প্রকাশ: ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে অবশিষ্ট পারমাণবিক চুক্তি বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) শেষ হয়ে যাওয়ায় বিশ্বের দুই বৃহত্তম পারমাণবিক শক্তিধর দেশের অস্ত্রভাণ্ডারের ওপর আর কোনো সীমা থাকছে না। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই পরিস্থিতি পারমাণবিক প্রতিযোগিতা তীব্র করতে পারে এবং অনিয়ন্ত্রিত সংঘাতের আশঙ্কা বাড়াতে পারে। চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় কয়েক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো দুই দেশের পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের কাঠামো বিলুপ্ত হচ্ছে।
‘নিউ স্টার্ট’ (New START) নামের এই চুক্তি ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে কার্যকর হয়েছিল। এর মাধ্যমে উভয় দেশকে সর্বোচ্চ ১,৫৫০টি মোতায়েনকৃত পারমাণবিক ওয়ারহেডের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হতো। এছাড়া ৭০০টি মোতায়েনকৃত আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, সাবমেরিন থেকে নিক্ষেপযোগ্য ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম ভারী বোমারু বিমান এবং মোট ৮০০টি ‘মোতায়েনকৃত ও অ-মোতায়েনকৃত‘ লঞ্চারের সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল। চুক্তির মাধ্যমে রাশিয়ার আন্তর্জাতিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছানোর সক্ষম পারমাণবিক অস্ত্রের ওপরও নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হতো।
প্রাক্তন ভারপ্রাপ্ত অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিষয়ক আন্ডারসেক্রেটারি অব স্টেট থমাস কান্ট্রিম্যান বলেন, সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি হলো— বিষয়টি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে এবং কোনো অপ্রত্যাশিত ঘটনা দ্রুত পারমাণবিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে। যদিও কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন, চুক্তির সীমাবদ্ধতাগুলো কিছু অংশে পুরনো ও অপ্রয়োজনীয়ভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে আটকে রেখেছিল, বিশেষত সেই সময়ে যখন চীন তার পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার দ্রুত সম্প্রসারণ করছে।
চুক্তিটি মূলত ১০ বছরের জন্য কার্যকর ছিল। ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া মিলে এর মেয়াদ আরও পাঁচ বছর বাড়াতে সম্মত হয়। ফলে এটি ২০২৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বলবৎ ছিল। চুক্তি মেয়াদ শেষ হলেও দুই দেশ চাইলে স্বতঃস্ফূর্তভাবে চুক্তির সীমা মেনে চলতে পারত। তবে এই দীর্ঘদিনের পারস্পরিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত।
একই সময়ে, চুক্তি নিয়ে বিতর্কও চলছিল। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ কিছু সমালোচক বলেছিলেন, চুক্তি চীনের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত না করায় সীমাবদ্ধ এবং একতরফা সুবিধা দিতে পারে। পেন্টাগনের ২০২২ সালের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বর্তমান গতিতে চীনের পারমাণবিক অস্ত্র বৃদ্ধি পেলে ২০৩৫ সালের মধ্যে তাদের কাছে প্রায় ১,৫০০টি পারমাণবিক ওয়ারহেড হতে পারে।
গত বছর ট্রাম্প পারমাণবিক পরীক্ষা পুনরায় চালানোর অঙ্গীকার করেন। যদিও কার্যকর কোনো অগ্রগতি হয়নি, তবু তিনি প্রকাশ্যে বলেন, মেয়াদ শেষ হলে আমরা আরও ভালো একটি চুক্তি করব। অন্যদিকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র চুক্তির সীমাবদ্ধতা বজায় রাখতে সম্মত হবে না এবং ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ত্রিপক্ষীয় নতুন চুক্তিই প্রশাসনের লক্ষ্য। তিনি বলেন, একবিংশ শতাব্দীতে কার্যকর অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয় যদি চীনের অংশগ্রহণ না থাকে।
চীনের পক্ষ থেকে প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্যভাবে বারবার ত্রিপক্ষীয় আলোচনার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নতুন পারমাণবিক প্রতিযোগিতা চলতি দশকে অতি তীব্র এবং নিরাপত্তার জন্য আরও জটিল পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। পারমাণবিক শক্তিধর দুই দেশকে নিয়ন্ত্রণে রাখার কাঠামো বিলুপ্ত হওয়ায় বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন উত্তেজনা এবং অস্ত্র প্রতিযোগিতার আশঙ্কা প্রকট হয়ে উঠেছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যদিও চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও দুটি দেশ স্বতঃস্ফূর্তভাবে সীমা মেনে চলতে পারে, কিন্তু রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিক চাপের অভাবে এটি সম্ভবত কঠিন হবে। ফলে সাম্প্রতিক সপ্তাহে পারমাণবিক নিরাপত্তার প্রশ্ন নতুনভাবে আলোচনায় এসেছে। একদিকে চীন দ্রুত অস্ত্রসংক্রান্ত ক্ষমতা বৃদ্ধি করছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার সীমাবদ্ধতা শেষ হওয়ায় পারমাণবিক প্রতিযোগিতার চ্যালেঞ্জ আরও বেড়ে গেছে।
বিশ্বের দুই বৃহত্তম পারমাণবিক শক্তিধর দেশের অস্ত্রভাণ্ডারের উপর আর কোনো সীমা না থাকার পর, নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন যে, এক ছোট্ট ভুল বা অপ্রত্যাশিত সংঘাতও অতি দ্রুত পারমাণবিক মাপে রূপ নিতে পারে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এখন নতুন রূপে কূটনৈতিক সমঝোতা এবং ত্রিপক্ষীয় আলোচনার প্রয়োজনীয়তা আগের তুলনায় অনেক বেশি গুরুত্ব পেতে শুরু করেছে।