সর্বশেষ :
কক্সবাজারে ৪ পর্যটকের সাগরে প্রানহানি, এখনও নিখোঁজ ১ ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু অসুস্থ: উন্নত চিকিৎসায় বিএমইউতে স্থানান্তর রংপুরের গঙ্গাচড়ায় বিড়ির বাজার দখল কেন্দ্রিক কোন্দলে বিএনপি অফিসে ভাঙচুর ‘ইশরাক পোষ্য কোটায় রাজনীতিতে এসেছেন, অভিজ্ঞতার ঘাটতি রয়েছে’: নিলোফার চৌধুরী খুলনার দাকোপে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ফেক নিউজ নিয়ন্ত্রণে আইনি পদক্ষেপ ও বাকস্বাধীনতার ভারসাম্য চান তথ্যমন্ত্রী ‘ক্ষমতাহীন নাগরিকই শাসকদলের চাঁদাবাজির শিকার’: হাসনাত আবদুল্লাহ সৌদি আরবের দাম্মাম বিমানবন্দরে ভয়াবহ হামলা: নিহত ১, আহত ৮ গাজীপুরে গভীর রাতে বিধ্বংসী আগুন: পুড়ল মসজিদ ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নভেম্বরের শুরুতে স্কুল-কলেজে মিলতে পারে টানা ৩ দিনের ছুটি

ত্রিশ বছরের কারাগার, বিচার-সাজা ছাড়াই মুক্তি পেলেন কনু মিয়া

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৫ জুলাই, ২০২৫
  • ৫৪ বার

প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৫ | একটি বাংলাদেশ ডেস্ক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন

ত্রিশ বছরেরও বেশি সময় লোহার শিকলের আড়ালে বন্দি এক মানুষ। মামলা ছিল, স্বীকারোক্তি ছিল, কিন্তু ছিল না কোনো বিচার—ছিল না কোনো সাজা। হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলার সিংহগ্রামের চিনি মিয়ার ছেলে কনু মিয়ার জীবনের গল্পটি যেন এক লুকোনো বেদনার দলিল হয়ে আছে বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রিতা আর গাফিলতির প্রতীক হয়ে।

১৯৯৫ সালের ২৫ মে গ্রামের এক অন্ধকার রাতেই শুরু হয়েছিল এই দীর্ঘ অধ্যায়। মানসিক ভারসাম্যহীন কনু মিয়া নিজের মা মেজেস্টর বিবিকে কোদাল দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করেন ঘুমন্ত অবস্থায়। আতঙ্কিত গ্রামবাসী তাকে হাতেনাতে ধরে তুলে দেন পুলিশের হাতে। পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে নিজের দায় স্বীকার করে এক সংক্ষিপ্ত জবানবন্দি দিয়েই যেন স্থবির হয়ে যায় তার বাকি জীবন।

প্রথমদিকে পরিবার, স্বজন—সবাই কিছুদিন ছুটে গিয়েছিলেন কারাগারে। কিন্তু সময়ের হিসাব বদলে দিতে থাকে সম্পর্কের রং। ক্রমে ভিড় কমতে কমতে এক সময় আর কেউই খোঁজ রাখেনি কনু মিয়ার। যিনি ততদিনে একাই দাঁড়িয়ে আছেন গারদের আড়ালে—কোনো বিচার নেই, সাজা নেই—শুধু দিন আর বছর গুনে যাওয়া।

কনু মিয়ার এই অবাক করা নিঃসঙ্গতার খবরও হয়তো আর কোনোদিন আলোর মুখ দেখত না, যদি না হবিগঞ্জের জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার ও সিনিয়র সহকারী জজ মুহম্মাদ আব্বাছ উদ্দিন একদিন এই অব্যক্ত অন্যায়ের খোঁজে এগিয়ে না আসতেন। সরকারি আইনগত সহায়তা প্রকল্পের আওতায় তিনি নতুন করে খুঁজে বের করেন মামলার বাদী মনু মিয়াকে। খুঁজে বের করেন কনু মিয়ার ভাই নাসু মিয়াকেও, যাঁরা কখনো ভেবেই দেখেননি, যে মানুষটিকে একরকম মেনে নিয়েছিলেন হারিয়ে যাওয়া বলে—তিনি এখনও বেঁচে আছেন একাকী অন্ধকারের মধ্যে।

সরকারি উদ্যোগ আর পরিবার ও স্থানীয়দের সহযোগিতার আশ্বাসে আবার নতুন করে আলোর আশা দেখা দেয় কনু মিয়ার জীবনে। লিগ্যাল এইডের প্যানেল আইনজীবী অ্যাডভোকেট এম এ মজিদ জানান, মানসিক ভারসাম্যহীন আসামি—তা-ও আবার হত্যা মামলার একমাত্র অভিযুক্ত—তার জামিন প্রক্রিয়া কতটা জটিল ও স্পর্শকাতর, তা সহজেই অনুমেয়। তাছাড়া হাইকোর্টের নির্দেশে বিচারিক কার্যক্রমও স্থগিত হয়ে ছিল বহু বছর ধরে।

সব আইনি জটিলতা আর মানবিক দিকগুলো বিবেচনায় নিয়ে অবশেষে ১৪ জুলাই জেলা ও দায়রা জজ আদালতে কনু মিয়ার জামিনের আবেদন করা হয়। জেলা ও দায়রা জজ জেসমিন আরা বেগম মানবিক দিকটি অগ্রাধিকার দিয়ে জামিন মঞ্জুর করেন। আর তারই প্রেক্ষিতে পরদিন ১৫ জুলাই সকাল ১১টায় খুলে যায় কারাগারের লোহার গেট—ত্রিশ বছরেরও বেশি সময় পর উন্মুক্ত আকাশ আর খোলা বাতাস ফিরে পান কনু মিয়া।

কনু মিয়ার এই দীর্ঘ কারাবাসের গল্প কেবল এক ব্যক্তির নয়—এটি আমাদের আইনি ও সামাজিক দায়বদ্ধতার বড় এক প্রশ্ন। যদি নিয়মিত নজরদারি থাকত, যদি পরিবার-সমাজ-রাষ্ট্রের মধ্যে দায়িত্ববোধ জাগ্রত থাকত—তাহলে কি এই ত্রিশটি বছর এভাবে হারিয়ে যেত?

কনু মিয়ার মুক্তি একদিকে যেমন স্বস্তির নিঃশ্বাস, অন্যদিকে তেমনি এক কঠিন বার্তা—বিচারপ্রক্রিয়ার গাফিলতি ও দীর্ঘসূত্রিতা কোনোভাবেই আর ভবিষ্যতে এমন করুণ উদাহরণ তৈরি করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে আমাদের সবাইকে।

এমনই এক বেদনার শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে কনু মিয়া হয়তো নতুনভাবে শিখে নিচ্ছেন খোলা আকাশে বাঁচার মানে—যেখানে আর কোনো লোহার শিকল নেই, নেই গুনতে থাকা বছরগুলোর হিসাব। শুধু আছড়ে পড়া দীর্ঘশ্বাসগুলো সাক্ষ্য হয়ে থাকল এ সমাজ আর রাষ্ট্রের অজানা অজুহাতের।

একটি বাংলাদেশ অনলাইন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com