উত্তেজনার ছায়ায় ওমানে ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সম্ভাব্য বৈঠক

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৫৫ বার
উত্তেজনার ছায়ায় ওমানে ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সম্ভাব্য বৈঠক

প্রকাশ: ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের দামামা যখন ক্রমেই জোরালো হয়ে উঠছে, ঠিক সেই সময়ই নতুন করে কূটনৈতিক তৎপরতার ইঙ্গিত মিলেছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে। দীর্ঘদিনের বৈরিতা, নিষেধাজ্ঞা আর হুমকি-পাল্টা হুমকির আবহে দুই দেশের সম্ভাব্য বৈঠকের খবরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তৈরি হয়েছে নতুন কৌতূহল। সব ধোঁয়াশা কাটিয়ে শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) ওমানের রাজধানী মাস্কাটে বৈঠকে বসতে পারে তেহরান ও ওয়াশিংটনের প্রতিনিধিরা—এমন তথ্য জানিয়েছে একাধিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম।

প্রথমে তুরস্কের ইস্তাম্বুলে এই বৈঠকের কথা থাকলেও শেষ মুহূর্তে স্থান পরিবর্তন করা হয়। ইরানের প্রস্তাবেই আলোচনার ভেন্যু হিসেবে সামনে আসে ওমান, যা দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নীরব কূটনৈতিক যোগাযোগের নির্ভরযোগ্য কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। যদিও শুরুতে হোয়াইট হাউস এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিল বলে জানায় মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস। পরে আরব কয়েকটি দেশের অনুরোধ ও কূটনৈতিক চাপের মুখে যুক্তরাষ্ট্র ওমানেই আলোচনায় বসতে সম্মত হয়েছে বলে নিশ্চিত করা হয়।

এই বৈঠক ঘিরে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে আলোচনার এজেন্ডা নিয়ে। ইরান স্পষ্ট করে জানিয়েছে, তারা কেবল পরমাণু কার্যক্রম ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়েই আলোচনা করতে আগ্রহী। তেহরানের অবস্থান পরিষ্কার—দেশটির ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি, আঞ্চলিক প্রভাব বা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে কোনো আলোচনা তারা করবে না। ইরানের দাবি, এসব বিষয় তাদের সার্বভৌম নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক রাজনীতির অংশ, যা দ্বিপাক্ষিক আলোচনার টেবিলে তোলার সুযোগ নেই।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ঠিক উল্টো। ওয়াশিংটন বলছে, একটি অর্থবহ ও টেকসই চুক্তিতে পৌঁছাতে হলে শুধু পরমাণু ইস্যুতে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল কর্মসূচি, আঞ্চলিক প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোকে সহায়তা এবং দেশের ভেতরের মানবাধিকার পরিস্থিতিও আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তার ভাষায়, “এই বিষয়গুলো উপেক্ষা করে কোনো সমঝোতা বাস্তবতা ও নিরাপত্তার প্রশ্নে টেকসই হতে পারে না।”

এমন বিপরীত অবস্থানের মধ্যেই আলোচনার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, বৈঠকটি আদৌ ফলপ্রসূ হবে কি না, তা নির্ভর করবে দুই পক্ষ কতটা নমনীয় অবস্থান নেয় তার ওপর। তবে উত্তেজনার এই সময়ে শুধু আলোচনায় বসার সিদ্ধান্তই সংঘাত এড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে দেখছেন অনেকে।

এই প্রেক্ষাপটে নতুন মাত্রা যোগ করেছে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাতার, তুরস্ক ও মিশরের দেওয়া একটি খসড়া প্রস্তাব। প্রস্তাব অনুযায়ী, ইরান আগামী তিন বছরের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ পুরোপুরি বন্ধ রাখবে এবং বর্তমানে মজুত থাকা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কোনো তৃতীয় দেশে পাঠাবে। একই সঙ্গে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারে আগাম সীমাবদ্ধতা আরোপের কথাও বলা হয়েছে। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি ‘অনাক্রমণ চুক্তি’ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যেখানে উভয় পক্ষ একে অপরের ওপর সামরিক হামলা না করার প্রতিশ্রুতি দেবে।

এই প্রস্তাব এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং তেহরান বা ওয়াশিংটন কেউই আনুষ্ঠানিকভাবে এতে সম্মতি দেয়নি। তবে কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, সংঘাত এড়াতে এই ধরনের প্রস্তাব ভবিষ্যৎ আলোচনার ভিত্তি হতে পারে। বিশেষ করে ‘অনাক্রমণ চুক্তি’র ধারণাটি মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

এদিকে সামরিক প্রস্তুতির খবরে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ইরানে সম্ভাব্য হামলার প্রস্তুতি হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে জোরদার করা হয়েছে। একই সঙ্গে তেহরানও পাল্টা হুঙ্কার দিয়ে জানিয়েছে, কোনো হামলা হলে তার জবাব হবে কঠোর ও বহুমাত্রিক। এই পাল্টাপাল্টি হুমকির মধ্যেই ওমান বৈঠকের খবর তাই নতুন করে শান্তিপূর্ণ সমাধানের আশার আলো দেখাচ্ছে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, ওমানের ভূমিকা এখানে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অতীতেও ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে গোপন ও প্রকাশ্য আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে সফল ভূমিকা রেখেছে মাস্কাট। নিরপেক্ষ অবস্থান ও আঞ্চলিক গ্রহণযোগ্যতার কারণে ওমান উভয় পক্ষের কাছেই আস্থার জায়গা তৈরি করেছে। ফলে এই বৈঠক যদি হয়, তবে সেটি শুধু তাৎক্ষণিক উত্তেজনা প্রশমনের নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার সূচনা হতে পারে।

তবে পথ যে একেবারেই মসৃণ নয়, সেটিও স্পষ্ট। পরমাণু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের আগের প্রত্যাহার, ইরানের ওপর ধারাবাহিক নিষেধাজ্ঞা, আঞ্চলিক সংঘাত এবং মানবাধিকার প্রশ্ন—সব মিলিয়ে অবিশ্বাসের দেয়াল এখনো উঁচু। এই দেয়াল ভাঙতে হলে শুধু কথাবার্তা নয়, প্রয়োজন বাস্তবসম্মত ছাড় ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা।

তবু বর্তমান পরিস্থিতিতে বৈঠকের সম্ভাবনাকেই বড় খবর হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকেরা। যুদ্ধের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকা দুই প্রতিপক্ষ যদি আলোচনার টেবিলে বসে, সেটি নিজেই একটি কূটনৈতিক অর্জন। ওমানে সম্ভাব্য এই বৈঠক তাই শুধু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নয়, বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্য এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ এক মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত