রাজনীতি হবে মানুষের সেবার জন্য: চরমোনাই পীর

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৫২ বার
রাজনীতি হবে মানুষের সেবার জন্য: চরমোনাই পীর

প্রকাশ: ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে নৈতিকতা, ইনসাফ ও মানবিক মূল্যবোধ ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানিয়ে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির মুফতি সৈয়দ মো. রেজাউল করীম, যিনি পীর সাহেব চরমোনাই নামে পরিচিত, বলেছেন—রাজনীতি কোনো ক্ষমতার খেলা নয়, রাজনীতি হবে মানুষের সেবার জন্য। ভয় দেখানো, দমন-পীড়ন, মাস্তানি কিংবা সন্ত্রাসের মাধ্যমে নয়, বরং ইনসাফ ও সাম্যের ভিত্তিতেই রাজনীতি পরিচালিত হতে হবে। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, যারা ইসলামের আইন অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনায় বিশ্বাসী নন, তারা আলেম হোন কিংবা ইসলামি দলের পরিচয় বহন করুন—ইসলামীপন্থিদের কাছে তারা সমর্থনযোগ্য নন।

বুধবার সন্ধ্যায় মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলার নন্দকুমার মডেল ইনস্টিটিউশনের মাঠে অনুষ্ঠিত এক নির্বাচনি মহাসমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন পীর সাহেব চরমোনাই। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ শিবচর উপজেলা শাখার উদ্যোগে আয়োজিত এই সমাবেশটি ছিল মাদারীপুর-১ (শিবচর) আসনে দলটির প্রার্থী মাওলানা আকরাম হোসাইনের নির্বাচনি কর্মসূচির অংশ। সমাবেশে বিপুলসংখ্যক মানুষের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো, বিশেষ করে আলেম সমাজের দৃঢ় ঐক্য ও সক্রিয় অংশগ্রহণ এলাকায় নতুন রাজনৈতিক প্রত্যাশা ও আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

সমাবেশে পীর সাহেব চরমোনাই বলেন, দেশের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে একই ধরনের রাজনৈতিক চক্রের শাসন দেখেছে। বিএনপি ক্ষমতায় এলে আওয়ামী লীগ পালায়, আর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে বিএনপি পালায়—এটাই যেন দেশের রাজনীতির বাস্তব চিত্র। তিনি বলেন, যাদের শাসনের ইতিহাস মানুষের সামনে উন্মোচিত হয়েছে, সেই ইতিহাস কুকুরের চেয়েও খারাপ বললেও অত্যুক্তি হবে না। কিন্তু ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এ দেশ থেকে পালানোর রাজনীতি করে না, বরং দেশ ও মানুষের পাশে থেকে লড়াই করার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে।

তিনি আরও বলেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের সামনে একটি নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। সেই সময় দেশের পুনর্গঠন ও নতুনভাবে বিনির্মাণের দায়িত্ব পালন করার চেষ্টা করেছি আমরা। এখন সময় এসেছে সেই আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার। ইনসাফ ও সাম্যের মাধ্যমেই মানুষের প্রকৃত মুক্তি আসতে পারে এবং শোষণ-বঞ্চনার হাত থেকে সাধারণ জনগণ রেহাই পেতে পারে।

বক্তব্যে তিনি বিএনপির নীতিহীন রাজনীতি এবং জামায়াতের ‘শরিয়াহ আইন বাস্তবায়ন করব না’—এমন অবস্থানের তীব্র সমালোচনা করেন। তার ভাষায়, ইসলাম, দেশ ও মানবতার পক্ষে কথা বলার একমাত্র বাস্তব বিকল্প হলো শরিয়াহভিত্তিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা। এই লক্ষ্য অর্জনে তিনি শিবচরবাসীসহ দেশের সব ধর্মপ্রাণ ও সচেতন মানুষকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রতীক হাতপাখা মার্কায় ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান।

পীর সাহেব চরমোনাই বলেন, মাস্তানি আর সন্ত্রাসের রাজনীতির দিন শেষ হয়ে আসছে। বাংলার মানুষ আর ভয়ভীতির রাজনীতি দেখতে চায় না। মানুষ এখন এমন নেতৃত্ব চায়, যারা মানুষের পাশে দাঁড়াবে, তাদের অধিকার রক্ষা করবে এবং সেবার মানসিকতা নিয়ে রাজনীতি করবে। তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, হাজি শরীয়াতুল্লাহর এই পুণ্যভূমিতে এবার ইনসাফের শাসন কায়েম হবে—এই বিশ্বাস তিনি হৃদয়ে ধারণ করেন।

