রিজার্ভ জোরদারে আরও ১৭১ মিলিয়ন ডলার কিনল কেন্দ্রীয় ব্যাংক

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৪৭ বার
রিজার্ভ জোরদারে আরও ১৭১ মিলিয়ন ডলার কিনল কেন্দ্রীয় ব্যাংক

প্রকাশ: ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে আরও শক্তিশালী করতে নিলামের মাধ্যমে আরও ১৭১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার কিনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ডলার বাজারে সরবরাহ পরিস্থিতি তুলনামূলক স্বাভাবিক থাকা এবং রপ্তানি ও রেমিট্যান্স প্রবাহ ইতিবাচক ধারায় ফেরায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক আবারও সক্রিয়ভাবে ডলার সংগ্রহে নেমেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান এই তথ্য নিশ্চিত করেন।

তিনি জানান, সর্বশেষ নিলামে দেশের ১৬টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের কাছ থেকে মোট ১৭ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার কেনা হয়েছে। এই নিলামে প্রতি ডলারের কাটঅফ মূল্য নির্ধারণ করা হয় ১২২ টাকা ৩০ পয়সা। অর্থাৎ, বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার কিনেছে, যাতে বিনিময় হারে হঠাৎ কোনো অস্থিরতা তৈরি না হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের ভাষ্য অনুযায়ী, এই ক্রয় কার্যক্রম পুরোপুরি বাজারভিত্তিক এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হয়েছে।

চলতি ফেব্রুয়ারি মাসেই এটি দ্বিতীয় দফা ডলার ক্রয়। এর আগে একই মাসে আরেক দফায় ডলার কিনেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সব মিলিয়ে ফেব্রুয়ারির দুই দফা নিলামে বাংলাদেশ ব্যাংক মোট ৩৮ কোটি ৯৫ লাখ মার্কিন ডলার সংগ্রহ করেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে ডলারের সরবরাহ পরিস্থিতি আগের তুলনায় কিছুটা স্বস্তিদায়ক অবস্থানে এসেছে, যার সুযোগ নিচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের শুরু থেকেই বাংলাদেশ ব্যাংক ধাপে ধাপে ডলার কিনছে। অর্থবছরের প্রথম দিকেই রপ্তানি আয় ও প্রবাসী আয় কিছুটা বাড়তে শুরু করে, যা ডলার বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। সেই ধারাবাহিকতায় এখন পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংক মোট ৪৩২ কোটি ৩০ লাখ মার্কিন ডলার কিনেছে, যা প্রায় ৪ দশমিক ৩২ বিলিয়ন ডলারের সমান। এটি সাম্প্রতিক কয়েক বছরে একটি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ, যা রিজার্ভ পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত কয়েক বছরে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের উচ্চমূল্য এবং বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপের কারণে বাংলাদেশের রিজার্ভের ওপর বড় ধরনের চাপ পড়েছিল। সেই প্রেক্ষাপটে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে একদিকে যেমন ডলার বিক্রি করতে হয়েছে, অন্যদিকে আমদানি নিয়ন্ত্রণসহ নানা কড়াকড়ি নীতি নিতে হয়েছে। তবে বর্তমানে পরিস্থিতি কিছুটা পাল্টাচ্ছে। রেমিট্যান্স প্রবাহ ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে, রপ্তানি আয়ে স্থিতিশীলতা এসেছে এবং আমদানি ব্যয় তুলনামূলক নিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা মনে করছেন, এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ধীরে ধীরে রিজার্ভ বাড়ানো জরুরি। কারণ শক্তিশালী রিজার্ভ কেবল বৈদেশিক লেনদেনের নিরাপত্তাই নিশ্চিত করে না, বরং আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতার একটি ইতিবাচক বার্তাও দেয়। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)সহ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীর সঙ্গে চলমান আলোচনায় রিজার্ভ পরিস্থিতি একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়।

ডলার নিলামের কাটঅফ মূল্য ১২২ টাকা ৩০ পয়সা নির্ধারণের বিষয়টিও বাজার বিশ্লেষকদের দৃষ্টি কেড়েছে। তাদের মতে, এটি ইঙ্গিত করে যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন আর কৃত্রিমভাবে বিনিময় হার ধরে রাখার পথে হাঁটছে না; বরং বাজারভিত্তিক বিনিময় হার ব্যবস্থাকে প্রাধান্য দিচ্ছে। এর ফলে ভবিষ্যতে ডলার বাজারে আকস্মিক ওঠানামার ঝুঁকি কিছুটা কমবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

অন্যদিকে, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছেও এই নিলাম একটি স্বস্তির বার্তা। কারণ ব্যাংকগুলোর হাতে পর্যাপ্ত ডলার থাকলেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিলামে ডলার কেনার সিদ্ধান্ত নেয়। সাম্প্রতিক সময়ে রপ্তানিকারকদের ডলার বিক্রিতে আগ্রহ এবং প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স ব্যাংকিং চ্যানেলে আসার হার বাড়ায় ব্যাংকগুলোর ডলার লিকুইডিটি উন্নত হয়েছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ডলার কেনার এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে আগামী মাসগুলোতে রিজার্ভ আরও শক্ত অবস্থানে যেতে পারে। তবে তারা সতর্ক করে দিয়ে বলেন, রিজার্ভ বাড়ানোর পাশাপাশি আমদানি ব্যবস্থাপনা, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের পরিকল্পনা এবং বিনিময় হার ব্যবস্থাপনায় ভারসাম্য রক্ষা করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। শুধু ডলার কিনলেই হবে না, সামগ্রিক অর্থনৈতিক নীতিতে সমন্বয় না থাকলে দীর্ঘমেয়াদে চাপ তৈরি হতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ভবিষ্যতেও বাজার পরিস্থিতি বিবেচনা করে প্রয়োজন অনুযায়ী ডলার কেনা বা বিক্রির সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। মূল লক্ষ্য হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং রিজার্ভকে একটি নিরাপদ ও টেকসই পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া। কর্মকর্তারা মনে করছেন, চলতি অর্থবছরের শেষ নাগাদ রিজার্ভ পরিস্থিতি আরও ইতিবাচক হলে বিনিয়োগকারীদের আস্থাও বাড়বে।

সব মিলিয়ে, আরও ১৭১ মিলিয়ন ডলার কেনার এই সিদ্ধান্তকে অর্থনীতির জন্য একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা। এটি শুধু পরিসংখ্যানগত সাফল্য নয়, বরং সামগ্রিকভাবে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ ধীরে ধীরে একটি স্থিতিশীল পথে ফিরছে—এমন একটি ইঙ্গিতও বহন করছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত