প্রকাশ: ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
অবরুদ্ধ ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় আবারও রক্ত ঝরেছে। ইসরাইলি ট্যাংকের গোলাবর্ষণ ও বিমান হামলায় শিশুসহ অন্তত ২৩ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ছয়জন শিশু রয়েছে বলে জানিয়েছে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। বুধবার (৪ জানুয়ারি) এসব তথ্য প্রকাশ করা হয়, যা আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক গণমাধ্যম নিশ্চিত করেছে। নতুন করে এই প্রাণহানি গাজায় চলমান মানবিক সংকটকে আরও গভীর করেছে এবং যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানান, দক্ষিণ গাজার খান ইউনিস শহরে ইসরাইলি বাহিনীর একাধিক হামলায় ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে। সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে যখন প্রথম হামলার পর আহতদের উদ্ধারে এগিয়ে যান এক চিকিৎসক। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর কিছুক্ষণ পরই একই এলাকায় দ্বিতীয় দফা বিমান হামলা চালানো হয়। এতে ঘটনাস্থলেই ওই চিকিৎসক নিহত হন। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় যেখানে চিকিৎসা সেবা আগেই সীমিত, সেখানে এমন একজন চিকিৎসকের মৃত্যু মানুষের জন্য আরও বড় ক্ষতি।
উত্তর গাজার গাজা সিটিতেও পৃথক হামলায় পাঁচ মাস বয়সী এক শিশুর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ। শিশুটির পরিবার জানায়, তারা কোনো সামরিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিল না। হামলার সময় শিশুটি তার মায়ের কোলে ছিল। এই ঘটনায় আশপাশের এলাকাজুড়ে শোক ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয়রা বলছেন, বেসামরিক মানুষের ওপর এমন হামলা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
নিহত পরিবারের একজন সদস্য আবু মোহাম্মদ হাবুশ সংবাদমাধ্যমকে জানান, তারা গভীর রাতে নিজেদের বাড়ির ভেতরে ঘুমিয়ে ছিলেন। হঠাৎ করে ট্যাংক থেকে ছোড়া একটি গোলা সরাসরি তাদের ঘরে আঘাত হানে। মুহূর্তের মধ্যেই ঘরটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। তাঁর ভাষায়, “আমরা সাধারণ মানুষ। কোনো সংঘাতের সঙ্গে জড়িত নই। আমার সন্তান, আত্মীয়—সবাই ঘুমিয়ে ছিল। কিন্তু এক মুহূর্তে সব শেষ হয়ে গেল।” তাঁর কণ্ঠে ছিল অসহায়ত্ব আর ক্ষোভের মিশ্রণ, যা এখন গাজার হাজারো পরিবারের অনুভূতির প্রতিচ্ছবি।
এদিকে ইসরাইলি সেনাবাহিনী তাদের হামলার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেছে। এক বিবৃতিতে তারা দাবি করে, হামাস যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে সীমান্তের কাছে অবস্থানরত ইসরাইলি সেনাদের লক্ষ্য করে গুলি চালায়। এর জবাবে পাল্টা হামলা চালানো হয়। ইসরাইলি বাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, ওই ঘটনায় একজন ইসরাইলি সেনা গুরুতর আহত হয়েছেন। তবে এই দাবির বিষয়ে স্বাধীন কোনো সূত্র থেকে তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
অন্যদিকে হামাস এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। সংগঠনটি এক বিবৃতিতে বলেছে, ইসরাইলি বাহিনীর এই হামলা চলমান যুদ্ধবিরতি স্থিতিশীল করার প্রচেষ্টাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। হামাস আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছে, অবিলম্বে ইসরাইলের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে হবে, যাতে বেসামরিক জনগণের বিরুদ্ধে হামলা বন্ধ করা হয় এবং যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকে।
গাজায় সাম্প্রতিক এই হামলা এমন এক সময়ে ঘটল, যখন যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপ নিয়ে আলোচনা চলার কথা ছিল। চলতি জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপ শুরুর ঘোষণা দেন। এই ধাপে গাজার ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থা, পুনর্গঠন ও মানবিক সহায়তা জোরদারের বিষয়ে আলোচনা হওয়ার কথা ছিল। তবে ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহার, হামাসের নিরস্ত্রীকরণ এবং গাজার নিরাপত্তা কাঠামো—এই গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই অমীমাংসিত বিষয়গুলোর কারণেই যুদ্ধবিরতি বারবার ভঙ্গ হচ্ছে। একদিকে ইসরাইল নিজেদের নিরাপত্তার যুক্তি তুলে ধরছে, অন্যদিকে ফিলিস্তিনিরা বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি ও অবরোধের অবসান দাবি করছে। এই টানাপোড়েনের মাঝেই সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি ভুগছে।
গাজার স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত ইসরাইলি হামলায় অন্তত ৫৩০ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। নিহতদের বড় অংশই নারী ও শিশুসহ বেসামরিক নাগরিক। একই সময় ফিলিস্তিনি যোদ্ধাদের হামলায় চারজন ইসরাইলি সেনা নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। এই পরিসংখ্যান যুদ্ধবিরতির বাস্তব চিত্রকে স্পষ্ট করে তোলে, যেখানে কাগজে-কলমে শান্তি থাকলেও বাস্তবে সহিংসতা থামেনি।
মানবাধিকার সংস্থাগুলো নতুন করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা বলছে, গাজায় বারবার বেসামরিক এলাকায় হামলা আন্তর্জাতিক মানবিক আইন ও জেনেভা কনভেনশনের পরিপন্থী। বিশেষ করে উদ্ধারকর্মী ও চিকিৎসাকর্মীদের লক্ষ্যবস্তু হওয়া একটি গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠন অবিলম্বে স্বাধীন তদন্তের দাবি জানিয়েছে।
গাজায় বসবাসরত সাধারণ মানুষের জীবন প্রতিদিনই অনিশ্চয়তার মধ্যে কাটছে। দীর্ঘদিনের অবরোধ, খাদ্য ও ওষুধের সংকট, বিদ্যুৎ ও পানির অভাব—সব মিলিয়ে এখানকার মানবিক পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। সাম্প্রতিক হামলায় নতুন করে বাস্তুচ্যুত হয়েছে বহু পরিবার। অনেকেই ধ্বংসস্তূপের নিচে প্রিয়জনকে খুঁজে বেড়াচ্ছেন, আবার কেউ নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে এক স্থান থেকে আরেক স্থানে ছুটছেন।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, গাজায় স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হলে কেবল সামরিক সমাধান নয়, বরং একটি টেকসই রাজনৈতিক সমাধান প্রয়োজন। যুদ্ধবিরতি কার্যকর রাখতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সক্রিয় ভূমিকা এবং উভয় পক্ষের মধ্যে আস্থার পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। অন্যথায়, এ ধরনের প্রাণহানি ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।
সব মিলিয়ে গাজায় ইসরাইলি হামলায় শিশুসহ ২৩ জনের মৃত্যু শুধু একটি সংখ্যাই নয়; এটি মানবিক বিপর্যয়ের এক করুণ অধ্যায়। প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একটি স্বপ্ন আর একটি ভেঙে যাওয়া ভবিষ্যৎ। বিশ্ব যখন শান্তি ও স্থিতিশীলতার কথা বলে, তখন গাজার আকাশে এখনও ধোঁয়া আর কান্নার শব্দ ভেসে বেড়াচ্ছে।