তিনি আরও বলেন, আমরা একটি স্বপ্ন, একটি ভিশন ও একটি অঙ্গীকার নিয়ে রাজনীতিতে নেমেছি। আজ বাংলার মানুষের মাঝে যে জাগরণ তৈরি হয়েছে এবং তরুণদের বুকে যে সাহস পুঞ্জীভূত হয়েছে, তা প্রমাণ করে মানুষ পরিবর্তন চায়। বংশ পরম্পরায় শাসন করার দিন শেষ হয়ে আসছে। সাধারণ মানুষ এখন মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ের রাজনীতিকে গ্রহণ করছে।

সমাবেশের সভাপতি ও মাদারীপুর-১ (শিবচর) আসনের ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মাওলানা আকরাম হোসাইন তার বক্তব্যে বলেন, দেশের রাজনীতিতে একশ্রেণীর নেতাকর্মী আছেন, যারা নির্বাচনের আগে বড় বড় প্রতিশ্রুতি দেন—সমাজকে মাদকমুক্ত করবেন, দুর্নীতিমুক্ত করবেন। কিন্তু ক্ষমতায় যাওয়ার পর দেখা যায় অপরাধ প্রবণতা আরও বেড়ে গেছে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ কথার ফুলঝুড়িতে বিশ্বাস করে না, বরং কাজের মাধ্যমে প্রমাণ দিতে চায়।

তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে তিনি শিবচরের স্থানীয় মসজিদ, মাদ্রাসা এবং আলেম-ওলামাদের পাশে থেকে কাজ করে আসছেন। এ কারণেই শিবচরের সর্বস্তরের মানুষের কাছে তার একটি স্বাভাবিক গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তা তৈরি হয়েছে। নির্বাচিত হতে পারলে তিনি শিবচরকে সব রকম জুলুম, নির্যাতন ও সন্ত্রাসমুক্ত করার অঙ্গীকার করেন।

মাওলানা আকরাম হোসাইন আরও বলেন, তার প্রথম কাজ হবে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। পাশাপাশি যুব সমাজের জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং একটি নৈতিক, শান্তিপূর্ণ ও দুর্নীতিমুক্ত শিবচর গড়ে তুলতে তিনি নিরলসভাবে কাজ করবেন।

এই নির্বাচনি সমাবেশে আরও উপস্থিত ছিলেন জাতীয় ওলামা মাশায়েখ আইম্মা পরিষদের সেক্রেটারি মুফতি রেজাউল করিম আবরার, মাদারীপুরের পীর সাহেব চন্ডিবদী আলী আহম্মদ চৌধুরী, ইসলামী শ্রমিক আন্দোলন বাংলাদেশের সাবেক সভাপতি মাওলানা এনামুল কবির কহিনুর, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ শিবচর উপজেলা শাখার সভাপতি হাফেজ জাফর আহম্মদ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস শিবচর উপজেলা শাখার সভাপতি মাওলানা শাহ-আলম তালুকদার, বাংলাদেশ মুজাহিদ কমিটি শিবচর উপজেলা শাখার নেতা মাওলানা আব্দুস ছালামসহ আরও অনেক আলেম, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।

সমাবেশে অংশ নেওয়া সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দীর্ঘদিনের হতাশা ও ক্ষোভের মধ্যে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের এই কর্মসূচি অনেকের মাঝেই নতুন প্রত্যাশা তৈরি করেছে। অনেকে মনে করছেন, প্রচলিত রাজনৈতিক ধারা থেকে বেরিয়ে এসে নৈতিকতা ও সেবাভিত্তিক রাজনীতির পথে হাঁটার সময় এসেছে।

সব মিলিয়ে শিবচরের এই নির্বাচনি মহাসমাবেশ শুধু একটি দলীয় কর্মসূচিই নয়, বরং স্থানীয় রাজনীতিতে একটি নতুন বার্তা দিয়েছে—রাজনীতি হবে মানুষের কল্যাণের জন্য, ক্ষমতার লড়াইয়ের জন্য নয়। এই বার্তা কতটা গ্রহণযোগ্যতা পায় এবং নির্বাচনের ফলাফলে তার প্রতিফলন ঘটে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত