প্রকাশ: ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেছে। ‘জনতার ইশতেহার’ নামে প্রকাশিত এই দলিলটিতে রাষ্ট্র পরিচালনা, গণতন্ত্র, অর্থনীতি, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং ঐতিহাসিক চেতনার প্রশ্নে দলটির অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে। বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে মুক্তিযুদ্ধ ও সাম্প্রতিক জুলাই বিপ্লবকে কেন্দ্র করে জামায়াতের পরিকল্পনা ও দৃষ্টিভঙ্গি, যা রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্ক ও আলোচনা সৃষ্টি করেছে।
বুধবার সন্ধ্যায় রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই ইশতেহার জনসমক্ষে তুলে ধরা হয়। দলীয় নেতাদের পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে ঘোষিত ইশতেহারে মোট ২৬টি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে রাষ্ট্র পরিচালনার দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হিসেবে ৪১টি ভিশনও উপস্থাপন করা হয়েছে। জামায়াতের দাবি, এই ইশতেহার কেবল একটি রাজনৈতিক ঘোষণাপত্র নয়, বরং জনগণের আকাঙ্ক্ষা, মতামত ও ভবিষ্যৎ প্রত্যাশার প্রতিফলন।
ইশতেহারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশজুড়ে রয়েছে মহান মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও ইতিহাস নিয়ে দলটির অবস্থান। জামায়াতের ইশতেহারে বলা হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধের মূল আদর্শ—সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার—রাষ্ট্রীয় ও জাতীয় জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে কার্যকর কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে। দলটির মতে, এই আদর্শগুলো কেবল স্মৃতিচারণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিগত ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস শিক্ষার্থীদের কাছে সঠিকভাবে তুলে ধরার বিষয়টিও ইশতেহারে গুরুত্ব পেয়েছে। জামায়াতের বক্তব্য, ইতিহাসের বিকৃতি বা একমুখী ব্যাখ্যার পরিবর্তে প্রামাণ্য তথ্যভিত্তিক ও গবেষণালব্ধ ইতিহাস পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। দলটির দাবি, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ইতিহাস সম্পর্কে সচেতন ও দায়িত্বশীল করে তুলতে হলে মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাপ্রবাহ, ত্যাগ এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিরপেক্ষভাবে উপস্থাপন করা প্রয়োজন।
ইশতেহারে মুক্তিযুদ্ধের পাশাপাশি জুলাই বিপ্লবকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। জামায়াতের পরিকল্পনা অনুযায়ী, জুলাই বিপ্লবের স্বীকৃতিস্বরূপ গঠিত জুলাই গণঅভ্যুত্থান অধিদফতরকে আধুনিক ও টেকসই ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে পরিচালনা করা হবে। এতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। দলটির মতে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা চালু হলে দুর্নীতি কমবে এবং নাগরিক সেবার মান উন্নত হবে।
জুলাই বিপ্লবে শহীদ ও অংশগ্রহণকারীদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিও রয়েছে ইশতেহারে। ঘোষণায় বলা হয়েছে, শহীদ পরিবার এবং জুলাই যোদ্ধাদের জন্য নিয়মিত অনুদান ও ভাতা প্রদান করা হবে। পাশাপাশি তাদের জন্য আবাসন নির্মাণ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। আহত ও পঙ্গু যোদ্ধাদের চিকিৎসা ব্যয় সম্পূর্ণভাবে সরকারি কোষাগার থেকে বহনের অঙ্গীকারও করেছে জামায়াত।
এই ঘোষণাগুলোকে দলটি সামাজিক ন্যায়বিচারের অংশ হিসেবে তুলে ধরছে। জামায়াত নেতাদের বক্তব্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রের প্রতি ত্যাগ স্বীকারকারীদের দায়িত্ব রাষ্ট্রকেই নিতে হবে। এতে করে ইতিহাসের সঙ্গে ন্যায়বিচারের সংযোগ তৈরি হবে এবং রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার একটি উদাহরণ স্থাপিত হবে।
ইশতেহারে আরও বলা হয়েছে, আধুনিক ও টেকসই ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে সরকারি মন্ত্রণালয় ও দপ্তরগুলোতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হবে। জামায়াতের মতে, প্রশাসনিক দুর্বলতা ও জবাবদিহিতার অভাবই দুর্নীতির মূল কারণ। তাই প্রযুক্তিনির্ভর শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব।
মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই বিপ্লব ছাড়াও ইশতেহারে রাষ্ট্র পরিচালনায় যুবসমাজের প্রাধান্য, নারীর নিরাপত্তা, প্রযুক্তিনির্ভর সমাজ গঠন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপের কথা বলা হয়েছে। দলটির ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ও কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা রাষ্ট্র ও সমাজকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এর পরিবর্তনে একটি অংশগ্রহণমূলক ও ন্যায়ভিত্তিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার অঙ্গীকার করা হয়েছে।
ইশতেহার ঘোষণা অনুষ্ঠানে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান সূচনা বক্তব্যে বলেন, রাজনীতিতে আমরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছি—ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়। তিনি প্রশ্ন তোলেন, স্বাধীনতার ৫৪ বছরে এই স্লোগানের বাস্তব প্রতিফলন কতটা ঘটেছে। তার ভাষায়, জনতার ইশতেহার প্রণয়নের ক্ষেত্রে জনগণের মতামত ও পরামর্শকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যাতে এটি কেবল দলীয় নয়, বরং সামগ্রিক জাতীয় আকাঙ্ক্ষার প্রতিচ্ছবি হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও ব্যাখ্যা নিয়ে জামায়াতের এই অবস্থান নতুন করে বিতর্ক তৈরি করতে পারে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে মুক্তিযুদ্ধ একটি সংবেদনশীল ও কেন্দ্রীয় ইস্যু। ফলে ‘সঠিক ইতিহাস’ তুলে ধরার দাবি কীভাবে বাস্তবায়িত হবে এবং তার ব্যাখ্যা কী হবে—সে প্রশ্নে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা বাড়ছে। একই সঙ্গে জুলাই বিপ্লবকে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার পরিকল্পনাও আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সব মিলিয়ে জামায়াতের ‘জনতার ইশতেহার’ মুক্তিযুদ্ধ, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক আন্দোলন এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রচিন্তাকে এক সুতোয় গাঁথার চেষ্টা করেছে। এই ইশতেহার কতটা জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারবে এবং নির্বাচনী রাজনীতিতে কী প্রভাব ফেলবে, তা নির্ভর করবে ভোটারদের মূল্যায়ন ও রাজনৈতিক বাস্তবতার ওপর। তবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে দলটির ঘোষিত পরিকল্পনা যে আসন্ন নির্বাচনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠবে, তা স্পষ্ট।