দুর্নীতিমুক্ত ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার জামায়াতের

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৪৪ বার
দুর্নীতিমুক্ত মানবিক বাংলাদেশ জামায়াত

প্রকাশ: ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

প্রতিশোধ ও প্রতিহিংসার রাজনীতির পরিবর্তে সবার অংশগ্রহণে সন্ত্রাস ও দুর্নীতিমুক্ত একটি মানবিক রাষ্ট্র গড়ার ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে বুধবার সন্ধ্যায় রাজধানীর বনানীর শেরাটন হোটেলে আয়োজিত এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানে দলের নির্বাচনি ইশতেহার প্রকাশ করেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, জামায়াত কোনো দলীয় বিজয়ের রাজনীতি করতে চায় না; তারা চায় ১৮ কোটি মানুষের বিজয় নিশ্চিত করতে। তাঁর ভাষায়, একটি ঐক্যবদ্ধ, ন্যায়ভিত্তিক ও ইনসাফের বাংলাদেশ গড়াই এই ইশতেহারের মূল লক্ষ্য।

জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা ও জনগণের প্রত্যাশা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ও নাগরিকদের মতামত নিয়ে প্রস্তুত করা হয়েছে এই ইশতেহার। ৮৬ পৃষ্ঠার এই ঘোষণাপত্রে মোট ৪১টি প্রতিশ্রুতি তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে ২৬টি বিষয়কে অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ‘চলো একসাথে গড়ি বাংলাদেশ’ স্লোগান সামনে রেখে ইশতেহারে একটি নিরাপদ, মানবিক ও দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গঠনের রূপরেখা তুলে ধরা হয়।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, দলের সিনিয়র নেতারা, বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক, রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, সাংবাদিক, শিক্ষক, নারী নেত্রী ও ব্যবসায়ী সমাজের প্রতিনিধিসহ নানা শ্রেণি-পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। আয়োজনে ইশতেহারের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হলেও মূল বক্তব্যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তনের ওপর বিশেষ জোর দেন জামায়াত আমির।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, এই ইশতেহারে যুবসমাজের আকাঙ্ক্ষা, শিশুদের নিরাপদ ভবিষ্যৎ এবং একটি সুস্থ জাতি গঠনের প্রয়োজনীয় সব উপাদান অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, জামায়াত ক্ষমতায় গেলে কোনো প্রতিহিংসার রাজনীতি করবে না। বরং জনগণের ঐক্য ও সাম্যের ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনার অঙ্গীকার করা হয়েছে। তাঁর মতে, প্রতিশোধের রাজনীতি অতীতে দেশকে বহু ক্ষতির মুখে ঠেলে দিয়েছে, এখন সময় এসেছে সেই ধারা থেকে বেরিয়ে আসার।

নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, চারদিক থেকে তাঁকে আক্রমণ করা হলেও তিনি পাল্টা আক্রমণে বিশ্বাস করেন না। যারা তাঁর বিরুদ্ধে চরিত্রহনন করেছে, তাদের তিনি ক্ষমা করে দিয়েছেন বলে জানান। তাঁর ভাষায়, চরিত্র ও আদর্শের সঙ্গে প্রতিশোধ মানায় না। এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি রাজনৈতিক সহনশীলতা ও মানবিকতার বার্তা দিতে চেয়েছেন বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

ইশতেহারে বলা হয়েছে, একটি মানবিক রাষ্ট্র গঠনে সততা, ঐক্য, ইনসাফ, দক্ষতা ও কর্মসংস্থানকে ইতিবাচক ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে দুর্নীতি, ফ্যাসিবাদ, আধিপত্যবাদ, বেকারত্ব ও চাঁদাবাজির মতো অনুশীলনকে রাষ্ট্র ও সমাজবিরোধী হিসেবে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। জামায়াতের ভাষ্য অনুযায়ী, এই দুই বিপরীত ধারার স্পষ্ট অবস্থানই তাদের রাজনৈতিক দর্শনের মূল চিহ্ন।

অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ২৬টি বিষয়ের মধ্যে জাতীয় স্বার্থে আপসহীন অবস্থান, বৈষম্যহীন রাষ্ট্রব্যবস্থা, যুবকদের ক্ষমতায়ন, নারীদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা, উন্নত আইনশৃঙ্খলা, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, প্রযুক্তিনির্ভর সমাজ, ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্বভিত্তিক নির্বাচন পদ্ধতি ও শক্তিশালী তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার মাধ্যমে নির্বাচনি পরিবেশ উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

ইশতেহারে অতীতের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সংঘটিত খুন, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করা হয়েছে। পাশাপাশি জুলাই বিপ্লবের ইতিহাস সংরক্ষণ, শহীদ পরিবার ও আহতদের পুনর্বাসন এবং ঘোষিত জুলাই সনদ বাস্তবায়নের কথাও উল্লেখ রয়েছে। কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির মাধ্যমে কৃষি বিপ্লব ঘটানোর পরিকল্পনাও তুলে ধরা হয়েছে।

খাদ্য নিরাপত্তা ও পরিবেশ রক্ষার বিষয়েও আলাদা গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে ভেজালমুক্ত খাদ্য নিশ্চিত করার লক্ষ্য এবং পরিবেশ, বর্জ্য ও বন্যা ঝুঁকি শূন্যে নামিয়ে আনার একটি ‘তিন শূন্য ভিশন’-এর কথা বলা হয়েছে। শিল্পায়নের ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের পাশাপাশি ভারী শিল্প গড়ে তোলার মাধ্যমে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের পরিকল্পনার কথাও রয়েছে।

ইশতেহারের আটটি ভাগে রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন খাতকে সাজানো হয়েছে। শাসনব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার, রাজনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তন, কার্যকর সংসদ, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন গঠনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণের পাশাপাশি প্রশাসনিক ডিজিটালাইজেশন, দ্রুত বিচার এবং অবৈধ সম্পদ বাজেয়াপ্তের মতো উদ্যোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের বিষয়ে জামায়াত ব্যাপক পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। বেকারত্ব দূর করতে যুবসমাজকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর, দেশীয় শিল্প ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং বৈদেশিক কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারি চাকরিতে মেধাভিত্তিক নিয়োগ ও আবেদন ফি বাতিলের অঙ্গীকারও রয়েছে ইশতেহারে।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে মৌলিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলা হয়েছে, ধাপে ধাপে বিনামূল্যে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হবে। নারী ও শিশুর নিরাপত্তা, মর্যাদা ও ক্ষমতায়নকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নারীদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ, স্বাস্থ্যসেবা, সম্পত্তির অধিকার ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

ইশতেহারের ভূমিকায় বলা হয়, এটি কোনো চটকদার বা অবাস্তব প্রতিশ্রুতির দলিল নয়; বরং বাস্তবায়নযোগ্য পরিকল্পনার একটি রূপরেখা। দীর্ঘ গবেষণা ও দেশ-বিদেশের বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে এটি প্রণয়ন করা হয়েছে। ‘জনতার ইশতেহার’ নামে একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্মে সাধারণ মানুষের মতামত নেওয়া হয়েছে বলেও জানানো হয়।

অনুষ্ঠানের সমাপনী বক্তব্যে জামায়াত আমির বলেন, এই ইশতেহার কোনো দলের নয়, বরং জাতির ভবিষ্যৎ কেমন হবে তার দলিল। তিনি দাবি করেন, পাঁচ বছর সময় পেলে জনগণের সীমিত কিন্তু ন্যায্য প্রত্যাশাগুলো পূরণ করা সম্ভব। তাঁর মতে, দেশের মূল সংকট সম্পদের নয়, বরং সততা ও দায়বদ্ধতার অভাব।

সব মিলিয়ে জামায়াতে ইসলামীর ঘোষিত এই ইশতেহার দুর্নীতিমুক্ত, মানবিক ও ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের একটি রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছে। এটি কতটা বাস্তবায়নযোগ্য হবে এবং ভোটারদের আস্থা অর্জন করতে পারবে কি না, তা নির্ভর করবে রাজনৈতিক বাস্তবতা ও জনগণের রায়의 ওপর—এমনটাই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত