্ষা করালে গাঁট, অসমতা বা অস্বাভাবিক নিঃসরণ দ্রুত শনাক্ত করা যায়। প্রাথমিক পর্যায়ে স্তন ক্যান্সার ধরা পড়লে চিকিৎসার সাফল্যের হার ৯০ শতাংশেরও বেশি।

সবশেষে, সম্পূর্ণ রক্ত পরীক্ষা ও মেটাবলিক প্যানেল নারীর সামগ্রিক স্বাস্থ্য অবস্থা মূল্যায়নে সহায়ক। সিবিসি পরীক্ষার মাধ্যমে অ্যানিমিয়া বা রক্তস্বল্পতা শনাক্ত হয়, যা নারীদের মধ্যে খুবই সাধারণ একটি সমস্যা। আয়রনের ঘাটতি কিংবা অতিরিক্ত মাসিকের কারণে এই সমস্যা দেখা দিতে পারে। অন্যদিকে মেটাবলিক প্যানেল লিভার, কিডনি ও ইলেকট্রোলাইটের কার্যকারিতা সম্পর্কে ধারণা দেয়। এই পরীক্ষাগুলো বছরে একবার করালে শরীরের ভেতরের নীরব সমস্যাগুলো সহজেই ধরা পড়ে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, ৩০ বছরের পর নারীদের জন্য স্বাস্থ্য পরীক্ষা কোনো বিলাসিতা নয়, বরং সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের পূর্বশর্ত। নিজের শরীর সম্পর্কে সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা ও প্রয়োজন অনুযায়ী জীবনধারা পরিবর্তনের মাধ্যমেই দীর্ঘদিন সুস্থ থাকা সম্ভব। সময়ের আগে সতর্ক হওয়াই ভবিষ্যতের বড় ঝুঁকি থেকে নিজেকে রক্ষা করার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত