প্রকাশ: ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশে মানসম্পন্ন, বৈষম্যহীন ও যুগোপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় নতুন শিক্ষা আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার। প্রস্তাবিত ‘শিক্ষা আইন, ২০২৬’-এর খসড়া ইতিমধ্যেই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। চূড়ান্ত আইন প্রণয়ের আগে জনমতের জন্য এটি ৭ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকবে। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক, শিক্ষা প্রশাসক এবং অন্যান্য অংশগ্রহণকারীরা নির্দিষ্ট ইমেইল opinion_edu_act@moedu.gov.bd-এ মতামত পাঠাতে পারবেন।
নতুন খসড়ায় প্রধান লক্ষ্য রাখা হয়েছে শিক্ষাকে নাগরিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া এবং শিক্ষাব্যবস্থাকে বৈষম্যহীন, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জীবনব্যাপী করার পাশাপাশি আধুনিক ও যুগোপযোগী শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা। এছাড়া শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বিশেষ বিধান প্রস্তাব করা হয়েছে। খসড়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা বলছে, প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য একটি ইউনিক আইডি বা স্বতন্ত্র পরিচিতি নম্বর থাকবে। বেসরকারি শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা আনার জন্য এনটিআরসিএ-এর কার্যক্রমকে আরও জোরদার করা হবে।
শিক্ষা আইন প্রস্তাবিত খসড়ায় বাণিজ্যিক কোচিং সেন্টার, সহায়ক নোট-গাইড বই এবং প্রাইভেট টিউশন কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের জন্য কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের সুস্পষ্ট ধারনা দেওয়া হয়েছে। খসড়ার ১৫ ধারায় বলা হয়েছে, আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে এসব কার্যক্রম স্থায়ীভাবে বন্ধ করার জন্য প্রযোজ্য বিধিমালা প্রণয়ন করা হবে।
আইনটি ১১টি অধ্যায় এবং ৫৫টি ধারায় বিন্যস্ত। এর মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষাকে শিশুর মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা হবে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক। এছাড়া ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষা প্রদানের সুযোগ নিশ্চিত করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। মাধ্যমিক শিক্ষাকে ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।
উল্লেখযোগ্যভাবে, খসড়া আইনে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষাক্রমের মানোন্নয়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে প্রধান শিক্ষার সঙ্গে সমমানের গুরুত্ব দিয়ে ডিপ্লোমা পর্যায়ের উচ্চশিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করার জন্য প্রস্তাব রয়েছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের শারীরিক শাস্তি ও মানসিক নিপীড়ন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ৩৯ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো শিক্ষক শিক্ষার্থীকে শারীরিক আঘাত বা মানসিক নির্যাতন করলে তা ‘অসদাচরণ’ হিসেবে গণ্য হবে এবং শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। র্যাগিং ও সাইবার বুলিং প্রতিরোধে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
উচ্চশিক্ষায় মান নিয়ন্ত্রণে ‘অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল’-এর ভূমিকা জোরদার করা হয়েছে। স্নাতক পর্যায়ে অভিন্ন গ্রেডিং পদ্ধতি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। শিক্ষক নিয়োগে ইউজিসি কর্তৃক নির্ধারিত ন্যূনতম যোগ্যতা পালন বাধ্যতামূলক হবে। গবেষণা উদ্দীপিত করতে ‘জাতীয় গবেষণা পরিষদ’ এবং ‘কেন্দ্রীয় গবেষণাগার’ স্থাপনের প্রস্তাবও আছে।
আইন অনুযায়ী, সরকারের অনুমতি ছাড়া কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তাদের স্থাবর সম্পত্তি বিক্রি বা ইজারা দিতে পারবে না। ই-লার্নিং এবং দূরশিক্ষণকে জনপ্রিয় করতে একটি জাতীয় অনলাইন লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। বিদ্যমান আইন ও বিধি অনুযায়ী উপানুষ্ঠানিক, অনানুষ্ঠানিক, বয়স্ক ও জীবনব্যাপী শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
খসড়ায় বলা হয়েছে, ধর্মীয়, নৈতিক শিক্ষা, মুক্তিযুদ্ধ ও গণঅভ্যুত্থানের চেতনা শিক্ষার্থীর চরিত্রে মহৎ গুণাবলির সঞ্চার করবে। শিক্ষার্থীদের দেশপ্রেম, সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ করার জন্য পাঠ্যপুস্তকে সংশ্লিষ্ট বিষয় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. চৌধুরী রফিকুল আবরার জানান, খসড়া আইন শিক্ষাকে আইনি কাঠামোর আওতায় আনার পাশাপাশি শিক্ষার্থীর অধিকার ও কল্যাণ নিশ্চিত করার একটি সমন্বিত উদ্যোগ। তিনি বলেন, আইন কখনোই অত্যন্ত বিস্তারিত হয় না, বরং এটি দিকনির্দেশনা দেয়। প্রয়োজনে বিধিমালা ও নীতিমালার মাধ্যমে এটি আরও কার্যকর করা হবে। খসড়া আইনের প্রস্তুতি মাঠপর্যায়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক, শিক্ষা প্রশাসক, শিক্ষাবিদ এবং বিভিন্ন জেলার অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত এই আইন বলবৎ অন্যান্য আইনের ওপর প্রাধান্য পাবে। অন্য কোনো আইনের সঙ্গে যদি বিরোধ দেখা দেয়, তবে এই আইনই কার্যকর হবে। নতুন শিক্ষা আইন শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও সমন্বিত, স্বচ্ছ ও শিক্ষার্থীবান্ধব করার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।