আশুলিয়ায় ছয় মরদেহ পোড়ানো মামলায় ৭ জনের মৃত্যুদণ্ড

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৫৮ বার
আশুলিয়ায় ছয় মরদেহ পোড়ানো মামলায় ৭ জনের মৃত্যুদণ্ড

প্রকাশ: ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ঢাকার আশুলিয়ায় ২০০৬ সালের জুলাই-অগাস্ট গণঅভ্যুত্থান চলাকালীন সময় ঘটানো এক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ সর্বশেষ রায় ঘোষণা করেছে। রায়ে মামলার প্রধান আসামি সাবেক এমপি সাইফুল ইসলামসহ সাতজনকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া ছয়জনকে যাবজ্জীবন ও দুইজনকে সাত বছর করে কারাদণ্ডের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আর একজনকে রাজসাক্ষী হওয়ায় ক্ষমা করা হয়েছে। এই ঘটনা বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্যতম নৃশংস মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিবেচিত।

বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল রায় ঘোষণা করেন। প্যানেলের অন্য দুই সদস্য ছিলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ এবং বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। আদালতের রায় দুপুর ১২টা ৪০ মিনিটে শুরু হয়ে সরাসরি সম্প্রচার করা হয় বাংলাদেশ টেলিভিশনে। এছাড়া চিফ প্রসিকিউটরের লিঙ্ক থেকেও সরাসরি সম্প্রচার করা হয়, যাতে সাধারণ জনগণ আদালতের রায়ের সঙ্গে সরাসরি পরিচিত হতে পারে।

এই মামলার মূল অভিযোগে ঢাকা-১৯ আসনের সাবেক এমপি মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম এবং তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে জনসাধারণের মাঝে আতঙ্ক সৃষ্টিকারী নৃশংস হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ আনা হয়েছিল। মামলায় মোট ১৬ আসামি ছিলেন, যাদের মধ্যে আটজনকে প্রিজনভ্যানে থেকে আদালতে হাজির করা হয়। গ্রেফতার আট আসামির মধ্যে ছিলেন ঢাকা জেলার সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. আব্দুল্লাহিল কাফী, সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সাভার সার্কেল) মো. শাহিদুল ইসলাম, ডিবির তৎকালীন পরিদর্শক আরাফাত হোসেন, এসআই মালেক, এসআই আরাফাত উদ্দিন, এএসআই কামরুল হাসান, এসআই শেখ আবজালুল হক এবং কনস্টেবল মুকুল।

অপর আট আসামি পলাতক ছিলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন ঢাকা রেঞ্জের সাবেক ডিআইজি সৈয়দ নুরুল ইসলাম, সাবেক পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান রিপন, আশুলিয়া থানার তৎকালীন ওসি এএফএম সায়েদ রনি, সাবেক পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান, সাবেক পুলিশ পরিদর্শক (অপারেশন) নির্মল কুমার দাস, সাবেক এএসআই বিশ্বজিৎ সাহা, স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা রনি ভূঁইয়া এবং প্রধান আসামি সাবেক এমপি সাইফুল ইসলাম।

এই মামলায় ৫৩ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে। গত বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়ে চলতি বছরের ১২ জানুয়ারি পর্যন্ত তা শেষ হয়। প্রথম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিয়েছেন শহীদ আস সাবুরের ভাই রেজওয়ানুল ইসলাম এবং শহীদ সাজ্জাদ হোসেন সজলের বাবা মো. খলিলুর রহমান। ২২ কার্যদিবসে তদন্ত কর্মকর্তা জানে আলম খানসহ ২৪ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছে। এরপর আসামি আরাফাত হোসেনের সাফাই সাক্ষ্য নেওয়া হয়। ১৪ জানুয়ারি প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করা হয় এবং আসামিপক্ষসহ প্রতিপক্ষের যুক্তি খণ্ডন শেষ হয় ২০ জানুয়ারি।

এই মামলার রায়ের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারপ্রক্রিয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। মামলার তৃতীয় রায় হিসেবে এটি পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনালের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। দেশের ন্যায়বিচার ব্যবস্থায় এই রায় মানুষকে শাস্তি ও প্রতিকার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিকে দৃঢ় করে।

আশুলিয়ায় এ হত্যাকাণ্ডে নিহত হয়েছেন সাজ্জাদ হোসেন সজল, আস সাবুর, তানজিল মাহমুদ সুজয়, বায়োজিদ বোস্তামী, আবুল হোসেন, ওমর ফারুক এবং মোহাম্মদ শাহাবুল ইসলাম। গত বছরের ২১ আগস্ট ট্রাইব্যুনাল-২ আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর নির্দেশ দেন। আদালতে উপস্থিত আটজন আসামি তাদের নির্দোষ দাবি করেছিলেন, তবে এসআই শেখ আবজালুল হক রাজসাক্ষী হিসেবে দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দেন।

রায়ের সময় ট্রাইব্যুনাল ও সুপ্রিম কোর্ট এলাকায় নিরাপত্তা বহুগুণ বাড়ানো হয়। পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও সেনাবাহিনীসহ গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা তৎপর ছিলেন যাতে আদালতের কার্যক্রম নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়।

এই রায়ের মাধ্যমে দেশে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং ন্যায়সঙ্গত শাস্তি প্রদানের প্রমাণ মিলেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর রায় একবারে নিশ্চিত করেছে যে, গণঅভ্যুত্থানের সময় ঘটে যাওয়া নৃশংস হত্যাকাণ্ডের জন্য ক্ষমা বা উপেক্ষা করা হবে না।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত